fbpx
কলকাতাবিনোদনহেডলাইন

‘মহারাজা তোমারে সেলাম…’ বাংলা সিনেমায় নবজাগরণের স্রষ্টাকে শতবর্ষে শ্রদ্ধার্ঘ্য

যুগশঙ্খ ডিজিটাল ডেস্ক:      মহারাজা তোমারে সেলাম……

শতবর্ষে পা দিলেন খ্যাতনামা পরিচালক সত্যজিৎ রায়। বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম পথিকৃত্‍। আন্তর্জাতিক আঙিনায় ভারতীয় চলচ্চিত্রকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। বলা যেতে পারে বাংলা চলচ্চিত্র জগৎ নতুন ধারা সৃষ্টিকর্তা তিনি, বাংলা সিনেমাকে এক নতুন রূপে সাজিয়ে তুলেছিলেন তিনি। বাংলা সিনেমায় নব জাগরণ এনেছিলেন। তার অনুউপস্থিতিতে থমকে গিয়েছে জনজীবন। প্রকৃতি যেন রুখে দাঁড়িয়েছে মানবজাতির বিরুদ্ধে। তিনি থাকলে, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তর ভাবনা-চিন্তা করতেন হয়ত। তিনি থাকলে হয় তো আজকে পরিস্থিতি নিয়ে বানিয়ে ফেলতেন সিনেমা, তিনি থাকলে হয়তো কোনও না কোনও ভাবে তাঁর সৃষ্টি দিয়ে  ঘর বন্দি মহানগরকে মাতিয়ে তুলত। সত্যিই কি তিনি নেই? আজ তিনি আমাদের মধ্যে না থেকেও চিরকাল বাঙালি, সিনেমা প্রেমীদের মনেও মনিকোঠায় রয়ে যাবে।

তাঁর জন্মদিনে আজ শহরজুড়ে সাজো সাজো রব হওয়ার কথা ছিল। সেই মতো হচ্ছিল আয়োজনও। কিন্তু ভাঁটা পড়ল এই কঠিন মহামারীর কারণে। কিন্তু তা বলে কি মহারাজার জন্মদিন পালন থেকে বিরত থাকা যায়! সেই ভাবনা থেকেই ‘ইস্কুলে বায়োস্কোপ’। ১৯২১ সালে ২ মে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্রকার সত্যজিত্‍ রায়। আজ তার জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে সেই অনুষ্ঠান এগিয়ে আনা হয়েছে। কিন্তু করোনা আতঙ্কের জেরে স্কুল, কলেজ বন্ধ থাকায় অনলাইনের ক্লাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আর প্রতি বছরের মতোন এই বছরও ‘দ্য সস ব্র্যান্ড কমিউনিকেশন ‘ ইস্কুলে বায়োস্কোপ নিয়ে হাজির হয়ে গিয়েছে। ‘ ইস্কুলে বায়োস্কোপ ‘ এই বছর শুরু হতে চলেছে ৪ মে থেকে।  ‘দ্য সস ব্র্যান্ড কমিউনিকেশন ‘ এর কর্ণধার জানিয়েছেন, ‘প্রতিবছর এই শিশু চলচ্চিত্র উৎসব জুন-জুলাইতে হলেও এই বছরটা ভীষণ স্পেশ্যাল।

আর অস্কারজয়ী পরিচালক সত্যজিত্‍ রায়ের শতবর্ষের কারণেই এই বছর মে মাসে অনুষ্ঠানটি করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই গোটা বিশ্বের মানুষের কাছে ই-মেল ও হোয়াটসঅ্যাপ মারফত্‍ পাঁচটি প্রশ্ন পাঠানো হয়েছে। এর পাশাপাশি এবারের প্রতিযোগিতায় বেছে নেওয়া হয়েছে সব স্কুল থেকে মোট ৫০ পড়ুয়াকে। স্কুল বন্ধ থাকায় সব কাজ বা টাস্ক দেওয়া হবে অনলাইনে। এই প্রজেক্টে অংশ নিলে পড়ুয়াদের আগে সত্যজিতের ছটি ছবি দেখতে হবে যেমন ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’, ‘হীরক রাজার দেশে’, ‘গুপী বাঘা ফিরে এলো’, ‘সোনার কেল্লা’, ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ ও ‘ফটিকচাঁদ’।এই ছবি দেখে তার মধ্যে থেকে যে টাস্ক দেওয়া হবে তা শেষ করে অনলাইনেই জমা দিতে হবে পড়ুয়াদের। ‘সেই তথ্য একত্র করেই বানানো হবে একটি তথ্যচিত্র। যারা নাম হবে ‘মহারাজা তোমাকে শতবর্ষের সেলাম ‘।

জুলাই মাসের শেষে এর মধ্যে শ্রেষ্ঠদের দেওয়া হবে পুরস্কার। কলকাতার প্রায় সব স্কুলই অংশ নিয়েছে এই চলচ্চিত্র বিষয়ক প্রতিযোগিতায়।” সন্দীপ রায় অভিনব এই প্রয়াসের কথা শুনে বেশ উচ্ছসিত। সেই প্রশ্নের মাধ্যেম সত্যজিত্‍ সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য ও ধারণা পাওয়া যাবে।

তার অনুউপস্থিতি চলচ্চিত্র জগত-এর অবিস্মরণীয় ক্ষতি যা বলতে গেলে কোনদিন পূরণ করা যাবে না, আজ শতবর্ষে দাঁড়িয়ে না পাওয়ার কথাকে দূরে সরিয়ে রেখে তার রেখে যাওয়ার কাজকে স্মরন করার দিন। ভূতের রাজার বর-এর মতোই তার প্রতিভাও ছিল দুর্নিবার। তাঁর জন্মদিনে বাড়িতে বহু লোক আসেন। ভিড় করেন, তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন যাঁরা, তাঁর ভক্তরা, এই দিনে সত্যজিত্‍ বাবুর বাড়ি তাঁদের অবারিত দ্বার। পথের পাঁচালীর পরিচালককে শুভেচ্ছা জানাতে হাজির হন তাঁর গুণমুগ্ধরা। ১০০ বছরের জন্মদিনে অনেক পরিকল্পনা ছিল। বড় করে সেলিব্রেশন প্ল্যান করা হয়েছিল। লকডাউনের জেরে সবই ভেস্তে গিয়েছে। তবে গৃহবন্দি থাকাকালীন সত্যজিতের পরিবার খুঁজে পেয়েছে তাঁর বহু পুরনো ছবি, নেগেটিভ- যা নিয়ে পড়ে প্রদর্শনী করার ইচ্ছে রয়েছে তাঁদের। ফাঁকা বিশপ লেফ্রয় রোড। যেখানে আজকের দিনে বসতো চাঁদের হাট। আজ একাকী সেই বিখ্যাত রায়বাড়িতে জন্মদিন পালন হচ্ছে আজ, তবে ছোট করে। আজ আমাদের মধ্যে থাকুন আর না-ই থাকুন, পথের পাঁচালী, প্রতিদ্বন্দ্বী, গুপিগাইন বাঘাবাইন, সোনার কেল্লা, গণশত্রু’, ‘শাখা প্রশাখা’ এবং ‘আগন্তুক চারুলতা,নায়কের- স্রষ্টা চিরকাল থেকে যাবে বাঙালির মননে।

তিনি যে সিনেমা জগতে বটবৃক্ষের বীজ বপন করে গেছেন তা আদি অনন্ত কাল ধরে সৃষ্টির ছায়া দিয়ে যাবে, আর সেই ছায়াতে নিজেদের সমৃদ্ধ করে তুলবে চলচ্চিত্র জগতে আগন্তুক পরিচালকেরা। তার তৈরি সিনেমাগুলি এক একটা হীরক খন্ড। সত্যজিতের ছবিতে জোরালো বিদ্রোহ বা বিপ্লবের চিত্‍কার কোথাও নেই, অথচ রয়েছে প্রতিবাদের তীব্র চাবুকের শব্দ। তাঁর ‘অপু চিত্রত্রয়ী’ গ্রাম ও শহুরে বাস্তবের যে ছবি দেখিয়েছিল, অন্য কারও ছবিতে ওই ভাবে এমন বাস্তব কখনও উঠে আসেনি। এক বিদেশি সমালোচক মিসেস পেনিলোপ হিউস্টন সঠিকভাবেই বলেছিলেন ‘…satyajit’s cinemas are cinemas of India….’ তাঁর সেই ধারাবাহিকতা জীবনের শেষ পর্যায়ের কয়েকটি ছবিতে কিঞ্চিত্‍ ভ্রষ্ট হলেও, সত্যজিতের অবদানকে এতটুকু খাটো করা যায় না। তিনিই ভারতীয় নব্য বাস্তব সিনেমার ভগীরথ। বিষয় বৈচিত্র্য থেকে সিনেমার প্রয়োগশৈলীর ব্যবহারে তিনি দিশারির ভূমিকা পালন করেছেন।

‘পথের পাঁচালী’ যদি হয় গ্রামীণ বাংলার রূঢ় বাস্তব ছবি, তাহলে ‘মহানগর’, ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, ‘জনঅরণ্য’ও ‘সীমাবদ্ধ’ তত্‍কালীন নাগরিক জীবনের দলিল- এটা মানতেই হবে। এমনকী এখনও ওই ছবিগুলো রীতিমতো প্রাসঙ্গিক। পাশেই রাখা যায় তাঁর শেষ পর্বের তিনটি ছবি- ‘গণশত্রু’, ‘শাখা প্রশাখা’ এবং ‘আগন্তুক’কে। বিষয় শহরকেন্দ্রিক হলেও, এই ছবিগুলোই তিনি গভীর জীবন দর্শনের কথাও শুনিয়েছেন, স্পষ্ট ভাষায়। সিনেমার প্রায়োগশৈলীতে হয়তো তেমন জোর ছিল না, কিন্তু বক্তব্যের আন্তর্জাতিকতায় ও জীবন দর্শনের বীক্ষণে ছবিগুলো একেকটি অধ্যায়ের মতো। আবার তিনি যখন ছোটোদের জন্য ছবি বানিয়েছেন (গুগাবাবা, হীরক রাজার দেশে, সোনার কেল্লা), সেখানেও ছোটোদের মন জয় করার উপকরণের পাশাপাশি বড়দের চিন্তার খোরাক ও রেখে দিচ্ছেন গল্পের নিচের স্তরে। সেটা উপলব্ধি করতে পারলে দর্শকের বাড়তি পাওনা। যে কারণে ‘গুগবাবা’ ও ‘হীরক রাজার দেশে’ ছবি দু’টোর আবেদন এখনও সমকালীন।

রবীন্দ্রনাথের ‘নষ্টনীড়’ গল্পটিকে এক ক্লাসিক সিনেমাই রূপান্তর করানোর রূপকার তিনিই। সাহিত্যকে চলচ্চিত্র মাধ্যমে ট্রান্সক্রিয়েট করার সফলতম উদাহরণ এই ছবি। তা নিয়ে একসময় কাগুজে তর্কও কম হয়নি। কিন্তু শেষপর্যন্ত ‘চারুলতা’ সিনেমাকে ‘সিনেমা’ হিসেবেই স্বীকৃতি দিতে হয়েছে। এই ছবির জন্যই সত্যজিত্‍ রায় বার্লিন উত্‍সব থেকে সেরা পরিচালকের সম্মান জিতেছিলেন। এবং স্বয়ং সত্যজিত্‍ স্বীকার করেছেন ‘চারুলতা is my Best work with least mistake..’ আবার তিনি যখন ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’ করেছেন, তখনও তত্‍কালীন সমাজের সাধারণ মানুষের দিকেও ক্যামেরা ঘুরিয়েছেন, পাশাপাশি আযোধ্যার নবাব, বিদেশি শাসক ও মন্ত্রীদের জীবনযাত্রাকেও সমান ভাবেই ফোকাস করেছেন। এই মানুষটিই দুরদর্শনের জন্য ‘সদগতি’ বানালে, সেখানে দলিত নিম্নবর্গের একজন মানুষের নীরব প্রতিবাদকে উচ্চারণের সঙ্গে, উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণের পাপস্খলনের দিকটিকেও উল্লেখ করতে ভোলেননি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর একজনের মাঝে এরকম বহুমুখী প্রতিভা বাংলা ভাষায় বিরল। লেখা, শিশু সাহিত্য, চলচিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, শিল্প নির্দেশক, সঙ্গীত পরিচালক, আঁকা, প্রকাশক, গ্রাফিক নকশাবিদ ও চলচ্চিত্র সমালোচক। প্রতিটি জায়গায় ছিল সমান দক্ষতা।সুতারং তাঁর জন্মশত বর্ষে বাঙালি হিসেবে গর্ব আমাদের। এই মানুষটির শিল্পভাবনার উচ্চতা কেউ স্পর্শ করতে পারেননি, তার জন্ম শতবর্ষে শত কোটি প্রণাম।

 

Related Articles

Back to top button
Close