fbpx
পশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

করালী করোনার কামড়ে কাঁপছে কোলাঘাট

ভাস্করব্রত পতি, তমলুক : কথায় বলে, “কাঠ কয়লা পাট / তিনে কোলাঘাট”। এভাবেই কোলাঘাটকে চিত্রায়িত করা হয়েছে সামাজিক অর্থনীতির ভাষায়। কিন্তু লকডাউনের বাউণ্ডুলে আবহাওয়াতে কেমন আছে কোলাঘাট? সব ঠিকঠাক চলছে তো জেলার প্রবেশদ্বার এই ‘জল জীবন যৌবন’ এর জীবন্ত নগরী? একসময় এখানকার নদীঘাট ছিল ব্যবসা বাণিজ্যের অন্যতম পীঠস্থান। কাঠের ব্যবসা চলতো নদীপথে। কয়লা আসতো ট্রেনে। তারপর তা নদীপথেই চলে যেতো বিভিন্ন স্থানে। আর পাটের ব্যাপক চাষ হতো এ অঞ্চলে। সেই পাটের গাঁট যেতো বিভিন্ন জুটমিলে। হয়তো সময়ে সময়ের পরিবর্তনে এসব ব্যবসায় মন্দার ছোঁয়া। পট পরিবর্তন ঘটেছে বানিজ্যের রূপরেখায়। কিন্তু সেই বানিজ্যের ঐতিহ্যবাহী ইতিহাস বুকে জড়িয়ে বেঁচে আছে আজকের কোলাঘাট।

ড. শ্যামল বেরার কথায়, ‘কোলা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হল নদী বা খালের কূলে প্রাপ্তস্থান। এই হিসেবে রূপ নারায়ণের তীরবর্তী গ্রামটি হয়তো ‘কোলা’ নামে চিহ্নিত হয়েছিল। এখানে অনেক ‘কোলা’ পদবীধারী মানুষের বসবাস। অর্থাৎ ‘কোলা’ পদবীধারী মানুষজনের বসতিপূর্ণ গ্রাম ‘কোলা’ নামে পরিচিত হয়েছিল। আর গ্রামের সন্নিহিত নদী পারাপারের ‘ঘাট’, তা হয়েছে কোলার ঘাট বা ‘কোলাঘাট’। তবে H. V. BAYLEY র ‘Memoranda Of Midnapore’ বইতে যে নাম রয়েছে, তাই হোলো ‘COILAGHAT’ (১৮৫২)। তবে ‘কোলা’ র অর্থ নৌকা বা পানসি। যে ঘাটে কোলা বা নৌকা ভিড় করে, সেটাই ‘কোলাঘাট’!

এখানকার গৌরবজনক অধ্যায় বেশ চমকপ্রদ। একসময় এই রূপনারায়ণ নদ দিয়ে বৈষ্ণবচকের বিখ্যাত বিষানশিল্পের উপাদান ‘তেলকম চিরুনি’ পাঠানো হোতো বাংলাদেশের বরিশালে। সেখানকার বর্ধিষ্ণু পরিবারের মহিলাদের অন্যতম আগ্রহের বস্তু ছিলো এটি। এই নদী পথে একসময় ‘হোরমিলার অ্যাণ্ড কোম্পানি’র লঞ্চ চলাচল করতো। মেদিনীপুর, ঘাটাল, কলকাতা ও বাংলাদেশে যেতো। এখানকার যোগীবেড় ও ধর্মবেড়ের শঙ্খশিল্প ও বাঁশশিল্প, রাইন – কোলার শোলাশিল্প, ভোগপুর, দেঁড়িয়াচক ও সাগরবাড়ের তাঁতশিল্প, ভোগপুরের বিড়িশিল্প, যোগীবেড়ের আতসবাজি শিল্প, বৈষ্ণবচক, কুলহাণ্ডা ও খন্যাডিহির মহিষের সিংয়ের শিল্প, ঘুনি মুগরির শিল্প, নদী তীরবর্তী এলাকার হোগলা পাতার শিল্প ও নৌশিল্প তো বিখ্যাত। কোরোনা এসে প্রতিটি শিল্পে ‘ঢ্যারা’ ফেলে দিয়েছে।

কোলাঘাট মানেই ফুলের রমরমা বাণিজ্য কেন্দ্র। সব ধরনের ফুলের বেচাকেনা এখানে হয়। এখান থেকেই সাগরমেলার বেশিরভাগ হোগলা পাঠানো হয়। ঢাকিদের গ্রাম ধর্মবেড় রয়েছে। সাহিত্য সংস্কৃতিতেও জেলার মধ্যে অনেক এগিয়ে এই কোলাঘাট। তাপস কান্তি রাজপণ্ডিত, মহাদেব চক্রবর্তী, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, বৈরাগ্য চক্রবর্তী, ড. শ্যামল বেরা প্রমুখ এই কোলাঘাটের প্রোথিতযশা কবি সাহিত্যিক ও গবেষক। কোলাঘাটের বিশিষ্ট সমাজসেবী অসীম দাসের কথায়, আজ কোলাঘাট যেন থমকে গিয়েছে কোরোনায়। নদীর জলের ঢেউয়ের সেই উন্মাদনতা হয়তো আছে আগের মতই, কিন্তু আমরা কোলাঘাটবাসীরা তা উপভোগ করতে পারছিনা।

আরও পড়ুন: পরিযায়ী শ্রমিকদের বিনা খরচায় ফেরানোর দাবিতে বাম-কংগ্রেসের অবরোধ

আসলে কাজ বন্ধ। ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ। হাতে পয়সা নেই। নদীতে মাছ ধরা বন্ধ। ফুল বাজারে ক্রেতা নেই। অনেক আগে এখানকার ফুলের বানিজ্য নিয়ে সাহিত্যিক সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন ‘ফুলের লোকালে ফেরা’। এখানেই একসময় থাকতেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। কোলাঘাটেই জন্ম মধ্যযুগের দুই কবি নিত্যানন্দ চক্রবর্তী ( কানাইচক ) এবং দয়ারাম দাসের ( কিশোরচক )। সেসময় বসন্ত রোগের প্রাদুর্ভাব ছিল। তখন মানুষজনকে শীতলার ‘চান জল’ পান করানোর রেওয়াজ ছিল। শীতলার গুণগান নিয়েই তাঁরা লিখেছিলেন ‘শীতলামঙ্গল’ কাব্য। এবারে কোরোনা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। কিন্তু কিভাবে মুক্তি মিলবে, তা কোলাঘাটবাসী জানেনা।

ট্রেন চলছে না। দোকান বন্ধ। মানুষের রুজিরুটিতে পুরোপুরি ‘লক আউট’। উৎপাদন হচ্ছে না। এমতবস্থায় কি করে ভালো থাকবে কোলাঘাটের সংস্কৃতিবান মানুষজন? এখানকার বিধায়ক ইব্রাহিম আলির কথায়, ‘চরম দুর্দিন চলছে দেশজুড়ে। কোলাঘাটের মানুষও তার আঁচ পাচ্ছে। সকলকে এইসময় ঐক্যবদ্ধ হয়ে সামলাতে হবে সবকিছু’। নদীর পাড় জুড়ে সার বাঁধা নৌকা। সব নিশ্চল, নিষ্কম্প এবং নিস্তেল। সরব কোলাঘাট এখন নীরব। কোলা ইউনিয়ন হাইস্কুলের শিক্ষক সুজন বেরার কথায়, ‘তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দূষণ একসময় অন্যতম চর্চার বিষয় ছিল কোলাঘাটবাসীর কাছে। আজ সেসব অতীত। কবে আবারও ছন্দে ফিরবে জনজীবন, তাই নিয়েই চিন্তিত সকলে। সেই ভাবনায় জারিত সকলেই’।

রূপনারায়ণের দুপাড়ে অসংখ্য মানুষের মূল পেশা মাছ ধরা ও দিন মজুরি করা। বেশিরভাগই এখন বন্ধ। উপার্জনও বন্ধ। এখনও মাছ ধরার মরসুম শুরু হয়নি। একদিকে লক ডাউন, অন্যদিকে নদীতে মাছের অপ্রতুলতা। সব মিলিয়ে কোলাঘাটের মাঝি মাল্লাদের জীবনেও চরম অস্থিরতা। চরম যন্ত্রনা। কোলাঘাট মানেই তো রূপনারায়ণ নদ। আর এখানকার প্রায় মহার্ঘ্য হয়ে ওঠা রূপোলী ইলিশ। আর জোয়ার ভাটার আবেগঘন যাওয়া আসা। কাঠচড়া ময়দান জুড়ে শুধুই নির্লিপ্ততা। নদীর বুকে পালতোলা নৌকা হাঁকিয়ে ইলিশ শিকারিদের আর হাঁক শোনা যায় না। কেমন যেন থমকে গিয়েছে কোলাঘাটের নদীর পাড়। কোলাঘাটের গরিবগুর্বোদের যেন ‘কালীয়দমন’ করছে কোরোনা। আর তাঁদের বুকচাপা কান্নার আওয়াজ হারিয়ে যাচ্ছে নদীর পাড় জুড়ে ক্ষণে ক্ষণে ঘোলা জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দে

Related Articles

Back to top button
Close