fbpx
কলকাতাহেডলাইন

বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ আজও আপামর বাঙালির আবেগ…

যুগশঙ্খ ডিজিটাল ডেস্ক:   

‘তিনি অভয়া শক্তি, বলপ্রদায়িনী

তিনি দুর্গা, তিনি দশপ্রহরণধারিণী’

বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র আপামর বাঙালির আবেগ… আজ মহালয়া বাঙালির সকাল শুরু হয়েছে চিরাচরিত্র কন্ঠ ধ্বনীতে। মহালয়া মানেই বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মহিষাসুরমর্দিনী।  বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের বিকল্প কেউ হতে পারেনি এখনও। গঙ্গার ঘাটে ঘাটে ভিড় জমেছে পিতৃ পুরুষের উদেশ্যে শ্রদ্ধা জানাতে শুরু হয়ে গিয়েছে তর্পণ। নিয়ম অনুযায়ী  মহালয়ের দিন পিতৃপক্ষের অবসান হয়ে দেবী পক্ষের সূচনা ঘটে, কিন্তু এবার ব্যাতিক্রম এবার ‘মা’র মর্তে আগমণ ঘটবে ১মাস পর। একে করোনার কাঁটা তারপর দেরিতে আসছে মা মন খারাপ বাঙালির।

মহালয়া নিয়ে বাঙালির এই আবেগ আজকেও নয়, পথ চলা শুরু সেই ১৯৩০ এর দশকে। এই দিনেই অল ইন্ডিয়া রেডিও বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের কন্ঠে উপস্থাপন করেন ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। প্রথম বছরেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় অনুষ্ঠানটি। মহালয়া এবং দুর্গাপুজোর কোনো সম্পর্ক না থাকলেও অনুষ্ঠানটির নাম হয়ে যায় মহালয়া। এবং এই দিন থেকেই বাঙালী জীবনে শুরু হয় দুর্গাপুজোর দিন গোনা। এই বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের জীবন নিয়ে কৌতুহল অনেক।

রামধন মিত্র স্ট্রীটের ওই গলিতে পা দিলে সময় যেন পিছিয়ে যায় হু-হু করে। হলুদ রংয়ের একটা বিশাল বাড়ির সামনে সাদা পাথরের ফলক। লেখা, স্বর্গীয় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। সঙ্গে জন্ম-মৃত্যুর তারিখ। তার নীচে পাথরে খোদাই করা তিনটে লাইন, ‘এই বাড়িতেই আমৃত্যু বাস করেছেন বেতারে মহিষাসুরমর্দিনীর সর্বকালজয়ী অন্যতম রূপকার এই সুসন্তান।’ বাড়ির মেন দরজা পেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে দোতালার যে ঘরে পা রাখলাম সেটা বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর ঘর। সেখানে বসে সুজাতাদেবীই বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর বড় মেয়ে, তিনি সাক্ষাৎকারের প্রথমেই গলায় ভেসে উঠল আক্ষেপের সুর। তিনি বললেন  ‘এখন তো কেউ আর তেমন খোঁজ রাখেন না, পুজো এলেই বাবার কথা মনে পরে’। মহিষাসুরমর্দিনী যখন সরাসরি রেডিওতে সম্প্রচার হত, তখন রাত দুটোর সময় গাড়ি আসত রেডিও অফিস থেকে। পরে যখন রেকর্ডিং প্রচার করা শুরু হল, তখনও ওই সময়টায় রেডিয়ো অফিসে চলে যেতেন তিনি। তবে শেষদিকে আর যেতে পারতেন না। সুজাতাদেবী বললেন, ‘এই ঘরে, এই খাটে বসেই আমরা বাবার সঙ্গে অনুষ্ঠান শুনতাম। আমি, আমার ভাই। বাবা-মা।’ বীরেনবাবুর ছেলে অবশ্য প্রয়াত।

আর একবার রেডিও অফিসে যাননি তিনি। সেটা ছিল ১৯৭৬ সাল। রেডিয়ো সে বার মহিষাসুরমর্দিনী প্রচারিত হয়নি। হয়েছিল, ‘দুর্গা দুর্গতিহারিণী’। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে যা উত্তমকুমারের মহালয়া বলে প্রচলিত। সেই প্রথম, সেই শেষ। সে দিনের কথা বলতে গিয়ে বললেন, ‘ওই অনুষ্ঠানের আগে এক রাতে উত্তমকুমার আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন বাবার কাছে। হাত ধরে বলেছিলেন, তিনি ওই অনুষ্ঠানটি করতে চাননি। বাবা তখন উত্তমবাবুকে উৎসাহ দিয়ে বলেছিলেন, ‘কেন করবেন না আপনি? অবশ্যই করুন। নতুন কিছু তো করা দরকার। আমি আপনার পাশে আছি।’ সেই মহালয়ার ভোরেও বাবা এই খাটে বসে অনুষ্ঠানটি শুনেছিলেন। অনুষ্ঠান শুনে বলেছিলেন ‘ভালই তো করেছে!’ জনতা অবশ্য সেটা মানেনি। সে কী বিক্ষোভ! আজও মনে আছে, প্রবল চাপে ষষ্ঠীর সকালে আবার রেডিও বাজাতে বাধ্য হয়েছিল মহিষাসুরমর্দিনী।’শেষ পর্যন্ত আবার বীরেন্দ্রবাবুর কন্ঠে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শোনানো শুরু হয়।

রবীন্দ্রনাথ, বিধানচন্দ্র রায় থেকে উত্তমকুমার, তিন কিংবদন্তির প্রয়াণ যাত্রার ধারাবিবরণী দিয়েছিলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। যে রেডিওর জন্য এতকিছু, তারা অবশ্য শেষ বয়সে পেনশনও দেয়নি। সুজাতাদেবী বললেন, ‘বাবা চুক্তিতে কাজ করতেন রেডিও। তাই পেনশন পাননি। পরে তেমন কেউ খোঁজও নেয়নি। শেষদিকে স্মৃতিভ্রংশ হয়ে গিয়েছিল বাবার।

১৯৩২-এর ষষ্ঠীর ভোরে প্রথম বার প্রচারিত হয় বেতারের কালজয়ী অনুষ্ঠান ‘মহিষাসুরমর্দিনী। পরে এটি মহালয়া তিথিতে পরিবর্তিত করা হয়। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর গম্ভীর কণ্ঠে চণ্ডীপাঠ আজও শুধু মহালয়া নয় সারা পুজোর ইউএসপি। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর চণ্ডীপাঠ শোনার সময়ে আমাদের সকলের উপলদ্ধি হয় একসময় তাঁর গলা ধরে আসে ক্রন্দনরত হয়ে পড়েন তিনি। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র বলতেন এর কারণ হল তিনি সামনে তখন মা দুর্গাকে দেখতে পান।

শুধুমাত্র রেডিও নয় চলচ্চিত্রের প্রতিও তাঁর ঝোঁক ছিল বেশ। একই সাথে অভিনয়েও ছিলেন আগ্রহী। মেস নং ৪২ সহ একাধিক নাটক রচনা করেন তিনি নিজেই। বিমল মিত্রের সাহেব বিবি গোলাম, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সুবর্ণ গোলক নাটক তিনি মঞ্চস্থ করেন। একাধিক গুণের অধিকারী বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র । বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র রেডিওর জন্য যা করেছেন যা দিয়েছেন তাঁর পরিবর্তে তিনি ও তাঁর পরিবার রেডিও থেকে সেরকম কিছু পাননি। পেয়েছেন আজীবন জনতার শ্রদ্ধা ও ভালবাসা। কিন্তু এই কিংবদন্তি বাঙালির আরও অনেক বেশি কিছু প্রাপ্য ছিল।

 

 

Related Articles

Back to top button
Close