fbpx
গুরুত্বপূর্ণব্লগহেডলাইন

যেন ভুলে না যাই: নোয়াখালি

তথাগত রায়: আজ ১০ই অক্টোবর। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা বা বরাক উপত্যকার সাধারণ বাঙালি হিন্দুর কাছে এই দিনটির তাৎপর্য জানতে চাইলে কোনও উত্তর না মেলাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাৎপর্য আছে। এটি সেই দিনটি, যেদিন ১৯৪৬ সালে পূর্ববাংলার নোয়াখালি জেলায় (বর্তমান বাংলাদেশের নোয়াখালি, লক্ষ্মীপুর ও ফেনী জেলার সমষ্টি) ও সন্নিহিত কুমিল্লা জেলার চাঁদপুর অঞ্চলে, অভিনীত হয়েছিল এক কুনাট্য, যার সংক্ষেপে নাম হিন্দু নির্যাতন। সে বছর কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো পড়েছিল এই দিনটিতে, কিন্তু মা লক্ষ্মীর আশীর্বাদের বদলে নোয়াখালির সংখ্যালঘু হিন্দুদের জন্য এই দিনটি বয়ে এনেছিল এক অবিমিশ্র অভিশাপ।

ঘটনাটি পৃথিবী বিখ্যাত হয়েছিল তার কারণ, গান্ধীজি সেই সময়, যদিও নির্যাতন প্রশমিত হয়ে যাওয়ার পরে, নোয়াখালি পরিভ্রমণ করেছিলেন এবং বলে রাখা ভালো, পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন লুই ফিশারের মতো আন্তর্জাতিক মানের সাংবাদিক, এবং মুরিয়েল লেস্টার, এভি ঠক্করবাপা, প্যারেলাল, ইত্যাদিদের মতো তাঁর নিয়মিত সঙ্গীরা| বাঙালি উল্লেখযোগ্য তিনজন ছিলেন নৃতত্ত্ববিদ নির্মলকুমার বসু, আইসিএস অফিসার শৈবাল গুপ্তের স্ত্রী অশোকা গুপ্ত এবং সুচেতা কৃপালানি দোভাষীর কাজটা প্রধানত এঁরাই করেছিলেন।

তার মাত্র দু’মাস আগেকার কলকাতার দাঙ্গার মত নোয়াখালির হিন্দুনির্যাতন কেন্দ্রীয় স্তরে পরিকল্পনা করে ঠিক হয়নি। এর হোতা ছিল গোলাম সারোয়ার নামে জেলারই এক পীরবংশের সন্তান, যাকে সেবার মুসলিম লীগ টিকিট দেয়নি, তাই সে ঠিক করেছিল হিন্দুহত্যা করে শিরোনামে উঠে আসবে। এর জন্য সে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে হিন্দুদের বিরুদ্ধে ঘৃণা জাগ্রত করতে শুরু করে।

উল্লেখ্য, সেই সময় নোয়াখালি জেলায় হিন্দুরা ছিলেন মাত্র কুড়ি শতাংশ (বৰ্তমানে দুই-তিন শতাংশের বেশি হবে না), কিন্তু তারা আশি শতাংশ মুসলমানের তুলনায় অবস্থাপন্ন ছিলেন। অবস্থাপন্ন মানে তারা যে সবাই টাকায় গড়াগড়ি খাচ্ছিলেন তা নয় – কিছু জমিদার ছিলেন, কিন্তু বেশিরভাগই ছিলেন স্কুলমাস্টার, করণিক, ছোট ব্যবসায়ী, দোকানদার, ইত্যাদি। অপরপক্ষে মুসলমানেরা প্রায় সবাই ছিল দরিদ্র চাষি, অনেকেই হতদরিদ্র – যার ফলে গোলাম সারোয়ারের পক্ষে উত্তেজনা তৈরি করাটা অনেক সহজ হয়েছিল। এবং এর সঙ্গে অবশ্যই ছিল মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনরা, চরম মৌলবাদী একটি গোষ্ঠী।

কি ভাবে এই উত্তেজনা তৈরি করা হয়েছিল তার বিবরণ দিয়েছেন নোয়াখালির সিন্দুরকাইত গ্রামের মানুষ ডঃ দীনেশচন্দ্র সিংহ, যিনি ভারতে এসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারি রেজিস্ট্রার হয়েছিলেন| এর একটি-দুটি উদাহরণ, নোয়াখাইল্যা ভাষায়:
“ভাই ছাবেরা, আমনেরা যে চিয়ন চিয়ন চাইল হদস করেন হেইগুন কে খায় — ইন্দুরা” (আপনারা যে সরু চালের চাষ করে সেগুলো কে খায় — হিন্দুরা)।

“ভাই ছাবেরা, আমগো বিবিগো গা-গতর খারাপ অইলে তাগো গায়ে কে আত দেয় — ইন্দু ডাক্তাররা” (সহজবোধ্য)।
এইভাবে উত্তেজনা তৈরি হল, এবং মৌলবাদী ইমাম-মুয়াজ্জিনদের নেতৃত্বে রক্তপিপাসু আশি শতাংশ জনতা বেরিয়ে পড়ল অত্যাচারী হিন্দুদের শিক্ষা দেবার জন্য। শিক্ষার প্রণালী খুব সরল।হিন্দু নেতাদের খুন করা হবে| বাকিদের জোর করে মুসলমান করা হবে, এবং বাড়ির পোষা গরুটিকে কেটে তার মাংস খেতে বাধ্য করা হবে।এবং তার মধ্যে যুবতী মেয়ে থাকলে অতি অবশ্যই ধর্ষণ করা হবে| হত্যার আনন্দে মাঝে মাঝে নেতা নয় এমন লোকেদেরও খুন করা হবে।

এবার নির্মলকুমার বসুর, যাঁর কথা আগেই বলা হয়েছে, “ছেচল্লিশের ডায়েরি” বই থেকে একটি উদ্ধৃতি (আংশিকভাবে) দিলে পরিষ্কার হবে অত্যাচারের চেহারাটা কি রকম ছিল।

“শ্রীমতি বরমালা রায়, পতি মৃত মনোমোহন রায়, সাং গোবিন্দপুর, থানা বেগমগঞ্জ, জিং নোয়াখালি বর্ণনাপ্রদানকারিণী|
গত ১৪/১০/৪৬ ইং সোমবার সকালবেলা বহুলোক (তাহারা সকলেই মুসলমান) আমাদের বাড়িতে হানা দেয়| ইহাদের অনেকের মুখ দেখিলে চিনি, নাম বলিতে পারি না, একজনের নাম জানি, তাহার নাম মুছা। ইহারা সকলেই মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হইয়া আসিয়াছিল…..তাহারা দালানের কপাট ভাঙিয়া ভিতরে ঢুকিতে আরম্ভ করিলে আমরা ছাতে উঠি দুর্বৃত্তরা দালানের ছাতে উঠিয়া আমাদিগকে টানিয়া নামাইতে থাকে এবং কাহাকে কাহাকেও নিচে ফেলিয়া দেয়… বাড়ির পুরুষ অনেককেই মারধর এবং ছুরি বল্লমাদির দ্বারা আঘাত করা হইতেছে….আমার ভাসুর দীননাথ রায়কে পূর্বেই পূর্বেই দুর্বৃত্তরা মাথায় আঘাত করিয়াছিল।তিনি আমাদের সঙ্গেই ছিলাম এবং তাহার স্ত্রী তাহার শুশ্রুষা করিতেছিলেন। দীননাথ রায়কে আমাদের নিকট হইতে ছিনাইয়া লইয়া দুর্বৃত্তরা তাহাকে দুর্গামণ্ডপে দিকে লইয়া গিয়া আগুনে নিক্ষেপ করে…আমার দেওর রমণীমোহন রায়কে…..বাঁধিয়া জীবন্ত অবস্থাতেই আগুনে নিক্ষেপ করে।

এই বিবরণ আমাকে পড়িয়া শুনানো হয় এবং ইহার মর্মার্থ জানিয়া ইহাতে নাম সহি করিলাম। ইতি নোয়াখালি ১৭/১০/৪৬ ইং, স্বাক্ষর (শ্রীমতী) বরমালা রায়
[নির্মলকুমার বসু, “ছেচল্লিশের ডায়েরি” সম্পাদনা অভীককুমার দে, দীপ প্রকাশন, কলকাতা ২০১৬, পৃ ৪৪১]

গান্ধীজি নোয়াখালিতে এসেছিলেন ৭ই নভেম্বর ১৯৪৬-এ, থেকেছিলেন ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত| তাঁর উদ্দেশ্য ছিল প্রেম বিতরণ করে মুসলমানদের মধ্যে তাদের কাজ সম্বন্ধে অনুতাপ সৃষ্টি করা এবং হিন্দুদের তাদের আধপোড়া বাড়িতে ফিরিয়ে আনা।গান্ধীজি নোয়াখালিতে প্রাণপাত পরিশ্রম করেছিলেন, গ্রাম থেকে গ্রামে ছুটে বেরিয়েছিলেন, কিন্তু দুটিতেই তিনি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিলেন। সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে এর জন্য কোনও অনুতাপ দেখা যায় নি, তারা গান্ধীজি পরদিনের চলার পথে ভাঙা কাঁচের টুকরো ও বিষ্ঠা ছড়িয়ে রাখত। আর হিন্দুদের অবস্থা ? অশোকা গুপ্ত একটি অল্পবয়সী দম্পতির কথা লিখেছেন, যাদের তিনি বহু সাধ্যসাধনা করে লক্ষ্মীপুর থানায় এনে নালিশ লেখাতে পেরেছিলেন।অত্যাচার শেষ হয়ে যাবার দু’মাস পরেও প্রতি রাতে মুসলমানেরা মেয়েটিকে উঠিয়ে নিয়ে যেত এবং ‘ব্যবহার’ করে সকালবেলা ফেরত দিয়ে যেত।

[অশোকা গুপ্ত, নোয়াখালির দুর্যোগের দিনে, নয়া উদ্যোগ, কলকাতা, ১৯৯৯, পৃ ৩৪]
লুই ফিশার লিখেছেন, গান্ধীজি নাকি ধর্ষিতা-হতে-যাচ্ছে এমন হিন্দু মেয়েদের উপদেশ দিয়েছিলেন তারা যেন ধর্ষণকারীদের প্রতি কোনও বিদ্বেষ পোষণ না করে, এবং পারলে যেন আত্মহত্যা করে । মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।

[Fischer, Louis, The Life of Mahatma Gandhi, Harper and Row, New York, p. 450]
এই ক্ষুদ্র নিবন্ধটির উদ্দেশ্য এর শিরোনামের মধ্যেই নিহিত আছে। অর্থাৎ, যেন ভুলে না যাই ।

………………………………

লেখকের মতামত নিজস্ব)

Related Articles

Back to top button
Close