fbpx
পশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

আন্তর্জাতিক বাজার থাকা সত্ত্বেও কৃষ্ণনগরের সরপুরিয়া,সরভাজা মিষ্টান্ন শিল্প আর্থিক সঙ্কটে ধুঁকছে

শ্যামল কান্তি বিশ্বাস, কৃষ্ণনগর: মাটির পুতুলের শহর কৃষ্ণনগর। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ,প্রমথ চৌধুরী ,আজিজুল হকদের স্মৃতিবিজড়িত এই শহর সরপুরিয়া ,সরভাজা উৎপাদন ও পরিষেবায় আন্তর্জাতিক সম্মান পেয়েছে। একসময় বাংলার রূপকার ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের খাবার হিসাবে পাঠানো হতো কৃষ্ণনগরের সরপুরিয়া, সরভাজা ।ভারতরত্ন রাজীব গান্ধী ও মহানায়ক উত্তম কুমার কৃষ্ণনগরের সরপুরিয়া,সরভাজার সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। অভিনেত্রী সুচিত্রা সেন,গায়ক মান্নাদে ,অভিনেত্রী দেবশ্রী রায়,লোক শিল্পী অমর পালদের পছন্দের খাবার হয়ে উঠেছিল এই সরপুরিয়া, সরভাজা।ইসকনের বিদেশি সাধুরা নিত্যদিনের সঙ্গী করে নিয়েছিলেন এই সরপুরিয়া,সরভাজাকে। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আমল থেকেই এই সরপুরিয়া, সরভাজার প্রচলন। কৃষ্ণনগরের মহারাজের আমন্ত্রণে ২০ জন কারিগর এই শহরে এসেছিলেন।এরাই এই সরপুরিয়া,সরভাজাকে জনপ্রিয় করে তোলেন।

রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভায় বহু পাত্রমিত্রকে এই মিষ্টি তৃপ্তি দান করেছিল। গোপাল ভাঁড় হয়তো বা এইসব নিয়ে কতনা কাণ্ড ঘটিয়েছে। সমগ্র কৃষ্ণনগর শহরের অধিকাংশ মিষ্টান্ন প্রতিষ্ঠানগুলিতে তৈরি করা হলেও গুণগত দিক থেকে উৎকৃষ্ট পর্যায়ের মধ্যে অনন্ত হরি মিত্র লেনের অধর চন্দ্র দাস এন্ড সন্স ,পৌরসভার নিকটবর্তী নদিয়া সুইটস, বাসস্ট্যান্ডের শ্রী শ্রী সিদ্ধিদাতা মিষ্টান্ন ভান্ডার,সেন মহাশয়,চাষাপাড়ার বুড়িমা সুইটস,৯ নং রুটের আনন্দময়ী সুইটস, ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কে( উত্তরবঙ্গ বাস ডিপো সংলগ্ন) অর্থাৎ শঙ্কর মিষ্টান্ন প্রতিষ্ঠান ,পান্থতীরথ এবং নবদ্বীপ রোড ক্রশিংএ তারা মা সুইটস বিশেষ উল্লেখযোগ্য । আসল স্বাদ ও গুণগতমান বিচার করতে হাজির হয়েছিলাম ,একমাত্র আদিও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান,নেদিয়ার পাড়া অনন্তহরি মিত্র লেনের অধর চন্দ্র দাস এন্ড সন্স এ।কথা হচ্ছিল প্রতিষ্ঠানের বর্তমান মালিক তরুণ আইনজীবী গৌতম দাস এর সঙ্গে। গৌতম বাবু পেশায় আইনজীবী হলেও একজন দক্ষ মিষ্টান্ন কারিগর। একাধিক নতুন মিষ্টির উদ্ভাবক তিনি। গৌতম বাবু এই ব্যাবসা পেয়েছেন উত্তরাধিকারসূত্রে।

এখানকার উৎপাদিত দ্রব্যের বিশেষত্ব, স্বাস্থ্যকর ,প্রোটিনযুক্ত, কেমিক্যাল বর্জিত খাবার। গৌতম বাবুর মতে এটা সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র কারিগরি দক্ষতায় নয়,পারিবারিক ঐতিহ্য ও গুণগত মানের জন্যই। কৃষ্ণনগরের মিষ্টান্ন শিল্পে গৌতম বাবুর বাবা জগবন্ধু দাসের অবদান অসামান্য । সর্ব মোট ১৩ রকমের মিষ্টির উদ্ভাবক তিনি। এই মিষ্টান্ন প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠে গৌতম বাবুর পিতামহ স্বর্গীয় অধর চন্দ্র দাস এর আমলে ।পিতৃ পুরুষেরা যথাক্রমে বংশপরম্পরায় পারিবারিক সহায়তায় মিষ্টি তৈরি করে বাড়ি বাড়ি ফেরি করে এই মিষ্টি বিক্রি করতেন। ১৩০৯ সালে অধর চন্দ্র দাস কৃষ্ণনগর নেদিয়ার পাড়ার অনন্তহরি মিত্র লেনের এই দোকানটি নির্মাণ করেন। ১৩৮০ সালে এই প্রতিষ্ঠানটি দুটি ভাগে বিভক্ত হয়।

আরও পড়ুন: পূর্ব মেদিনীপুরে আমফানে ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ বিলোচ্ছে হিন্দু জাগরণ মঞ্চ

অধর চন্দ্র দাস এর বড় ছেলে আদি নাম রাখেন যার বর্তমান মালিক গৌতম দাস কিন্তু ছোট ছেলে পতিতপাবন দাস দোকানের নামকরণে কিছুটা পরিবর্তন আনেন,অধর মিষ্টান্ন প্রতিষ্ঠান। এই দুটি দোকানের অবস্থান পাশাপাশি। এই মিষ্টান্ন উৎপাদন ও পরিষেবায় দেশ তথা বিশ্ব ব্যাপী খ্যাতি। কৃষ্ণনগরের মিষ্টান্ন শিল্পীদের নাম ও উৎপাদিত দ্রব্যের আন্তর্জাতিক বাজার থাকা সত্ত্বেও আর্থিক সংকটের পাশাপাশি সম্প্রতি করোনা আবহে আর্থিক সংকট তৈরি হ ও য়া য় কৃষ্ণনগরের মিষ্টান্ন শিল্পীরা আজ মার খাচ্ছে। গৌতম বাবু অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে জানালেন, বহু চেষ্টা সত্ত্বেও আমরা এই শিল্পের উন্নয়নে ব্যাংক লোন পাচ্ছিনা।

অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবসায়ীগণ হতাশাগ্রস্থ হলেও বর্তমান সরকারের উপর আর ভরসা রাখতে পারছেন না। আগামী তে কোন নতুন সরকার আসলে অবস্থার পরিবর্তন হয় কিনা, সেই আশাতেই সকলে বুক বাঁধছেন।গুণগতমান থাকা সত্ত্বেও আর্থিক সংকটে প্যাকেটজাতকরণ ও চাহিদা অনুযায়ী বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে না জগদ্বিখ্যাত এই সরপুরিয়া ,সরভাজা মিষ্টান্ন সামগ্রী কে। তৈরীর প্রাথমিক উপাদান সমূহ:- “সরপুরিয়া”- এর সঙ্গে মেশানো হয় বিভিন্ন মসলা, বাদাম ,ছোট এলাচ ,এই অবস্থায় কিছুক্ষণ রেখে খাঁটি দুধের সর দিয়ে তাকে আবৃত করা হয়। সরের ভিতরে দেয়া হয় বলে এই মিষ্টির নাম সরপুরিয়া।” সরভাজা”- সরভাজা তৈরি হয় পুরো পুরি সর দিয়ে।সরের উপর চাপানো দুধ থেকে প্রস্তুত(দুধ ফেটিয়ে) একপ্রকার ক্রিম জাতীয় উপকরণ এবং এদের ছয় থেকে সাতটি স্তরের রূপান্তর ঘটে ,সবশেষে ভাজা হয়। এই জন্যএর নাম সরভাজা।

Related Articles

Back to top button
Close