fbpx
অন্যান্যঅফবিটহেডলাইন

লকডাউন শিখিয়ে দিল ‘মগজের পুষ্টি’ কাকে বলে

প্রীতম সাঁতরা: সত্যজিৎ রায়ের ‘আগন্তুক’ সিনেমায় বাঙালি শুনেছিল ‘মগজের পুষ্টি’ শব্দবন্ধ। উৎপল দত্তের মুখে এই শব্দ জোড়া বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে মনে হয়। ‘স্ট্রাগল’ না বলে ‘মগজের পুষ্টি’। স্ট্রাগলকে তিনি স্ট্রাগল বলেন না, বলেন মগজ-মাংসপেশির পুষ্টি আর মানুষ চেনার প্রথম পদক্ষেপ।

চাকরির জন্য বাড়ি ছাড়া হওয়া বা হন্যে হয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোর ছবি তিলোত্তমায় নতুন কিছু নয়। পুরনো দিনে ফিরে তাকালে মিলবে হাজারো এমন উদাহরণ। পরিবারের পেট চালানোর তাগিদে বহু পুরুষ এসে দাঁড়িয়েছেন কলকাতার পথে পথে।তখনও প্যাডেল চালিত রিকসায় সড়গড় হয়নি তিলোত্তমা। চৌরঙ্গী দিয়ে তখনও ছুটে চলে টানা রিকশা। কানের পাশ দিয়ে ছুটে চলা মোটর গাড়িকে পাশ কাটিয়ে, ভিড় এড়িয়ে যাত্রীদের বাড়ি পৌঁছে দিয়েছেন বা দিচ্ছেন বহু টানা রিকশা।

                 আরও পড়ুন: কোনও টেস্ট ছাড়াই এবার কুকুরই বলে দেবে করোনা হয়েছে কিনা!

একসময় যারা হয়তো ছিলেন গ্রামের কোনও ক্ষেতখামারের ‘চাষাভুষো’। লাঙ্গলের হাল ছেড়ে তাদের ধরতে হয়েছে রিক্সার দুই হাতল। অল্প টাকা জমিয়ে মাথা গুঁজতে হয়েছে একচিলতে টিনের বা দরমার ঘরে। কাদা গলি, দুর্গন্ধ, রোগ ব্যায়রাম সঙ্গে নিয়ে কেটেছে দিন। কেউ বা এসেছেন পরিবার নিয়ে।

দিন যায় প্রতিদিন, সংগ্রাম নবীন। সন্ধ্যা নামা অন্ধকারে কিঞ্চিৎ সুরাপাত্রে পরের দিনের ইন্ধন যোগানো লিভারে। পেশা, পারিপার্শ্বিক বদলানো এই সংগ্রাম বদলেছে সাধারণ মানুষকে। এক পেশা বদলে নতুন পেশা, স্থান পাত্র বদলে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া, বেঁচে থাকার কৌশল ইত্যাদিই তো ‘মগজের পুষ্টি’। ‘স্ট্রাগল’ মনে করে কেন অহেতুক কষ্ট? এই লকডাউনের দিনগুলিতে অনেককেই বদলাতে হয়েছে নিজেদের পেশা। কিংবা সুবিধা মতো কাজের ধরণ। কেউ পাড়ায় পাড়ায় বিক্রি করছেন ফল-সব্জি, কেউবা সকাল বিকেল বিক্রি করছে চা। পরিস্থিতি বদলাতেই বদল এসেছে কাজে। স্বাভাবিক ধারা বদলে মানিয়ে নিতে হচ্ছে নতুন জীবনধারণের সঙ্গে। মাথা খাটিয়ে বেড় করতে হচ্ছে উপায়।

করোনা এড়াতে অনেকেই আবার ফিরে যাচ্ছেন যে যার গ্রামের বাড়ি। সেখানেই জমিতে কাজ করে যেটুকু অ্যায় হয় তাই সই। জীবন দির্ঘ হলে সঞ্চিত অর্থও হবে বেশি। তাই আপাতত অল্প সঞ্চয়ে বেঁচে থাকার তাগিদ।

দেশভাগ, নকশাল ইত্যাদির সাক্ষী থাকা কলকাতার কাছে এই অনিশ্চয়তা নতুন কিছু না। শুধু প্রশ্ন পত্রের বিষয় বস্তু বা ‘সাবজেক্ট’ নতুন। যারা পেশা বদলে গত কয়েক মাসে দিন গুজরান করেছেন এবং এখনও করছেন তাদের শতবার কুর্নিশ। আর যারা ‘স্টেটাস’ হারানোর ভয়ে কুণ্ঠা বোধ করছেন তাদের জন্য- চোখ তুলে তাকান, ওরাও মানুষ।

অবশ্য বর্তমান প্রেক্ষিতে সর্বাধিক অনিশ্চিয়তার মুখে পড়েছে আম-মধ্যবিত্ত পরিবার। সেখানে অবশ্য সামাজিক অবস্থান হারানোর ভয় খুব একটা থাকে না। পরিবারকে মোটের ওপর ভালো রাখাই চ্যালেঞ্জ। কোনও রকম একটা চাকরি জোটাতে পারলেই হল। মাস গেলে একটা পরিমাণ মতো অর্থ। এক পেশা থেকে আরেক পেশায় যাওয়ার ফলে যেমন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হচ্ছে, তেমনই সেই পেশায় যুক্ত কর্মীদের নিয়ে একটা ধারণাও জন্মাচ্ছে ধীরে ধীরে। জন্মাচ্ছে শ্রদ্ধা। বিপুল সংখ্যক মানুষ নিজেদেরকে প্রায় একই অবস্থানে দেখে কিছুটা আশ্বস্তও হতে পারেন। সঞ্চিত অর্থের পরিমাণ আচমকা কমে গেলে কেমন অনুভূতি হয় তার আঁচ কিছুটা হলেও পড়েছে উচ্চবিত্ত পরিবারগুলিতে। তাদের কপালেও পড়েছে ভাঁজ। সাম্যাবস্থা এখনও কল্পরাজ্য হলেও, আগামীতে বদলাতে পারে এই সমাজ।

Related Articles

Back to top button
Close