fbpx
ব্লগহেডলাইন

উড়তে শেখার পরেও ফিরবে তো লক্ষ্মী? ভেবেই আকুল বছর দশের দেবজ্যোতি

শান্তনু অধিকারী, সবং: বয়স আর কতটুকু! দিন কুড়ি হবে। এরই মধ্যে এক-পা এক-পা চলতেও শিখেছে সে। ছোট্ট গণ্ডির মধ্যেই জারি তার ‘বড়’ হয়ে ওঠার প্রাণপণ প্রচেষ্টা। আর এভাবেই যদি একদিন ‘ছোট্ট ছোট্ট পায়ে চলতে চলতে’ উড়ে যায় সে? আর যদি না ফেরে? তা ভেবেই আকুল বছর দশের দেবজ্যোতি।

দেবজ্যোতি সাউ। দশগ্রামের বাসিন্দা, স্থানীয় দশগ্রাম এস এস শিক্ষাসদনের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। দিন কুড়ি আগে হঠাৎই ‘তাকে’ খুঁজে পায় সে। উঠোনের এক কোণে জমা শুকনো ডালপালার মধ্যে। ছোট্ট সাদা গোল বলের মতো একটি প্রাণী। থরথর করে কাঁপছে। ইতিমধ্যে সে প্যাঁচার ছবি দেখেছে। অনেকবারই আঁকার খাতাতেও এঁকেছে। তাই দেবজ্যোতির বুঝতে অসুবিধা হয় না, এটি আসলে একটি প্যাঁচার সদ্যজাত শাবক। কোনওভাবে সে আশ্রয়চ্যুত হয়েছে। এদিকে দিনের আলো ফুটেছে। সে বুঝতে পারে, শাবকটির জীবন বিপন্ন। অন্যান্য কাকপক্ষী শাবকটির সন্ধান পেলে মেরেই ফেলবে। ফলে সিদ্ধান্ত নিতে আর দেরি করেনি । বছর দশের দেবজ্যোতিই শিখিয়ে দিল মানবতার নতুন পাঠ। সে সযত্নে শাবকটিকে তুলে এনে ঠাঁই দিল বাড়িতে। আপাতত একটি ঝুড়ির মধ্যেই রাখা তাকে। দেবজ্যোতি আদর করে তার নাম দিয়েছে ‘লক্ষ্মী’।

এই এতটুকু একটা শাবক, মা ছাড়া বাঁচতে পারে! দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন দেবজ্যোতির বাবা লক্ষ্মণচন্দ্র সাউও। তিনি জানালেন, ‘ছেলেকে প্রথম বারণ করেছিলাম। কারণ আশঙ্কা ছিল, শাবকটি মানুষের সান্নিধ্যে এলে আদৌ বাঁচবে কিনা! প্যাঁচা কখনও পোষ্য হয় বলেও তো শুনিনি।’ কিন্তু অবশেষে ছেলের জেদের কাছে হার মানেন তিনি। লক্ষ্মনবাবুর অকপট স্বীকারোক্তি, ‘চিন্তা করলাম, ছেলে তো ভালো কিছুই করার চেষ্টা করছে। তাই আর ওকে বাধা দিইনি।’ শুধু সমর্থন জানানোই নয়, লক্ষ্মীকে বড় করে তোলার লড়াইয়ে তিনিও আজ ছেলের সহযোদ্ধা।

লক্ষ্মণবাবু জানালেন, ‘সন্তানকে হারিয়ে একজন মা কতখানি কাতর হয় জানি।’ ছোট্ট দেবজ্যোতিও জানে মায়ের আদরের কোনও বিকল্প হয় না। তাই রোজ সন্ধে নামলেই লক্ষ্মীকে বাড়ির বাইরে আনা হয়। ঝুলিয়ে দেওয়া হয় ঝুড়িসমেত উঠোনেরই একটি বেলগাছের ডালে। যাতে ওর মা ওকে খুঁজে পায়। যাতে লক্ষ্মী ফিরে পায় তার মাতৃসুধা। তাঁদের ভাবনা সার্থক হয়েছে। লক্ষ্মণবাবুই জানালেন, রোজ রাত নামলেই ওর মা আসে। লক্ষ্মীও তার মায়ের আদরে সোহাগে কাটিয়ে দেয় সারারাত। লক্ষ্মণবাবু রাতে বার তিনেক উঠে দেখে আসেন। তারপর ভোরের আলো ফোটার আগেই মা চলে গেলে ঘরের লক্ষ্মী আবার ঘরেই ফেরে।

আরও পড়ুন: করোনা মোকাবিলা নিয়ে বিশেষ মন্ত্রীগোষ্ঠীর বৈঠক, সুস্থ হওয়ার হার বেড়েছে বলছে রিপোর্ট

লকডাউনের জেরে স্কুল বন্ধ। লেখাপড়ার ঘাটতি মেটাতে দেবজ্যোতিকে নিয়ম করেই বইখাতা নিয়ে বসতে হয়। কিন্তু তার মন পড়ে থাকে লক্ষ্মীর দিকে। খেলাপ্রিয় ছেলেটির এখন মাঠেও যাওয়া হয় না। লক্ষ্মীই এখন তার রোজকার মুহূর্তযাপনের সঙ্গী। কোলে নিয়ে লক্ষ্মীর মাথায় হাত বোলানোতেই তার অনন্ত তৃপ্তি। শুধু কি তাই? লক্ষ্মীর ঠোঁট আলতো ফাঁকা করে আটার পিটুলি, মুড়ি খাইয়ে দিতেও দেবজ্যোতি হয়ে উঠেছে সিদ্ধহস্ত।

প্রকৃতি ও মানুষের সংঘাতময় পৃথিবীতে দেবজ্যোতির এমন কাণ্ড যে নতুন দৃষ্টান্ত হবে, তা মানছেন তার স্কুলের প্রধানশিক্ষক যুগল প্রধানও। জানালেন, ‘এ পৃথিবী এখন বন্যপ্রাণের বধ্যভূমি। মাছ খাওয়ার অপরাধে মাছরাঙাকেও মেরে ফেলা এখন দস্তুর। দেবজ্যোতি একটি প্যাঁচার শাবককে বাঁচাতে যা করেছে, তাতে আমরা খুব খুশি। চাইব, ওর দৃষ্টান্ত বড়দেরও শিক্ষা দিক।’ শিক্ষা দেবে কিনা, পরের ব্যাপার। কিন্তু দেবজ্যোতির মনে আজ থেকেই ছড়িয়েছে আশঙ্কার মেঘ। উড়তে শেখার পর লক্ষ্মী যদি আর না ফেরে?

দেবজ্যোতি কখনও খৈরি বাঘিনীর নাম শোনেনি। যাকে একদিন শাবক অবস্থায় খৈরি নদীর পাড় থেকে উদ্ধার করে এনেছিলেন সিমলিপাল ব্যঘ্র প্রকল্পের অধিকর্তা সরোজরাজ চৌধুরী। নদীর নামেই বাঘিনীশাবকের নাম দেন খৈরি। তারপর সেই ছোট্ট খৈরিকে তিনিই বড় করে তোলেন। তাকে বড় করে তুলতে সরোজবাবু শহরের আশ্রয় ছেড়ে বন লাগোয়া বাংলোতে এসে ওঠেন। যাতে খৈরিকে তার পছন্দসই একটা পরিবেশ দিতে পারেন। পরবর্তীকালে সেই খৈরি হয়ে উঠেছিল সরোজবাবুর পরিবারেরই এক সদস্য। কিংবা বাংলাদেশের সেই ‘কামিনী’ নামের কাকটি? মানুষের সাহচর্যে শুধু পোষই মানেনি, কথাও বলতে শিখেছে সে।

ছোট্ট লক্ষ্মীও বড় হবে একদিন। ইতিমধ্যে বনদপ্তর জানিয়েছে, ‘খুঁড়ুলে’ জাতের এই শাবকটি আর কয়েকদিন পরেই উড়তে শিখবে। তখন সে বেরোবে রাতের আকাশ পরিক্রমায়। তারপর দিনের আলো ফুটলে সে আর ফিরে আসবে কিনা তার ভালোবাসার ঘরে, তা ভেবেই আকুল দেবজ্যোতি। তবে ভরসা একটিই, ভালোবাসার অক্ষরে এমন রূপকথার গল্প কিন্তু আজও লেখা হয় পৃথিবীতে!

Related Articles

Back to top button
Close