fbpx
অফবিটপশ্চিমবঙ্গশিক্ষা-কর্মজীবনহেডলাইন

আট অনাথ শিশুর আজীবন পড়াশোনার দায়িত্ব…. ‘গরীবের মাস্টারমশাই’ নিজের বিয়েতে নিজেকেই দিলেন সেরা উপহার

যুগশঙ্খ ডিজিটাল ডেস্ক: নিজের জীবনকে দৃষ্টান্ত হিসাবে তৈরি করেছেন, আসানসোলের জামুড়িয়ার তিলকা মাঝি আদিবাসী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাস্টারমশাই দীপ নারায়ণ নায়ক ছাপ রাখলেন নিজের বিয়েতেও। দারিদ্রতাকে টপকে আকাশছোঁয়ার স্বপ্ন ছিল তাঁর চিরকালই। গরিবিয়ানা কী, ছোটবেলা থেকেই তা বুঝেছেন সামান্য ওষুধের দোকানের চাকরি করা বাবার ছেলে! নিজে কোনওদিনও নতুন বইয়ের গন্ধ শোকেননি, পরনে জোটেনি নতুন জামাও। কিন্তু তোয়াক্কা করেননি। পড়াশোনা চালিয়েছেন, আজ তাই তিনি ‘মাস্টারমশাই’। বলা ভালো ‘রাস্তার মাস্টারমশাই’। নিজের জীবনকে দৃষ্টান্ত হিসাবে তৈরি করেছেন, আসানসোলের জামুড়িয়ার তিলকা মাঝি আদিবাসী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাস্টারমশাই দীপনারায়ণ নায়ক ছাপ রাখলেন নিজের বিয়েতেও (Education Of Orphan )।

স্কুলে তাঁর পরিচিতি ছিল অন্যরকম। কোন ছাত্র স্কুলে আসতে পারছে না, বাড়িতে কার কী অসুবিধা, কোন ছাত্রের বই জুটছে না- সবই নখদর্পণে রাখতেন তিনি। হাতের তালুর মতো নিজের স্কুল, নিজের প্রত্যেক ছাত্রকে চিনতেন। গরীব এলাকার গরীব স্কুলে যে দিনমজুর পরিবারের ছেলেমেয়েরাই বেশি আসে, তা জানতেন। নিজের লড়াইটাকে মনে করেছেন প্রত্যেক মুহূর্তে আর খুদে পড়ুয়াদের মধ্যে দেখেছেন নিজের স্বপ্নপূরণের আশা।

দীপনারায়ণবাবু নিরন্তর ‘দ্বীপ’ জালানোর চেষ্টা করেছেন সেই প্রত্যেক দুঃস্থ পরিবারের ছেলেমেয়েগুলোর মধ্যে। কিন্তু মাঝে এল করোনা, তদুপরি অতিমারী পরিস্থিতি। লড়াইটা হল আরও কঠিন। কী অনলাইন ক্লাস, কীসের মোবাইল! যে পরিবারগুলো প্রতিনিয়ত লড়াই চালায় সংসারের চাল, নুন কেনার গার্হস্থ্য অনুশাসনে, তাঁরা কীভাবে নিজের ছেলেমেয়েদের অনলাইন ক্লাস করাবেন! অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত মানুষগুলোর অভিধানে যেন এই শব্দগুলোই অর্থহীন। দীপনারায়ণবাবুর লড়াইটা হল আরও কঠিন। প্রত্যেক পড়ুয়াদের নিয়ে এবার রাস্তায় ক্লাস করানো শুরু করলেন তিনি। সারাও পেলেন বিস্তর। মাস্টারমশাইকে ভালোবেসেই পড়ুয়ারা জড়ো হয়ে যেত নির্দিষ্ট সময়ে। তাঁদের বইখাতা কিনে দিয়েছেন। খাবার দিয়েছেন প্রত্যেকদিন। পুষ্টির অভাবে যে ছাত্রগুলোর চেহারায় ছাপ পড়ছিল, তাদের যত্ন নিয়েছেন বুকে আগলে।

আরও পড়ুন: আগামী ২২ বছরের হেনস্থার আশঙ্কায় চাকরি ছাড়লেন বৈশাখী

জীবনের অন্য একটি অধ্যায় শুরু করলেন বুধবার, ঝুমা পাত্রকে জীবনসঙ্গী করলেন। আর জীবনের সেই সেরা মুহূর্তে সাক্ষী রাখলেন নিজের ছাত্রদেরই। প্রীতিভোজের আসরে ছিল দীপনারায়ণবাবুর প্রত্যেক ছাত্র। কবজি ডুবিয়ে ভাত-মাংস খেয়েছে আধপেটা খেয়ে থাকা বাচ্চাগুলো। পেয়েছে ‘রিটার্ন গিফট’ও। না, তাতেও ছিল না কোনও আতিশয্যের ছোঁয়া। বর্ণপরিচয়- হ্যাঁ বিদ্যাসাগরের আদর্শকেই নিজের ছাত্র ও তাদের পরিবারের রন্ধ্রে ঢোকাতে চেয়েছেন দীপনারায়ণবাবু। কারণ সেই অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিত ছিলেন দুঃস্থ সেই পড়ুয়াদের মায়েরাও। যাঁদের অক্ষর জ্ঞান দিতে বদ্ধপরিকর দীপনারায়ণবাবু। বিতরণ করলেন শাড়ি ও শীতবস্ত্র। পাশাপাশি আজীবন ৮ অনাথ শিশুর লেখাপড়ার দায়িত্ব নিলেন তিনি। ৬০ বছরের বেশি অভিভাবকরা যাঁরা নিজেরা নাম লিখতে শিখেছেন, তাঁদের সম্মান দেওয়া হয়েছে এই প্রীতিভোজের আসর থেকে।
দৃঢ় কন্ঠে দীপনারায়ণবাবু বললেন, “ছোটোবেলা থেকে গরিবিয়ানার সঙ্গে লড়াই করেছি। তাই বুঝি। অনাথ শিশুদের দায়িত্ব নেওয়ার ইচ্ছাটা সেই থেকেই মনে ছিল।” স্বামীর পাশে থাকার অঙ্গীকার নিয়েছেন স্ত্রী ঝুমা পাত্র নায়কও। ৮ অনাথ শিশুর আজীবন পড়াশোনার দায়িত্ব, ‘গরীবের মাস্টারমশাই’ নিজের বিয়েতে নিজেকেই দিলেন সেরা উপহার।

Related Articles

Back to top button
Close