fbpx
কলকাতাগুরুত্বপূর্ণপশ্চিমবঙ্গবিনোদনহেডলাইন

আজও সর্বোত্তম উত্তম

অরিজিত মৈত্র: দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেল চল্লিশটা বছর। ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই বাংলা চলচ্চিত্রকে রিক্ত করে চলে গিয়েছেন মহানায়ক উত্তমকুমার। দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুরের মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায়ের অভিনীত ছবি আজ ইতিহাস হলেও, তাঁর জনপ্রিয়তা এতটুকুও কমেনি। মৃত্যুর চল্লিশ বছর পরেও মানুষের কাছে এমন জনপ্রিয়তা বড় একটা চোখে পড়ে না। ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ -র শুটিং করতে করতে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল তাঁর পথচলা। চুয়ান্ন বছর বয়সী নায়ককে ষোলো ঘন্টার প্রচেষ্টাতেও বাঁচাতে পারেননি চিকিৎসকেরা। সেদিনের সেই দুঃসংবাদে বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল বাঙালি। সবার প্রশ্ন ছিল একটাই  ‘উত্তমকুমার কি সত্যিই নেই?’

ভবানীপুরের গিরিশ মুখার্জি রোডের বাড়ির রাস্তা ভেসে গিয়েছিল জনসমুদ্রে। ভিড় সামলাতে হিমশিম খেয়েছিল পুলিশ-প্রশাসন। অবস্থা আয়ত্ত্বে আনতে পথে নামতে হয় পাড়ার স্থানীয় যুবকদের। সাংবাদিকরা ফোন করলে মহানায়িকা সুচিত্রা সেন শুধু একটা কথাই বলতে পেরেছিলেন  ‘হ্যাঁ, খবরটা পেয়েছি’। সত্যজিৎ রায়ের অনুভূতি ছিল ‘বাংলা ছবির দিকপালের মৃত্যু হল, ওঁর মতো স্টার আর হবে না’।  স্বভাবতই নির্বাক ও বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিলেন উত্তমকুমারের বৃদ্ধা মা চপলাদেবী ও সহধর্মিণী গৌরীদেবী ও পুত্র গৌতম।

তাঁর চলে যাওয়া যাত্রাপথের দুধারে হাতে লেখা পোস্টার  ‘গুরু তুমি ফিরে এসো’। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তর লেখা কবিতা আবৃত্তি করলেন মহানায়কের বান্ধবী-নায়িকা সুপ্রিয়া দেবী। রবীন্দ্রনাথ এবং বিধানচন্দ্র রায়ের শবযাত্রার পরে সম্ভবত এমন জনসমুদ্র প্রত্যক্ষ করেছিল মহানগরী কলকাতা।

অনেক বছরের ব্যবধানে বদলেছে গোটা পৃথিবী। বর্তমান বিশ্ব তো মারণরোগে আক্রান্ত। সচল শহরের রাস্তায় ভিড় কম। শহরের প্রেক্ষাগৃহের দরজা বন্ধ। সুতরাং প্রতি বছরের মতো উত্তমকুমার অভিনীত ছায়াছবিগুলি ফিরে দেখা একমাত্র উপায় ছোটপর্দা। আর গিরিশ মুখার্জি রোডের বাড়ির দরজাও বন্ধ। কারণ সরকারি নির্দেশ মেনে কোনওরকম অনুষ্ঠান করার থেকে বিরত থাকছেন মহানায়কের পরিবার। তবুও তো উত্তমকুমারের ৪০ তম প্রয়াণ দিবস, তাই বাঙালি ভুগছেন নস্টালজিয়ায়। প্রবীণেরা যাঁরা আজও আছেন, তাঁরা ফিরে ফিরে দেখছেন ৮০সালের ২৪ জুলাই দিনটিকে।

স্ত্রী ছবিতে উত্তমকুমার

মহানায়কের সতীর্থরা আজ আর অনেকেই নেই। তবু সাধারণ উত্তমপ্রেমীদের ভরসা টেলিভিশন। নব ঘোরালে যদি দেখা যায় ‘সপ্তপদী’,  ‘সাগরিকা’, ‘চাওয়া পাওয়া’, ‘সবার উপরে’,  ‘সন্ন্যাসী রাজা? কারণ চল্লিশ বছর পরেও চলচ্চিত্রপ্রেমী আর উত্তম অনুরাগীরা দেখতে চান সেই ভুবনভোলানো হাসি। আজও বাঙালির অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও জনপ্রিয় আইকনের কথা মনে করে বঙ্গবাসীর কানে অনুরণিত হয় ‘বিধাতার কাছে আমি জানি না তো কী চেয়েছি,  হিসাব রাখিনি কিছুই কতটুকু কী পেয়েছি, শেষের লগ্নে তাই কিছু ক্ষমা আমি চাই,  যাই চলে যাই’।

মহানায়ক অভিনীত শেষ ছবি ‘ওগো বধূ সুন্দরী’-র সেটে আয়োজিতে স্মরণ সভায় কাননদেবী, সুশীল মজুমদার, বিকাশ রায়, সৌমিত্র চট্ট্যোপাধ্যায়, তপন সিংহ এবং সত্যজিৎ রায়। ছবি সুকুমার রায়। সংবাদপত্র এবং অন্যান্য সামগ্রী তপন সিংহ ফাউডেশন।

তাঁকে স্মরণ করতে স্টুডিওপাড়ায উত্তমমূর্তিতে শ্রদ্ধা জানাবেন বিশিষ্টজনেরা। থাকবেন সাধারণ মানুষও। অন্যদিকে উত্তর কলকাতার আহিরিটোলা অঞ্চলে মহানায়কের মামারবাড়ির পাড়ায় তাঁর আবক্ষমূর্তিতেও মাল্যদান করা হবে। যাঁরা টলিউডের সঙ্গে যুক্ত নন, উত্তমপরিবারের কেউ নন, যেখানে বয়সের ব্যবধান নেই, এমন অনেকে তাঁদের মনের নিভৃতে স্মরণ করবেন বাংলার বড় আপনজন উত্তমকুমারকে। আজও যে উত্তম সর্বোত্তম। তাঁর পথচলা আজও শেষ হয়নি। তাই তো উত্তমের লিপে হেমন্তকণ্ঠের ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ আজও বাস্তব।

Related Articles

Back to top button
Close