fbpx
পশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

ক্ষুধার গ্রামে ত্রাণের বাঁশরি বাজাতে হাজির মিদনাপুর ডট ইন

শান্তনু অধিকারী, সবং: আমলাশোল, বাংলা-ঝাড়খণ্ড সীমান্তের শেষ জনপদ। বিনপুর ২ব্লকের মুণ্ডা ও শবর অধ্যুষিত এই গ্রাম। ক্ষুধার পৃথিবীতে বারবার উঠে এসেছে খবরের শিরোনামে। ২০০৪ সালে পাঁচ জন মানুষের ‘অনাহার মৃত্যু’তে রীতিমতো আলোড়ন পড়েছিল তদানীন্তন রাজ্যরাজনীতির অঙ্গনে। রাজ্যের পালাবদলের পরে আমলাশোলের আবরণ বদলেছে। গড়ে উঠেছে হরেক পরিকাঠামো। কিন্তু অভিযোগ, আজও প্রান্তবাসীদের জীবনের কাঠামোটি তেমনই নড়বড়ে। বিশেষ করে লকডাউনের জেরে অবস্থা হয়ে উঠেছে আরও দুঃসহ।

সেই ‘ক্ষুধা’র গ্রাম আমলাশোলেই খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিল মিদনাপুর ডট ইন। রাস্তা জুড়ে ঝিঁঝিঁদের চিলচিৎকার আর ময়ূরের ডাক শুনতে শুনতেই তাদের খাদ্যসামগ্রীর গাড়ি পৌঁছায় আমলাশোলে। সংস্থাটির কর্ণধার অরিন্দম ভৌমিক বললেন, ‘পৌঁছানোটা সহজ ছিল না। কিন্তু জরুরি ছিল। তাই গিয়েছি।’ প্রসঙ্গত এখানকার জঙ্গল পথে বুনো শুয়োর, হাতি, বাঘরোল, হায়না, শিয়াল, খরগোশ, ভল্লুক, ময়ূর ও নানা ধরণের পাখির দেখা প্রায়শই মেলে।

উল্লেখ্য, এই আমলাশোল নিয়েই ডেনমার্কের গবেষক অলিভার রুবেন লিখেছিলেন গবেষণা-নিবন্ধ (২০১১)। ২০১৩ সালে প্রকাশিত হয় দীপককুমার বড় পন্ডার ‘জঙ্গলমহলের আদিবাসী জীবন ও আমলাশোলের দিনলিপি’। এই আমলাশোলকে কেন্দ্র করেই চন্দন সিংহ লেখেন ‘কিন্ডলিং অব অ্যান ইনসারেকশন: নোটস্ ফ্রম জঙ্গলমহলস্’।

আরও পড়ুন: বন্ধ দেশ, চালু আছে ধর্ষণ

মূলত চাকাডোবার বাসিন্দা, শিক্ষক ও সমাজসেবী দীপককুমার বড়পণ্ডার অনুরোধেই সংস্থার পক্ষ থেকে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে যান অরিন্দম ভৌমিক, জ্যোতির্ময় খাটুয়া, পার্থ ভৌমিক প্রমুখরা। বিগতদিনগুলোর মতো এবারও নিজের গাড়ি দিয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন জ্যোতির্ময়। প্রসঙ্গত, গাড়ির চালক তথা সংস্থাটির সদস্য প্রদীপ সামন্তও বিনা পারিশ্রমিকেই গাড়িটি চালাচ্ছেন বলে জানালেন জ্যোতির্ময়। যথারীতি আগের মতোই দুর্গম পথকে স্মরণে রেখে নিজের বাইক নিয়ে এই যাত্রাপথে সামিল হন তমলুকের বাসিন্দা পার্থ ভোমিকও। পার্থ জানালেন, ‘আগেও ঝাড়খণ্ড সীমান্তের গ্রামগুলোতে খাদ্রসামগ্রী নিয়ে গিয়েছি। সব জায়গায় চারচাকার গাড়ি নিয়ে যাওয়ার মতো রাস্তা মেলে না। তাই বাইকটিকেও সঙ্গে রাখা।’

সংস্থার তরফে প্রথমেই খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয় স্কুলপাড়ায়। এরপর ত্রাণসামগ্রীর গাড়ি পৌঁছায় কেন্দাগোড়ায়। কেন্দাগোড়ার পরে আমলাশোলের আরও দুটি পাড়ায় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করে সংস্থাটি। অরিন্দম জানালেন, ‘আনুমানিক একশোটি পরিবারের হাতে ত্রাণসামগ্রী তুলে দেওয়া হয়েছে।’ রাজ্য-রাজনীতির পালাবদলে এখন অনেকটাই উন্নত হয়েছে আমলাশোল। দীপকবাবুদের চেষ্টায় কলকাতায় পড়াশুনা করে মাধ্যমিক দিয়েছে শবর ছেলে-মেয়েরাও। তবুও যেন অবিরাম বেজে চলেছে আমলাশোলের অভাবের রিংটোন। সেই বেসুরো জীবনে খানিকটা সুরের প্রলেপ এনে দিল মিদনাপুর ডট ইন। অরিন্দম বললেন, ‘সাধ্যের মধ্যে, সংস্থার সদস্যদেরই আর্থিক সহযোগিতায় যতটুকু সম্ভব করছি। কাউকে ছোট করতে নয়, নিজেদের মানবিক তাগিদেই এই উদ্যোগ।’

প্রসঙ্গত, দীপককুমার বড়পণ্ডার বইটি সম্পর্কে মহাশ্বেতা দেবী লিখেছিলেন― ”এই বই মন দিয়ে পড়লে পাঠক বুঝবেন, শুধু আমলাশোল নয়, “ভারতবর্ষ” নামটির কাছে পৌঁছবার পথনির্দেশও এই বইয়ে আছে।” সেই ‘পথনির্দেশ’ মেনেই এগিয়ে চলেছে মিদনাপুর ডট ইন। ‘এভাবেই ভারতবর্ষকে ছুঁয়ে থাকতে চাই প্রতিদিন, প্রতিক্ষণে’― জানালেন মিদনাপুর ডট ইনের পথপ্রদর্শক তথা সর্বময় কর্তা অরিন্দম ভৌমিক।

Related Articles

Back to top button
Close