fbpx
ছবিহেডলাইন

কৃষ্ণকলি সুচিত্রা………

যুগশঙ্খ ডিজিটাল ডেস্ক: তাঁর জন্ম চলন্ত ট্রেনে। গুজাণ্ডি স্টেশনের নামের সঙ্গে মিলিয়ে তাঁর ডাক নাম রাখা হল গজু।  ছোট থেকেই যেকোনও গান শুনলে সঙ্গে সঙ্গে তুলে ফেলার ক্ষমতা ছিল।  শুধু স্কলারশিপ নয়, দিদিদের উৎসাহতেই গেলেন শান্তিনিকেতনে।  সালটা  ১৯৪১।  রবীন্দ্রনাথহীন শান্তিনিকেতনে পেলেন ইন্দিরাদেবী চৌধুরাণী, শৈলজারঞ্জন মজুমদার, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় সহ আরও অনেককে। প্রথম প্রথম মন বসাতে কষ্ট হয়েছিল। কিন্তু তারপর মানিয়ে নিয়েছিলেন। দীর্ঘ ২১ বছর অধ্যাপনা করেছেন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর শুনিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের গান। কালো হরিণ চোখে, একলা চলার ডাক দিয়ে গানের ঝরণাতলায় যিনি আজও আছেন তিনি আমাদের সুচিত্রা মিত্র। আজ তাঁর জন্মদিন।

‘রবীন্দ্রনাথ নেই, অথচ শান্তিনিকেতন – ভাবা যায় না – সেটা আরও পেইনফুল। চোখের জলকে বাধা দেবার উপায় ছিল না। কিন্তু তবুও দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে মনে মনে বলেছিলাম – না, কাঁদলে তো চলবে না। শক্ত হতে হবে। এখন আমায় বড় হতে হবে।’

‘আজকে ৩০  অর্থাৎ আমি শান্তিনিকেতনে এসেছি ৪ দিন। এখনও বাড়ি যেতে ২২ দিন বাকি আছে। কবে যে ছুটি হবে? আজকে শৈলজাদা নাকি রত্নাদিকে জিজ্ঞাসা করেছেন আমার এখানে কীরকম লাগছে।’ (আমার না বলা কথা)…সুচিত্রা মিত্রের এই স্মৃতিচারণা মনে পড়ে যায় উপরের এই ছবিটি দেখলে।  বহু পুরনো ছবি।  সঙ্গীতভবনে শৈলজারঞ্জন মজুমদারের পাশে সুচিত্রা মিত্র। ছবিতে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ও আছেন।  মাটিতে বসে মায়া সেন ও গীতা ঘটক। পেছনে সুভাষ চৌধুরী ও সুপর্ণা চৌধুরী।

‘কী সুর বাজে আমার প্রাণে/আমি জানি মনই জানে।’ মনের সেই কথা প্রথম রেকর্ডবন্দি হয় ১৯৪৫ সালে। এইচ এম ভি থেকে প্রকাশিত সেই রেকর্ডে ছিল ‘মরণরে তুঁহুঁ মম শ্যাম সমান’ ও ‘হৃদয়ের একূল ওকূল দুকূল ভেসে যায়’। আকাশবাণীতেও ছিল তাঁর অবাধ যাতায়াত।

এক সাক্ষাৎকারে শিল্পী বলেছেন – ‘রবীন্দ্রনাথের গান আমার জীবনে আলো বাতাসের মতো। আমার জীবনে এর থেকে বড় অবলম্বন আর বোধহয় কিছু নেই। আমার কাছে রবীন্দ্রনাথের গান অন্ধের যষ্টির মতো। মানুষের মনে কতরকম ভাবধারা  আছে। সমস্ত ধরনের ভাবধারার প্রকাশ রবীন্দ্রনাথের গানে। একটি দিনও আমি তাঁর গান ছাড়া থাকতে পারি না।’ ১৯৮৯ সালে এইচ এম ভি থেকে ‘ট্রিবিউট টু টেগোর’ শীর্ষক এক রেকর্ডে উস্তাদ আমজাদ আলি খান ও সুচিত্রা মিত্রের যুগলবন্দিতে বাঙালি আপ্লুত হয়েছিল।

সুচিত্রা মিত্র – কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় দুটি নাম শুধু রবীন্দ্রসংগীতের সঙ্গে যুক্ত নয়।  দু’জনেই শান্তিনিকেতনে থেকেছেন একসঙ্গে।  অভিন্নহৃদয় বন্ধুতা ছিল তাঁদের।  কণিকা বলছেন, ‘সুচিত্রা শান্তিনিকেতনে প্রথম যখন এল, তখন প্রথম আমরা ওর গান শুনি, ‘‘ঐ যে ঝড়ের মেঘে’’। এতো ভালো লাগল ওর গান শুনে। ওর গলা এত চমৎকার…।’ জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তাঁরা ছিলেন উভয়ের প্রশংসায় মুখর।

কমিউনিস্ট পার্টি পরিচালিত এবং উদ্বুদ্ধ যে সাংস্কৃতিক আন্দোলন অর্থাৎ ভারতীয় গণনাট্য আন্দোলনের অগ্রণী সৈনিকদের মধ্যে ছিলেন সুচিত্রা মিত্র।  এই আন্দোলনেই একসঙ্গে  জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, জর্জ বিশ্বাস, বিজন ভট্টাচার্য, বিনয় রায় সহ আরও অনেকের সঙ্গে সুচিত্রাও ঊঠেছেন মঞ্চে।  দিদিরা গণনাট্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে শান্তিনিকেতন থেকে ফিরে ১৯৪৫-এ তিনিও যোগ দেন।  উৎপল দত্তের স্মৃতিকথায়, মঞ্চে যখন তাঁরা প্রতিবাদী গান, নাটক করছেন তখন সুচিত্রা মিত্র রবীন্দ্রনাথের শান্তরস (‘সার্থক জনম আমার’) পরিবেশন করছেন হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে।

দু’জনেই সংগীত জগতের মানুষ। একজন রবীন্দ্রগান, অন্যজন আধুনিক গান।  তবে সুরের বিনিময়ও হয়েছে। মান্না দে-ও গেয়েছেন রবীন্দ্রসংগীত। আবার সলিল চৌধুরীর হাত ধরে সুচিত্রাও গেয়েছেন আধুনিক গান ‘সেই মেয়ে’।

মুখোমুখি মাসি বোনপো। হ্যাঁ, কিংবদন্তী অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মাসি ছিলেন সুচিত্রা মিত্র। সংগীত নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সৌমিত্র বলেছিলেন, নিজের কণ্ঠস্বরের নিয়ন্ত্রণ রাখার জন্য তিনি প্রতিদিন সারগম করেন। একটা সময় শহরের বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে তিনি ক্লাসিকল মিউজিক শুনেছেন।  সঙ্গীতের প্রতি তাঁর এই ভালবাসার পিছনে তিনি দু’জন মানুষের উৎসাহের কথা উল্লেখ করেন। সুচিত্রা মিত্র এবং সত্যজিৎ রায়।

‘জন্ম মোদের ত্র্যহস্পর্শে সকল অনাসৃষ্টি’ – না, অনাসৃষ্টি নয়। তিন ভিন্ন জগতের কিংবদন্তী যখন এক জায়গায়, তখন সৃষ্টিই হয়েছে। মৃণাল সেন, সুচিত্রা মিত্র এবং পবিত্র সরকার গভীর আলোচনায় ব্যস্ত।

‘আমার না বলা কথা’-য় শিল্পী বলছেন, ‘রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গেলাম। যার বোঝা এই সুদীর্ঘকাল ধরে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। অন্যের কথা জানি না।  কিন্তু রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী হিসেবে আমার খ্যাতি, আমার প্রতিপত্তি, আমার বিত্ত – অহর্নিশি আমাকে ছুটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে… জীবনে যা রেখে যেতে চেয়েছিলাম তার কিছুই পারিনি।’ কী পেয়েছেন আর কী পাননি তার হিসাব মেলাতে মন রাজি নয়, তবে ব্যক্তি জীবনের ওঠা-পড়া তাঁকে বিচলিত করলেও রবীন্দ্রসুর তাঁকে বরাবরই সাফল্য দিয়েছে। তাই আজও চোখ বন্ধ করলে যেন ভেসে ওঠে সদা চঞ্চল এক মানুষের দৃপ্ত উচ্চারণ, ‘… আমি রাজেন্দ্রনন্দিনী।  নহি দেবী, নহি সামান্যা নারী’। তিনিও তো সত্যিই তাই।

Related Articles

Back to top button
Close