fbpx
পশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

পরিবার থেকে দূরে দিন কাটছে পরিযায়ী শ্রমিকদের

অমিত দাস , নদিয়া (করিমপুর): নিজ রাজ্যে কাজের তেমন ব্যবস্থা করতে পারেননি। কেউ কেউ আবার বেশি আয়ের জন্যই পারি দিয়েছিলেন ভিনরাজ্যে। অনেকেই বাড়ি থেকে অনেক দূরে পাকাপাকি ভাবেই থাকতে শুরু করেন ভিনরাজ্যে। কেউ বছরে একবার , কেউ দু তিন বছর পর বাড়ি ফেরেন।

 

 

সেসময় বাড়িতে আসার আনন্দ ঘিরে থাকত তাদের। দিন গুনতেন কবে গ্রামে গিয়ে পরিবারের মুখ দেখবেন। বুকে টেনে নেবেন ছেলে মেয়েদের। পরিবারের লোকজনরাও হাঁ করে থাকত সেই দিনগুলোর দিকে তাকিয়ে। বউ ছেলে মেয়েকে রেখে কাজের তাগিদে ঘর ছাড়া মানুষগুলোর দিন কাটত ঘরে ফেরার আশায়। সেই ঘরে ফেরার আনন্দ বিষময় হয়ে উঠল করোনা আবহে। পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে নিজের গ্রামে ফিরেও তাদের দিন কাটছে কোয়ারেনটাইন সেন্টারে।

 

 

বছর শুরুর প্রথম দিকেই দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের হার বাড়তে শুরু করে। বিপদ বুঝেই লকডাউনের সিদ্ধান্ত নেয় দেশের সরকার। শুরু হয় লাগাতার লকডাউন। মাথার উপর বিপদ ঘনিয়ে আসে পরিযায়ী শ্রমিকদের। বিদেশে কাজ খোয়াতে হয় তাদের। বন্ধ হয়ে যায় বাড়িতে টাকা পাঠানো। পরিবারের চিন্তায় রাতের ঘুম উড়ে যায় তাদের। তারউপর লকডাউনে বন্ধ হয়ে যায় ঘরে ফেরার আশাও। হাজার হাজার মানুষ বেরিয়ে পড়ে রাস্তায় ঘরে ফেরার তাগিদে। আশ্রয় নিতে হয় ষ্টেশনে বাসটার্মিনাসে। অবশেষে সরকারি প্রচেষ্টায় দূরপাল্লার ট্রেনে ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয় তাদের নিজ রাজ্যে। কিন্তু ভোগান্তির এখানেই শেষ নয়। সরকারি নিয়ম আর করোনা বিধি মেনে তাদের রাখা হয় কোয়ারেনটাইন সেন্টারে।

 

 

 

পরিযায়ী শ্রমিকদের অনেকেই করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। ভিনরাজ্য থেকে আসা শ্রমিকরা করোনা ভাইরাস বহন করে এনেছেন। ফলে সরকারি নির্দেশে করা ব্যবস্থা করা হয় তাদের। নিজের এলাকায় কোয়ারেনটাইন সেন্টার গড়ে সেখানেই রাখার ব্যবস্থা করা হয়। নিজের পরিবারের কথা ভেবে পরিবার থেকে দূরে থাকলেও বুকে টেনে নিতে পারছেন না ছেলে মেয়েকে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী সব কোয়ারেনটাইন সেন্টার থেকেই যে করোনা পজিটিভের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে তা নয়। তবে যাদের পাওয়া যাচ্ছে তাদের শীঘ্রই সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। একদিকে করোনা সংক্রমণের ভয় অন্যদিকে পরিবারের কাছে এসেও দূরে থেকে বেশ কষ্টেই দিন কাটছে তাদের।

 

 

 

কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে তেমন ব্যবস্থা থাকলেও খাবার আসছে বাড়ি থেকে। বাড়ির তৈরি খাবার মনে করিয়ে দিচ্ছে তাদের পরিবারের কথা। মনে পড়ে যাচ্ছে সবাই মিলে একসঙ্গে বসে খাওয়ার কথা। মনে পড়ে যাচ্ছে ছেলে মেয়েগুলোর কথা। আর ততই এক একটা দিন হয়ে উঠছে এক একটা মাসের মতো। দূর থেকে বাড়ির মানুষ খাবার রেখে দিয়ে চলে যাচ্ছেন। এটুকুই দেখা প্রিয় মুখগুলোকে। তারপর আবার অপেক্ষা। দূর থেকে চলে যেতে দেখে মন পুড়ছে অনেকেরই। দূর থেকে দেখছেন তার ছেলে মেয়েগুলোকে। কারও স্ত্রী কারও বাবা মা কারও ভাই দাদা বা অন্য কেউ খাবার পৌঁছে দিতে আসছেন। ওই ওইটুকুই দেখা। প্রিয়জনের খুব কাছ থেকেও দেখতে পারছেন না তারা।

 

 

এর মধ্যেই চলেছে তাদের নমুনা সংগ্রহের কাজ। টেস্ট হচ্ছে তাদের। আতঙ্ক বাড়ছে আরও। পরিবারের প্রিয় মুখগুলো মনে পড়ছে আরও বেশি করে। এভাবে মানসিক কষ্টে দিন কাটছে পরিযায়ী শ্রমিকদের। পরিবারেরও একই দশা। অনেক কষ্টে ফিরেছে ঘরের লোকটা। কিন্তু তাতে কি। করোনা আতঙ্ক প্রতিনিয়ত গ্রাস করছে তাদের। অনেকেই ঘনঘন খোঁজ নিয়ে আসছেন কোয়ারেনটাইন সেন্টারে গিয়ে। কি কি লাগবে তাও জেনে আসছেন বারবার। তবুও ভয় আর মানষিক দুশ্চিন্তা থেকেই যাচ্ছে মনে। এমনই এক পরিবারের গৃহিণীর কথায়, প্রতিমুহূর্ত আতঙ্কে কাটছে আমাদের। ছেলে মেয়েরা তার বাবার মুখ দেখার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। বারবার কেঁদে কেঁদে উঠছে তিন বছরের শিশুটা। বড়ো মেয়েটা একটু বোঝে। তাই মুখে কিছু বলছে না।

 

 

কোয়ারেনটাইন সেন্টারে থাকা এক ব্যক্তি জানান, অনেক কষ্টে ফিরেছি। কিন্তু ফিরেও না ফেরার মতো অবস্থায় আছি। কাছে থেকেও ছেলে মেয়েগুলোর মুখ দেখতে পারছি না। খুব খারাপ লাগছে। বাড়ি থেকে খাবার এলেও খেতে পারছি না। সবসময় আতঙ্কে থাকছি। এভাবে একা একা থাকা সত্যিই কষ্টকর। তবুও নিজের জন্য, পরিবারের জন্য থাকতে তো হবেই। এসব ভেবেই একটা একটা করে দিন কাটছে। কবে দিনগুলো যেন অনেক বড়ো বড়ো মনে হচ্ছে। কিছুতেই ফুরচ্ছে না।

 

 

এভাবেই দিন কাটছে পরিযায়ী শ্রমিকদের। একদিকে সংক্রমণের আশঙ্কা আর অন্যদিকে পরিবার থেকে দূরে থাকার কষ্ট তাদের চার দেওয়ালের জীবনকে দুর্বিসহ করে তুলেছে। কবে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবেন সেই কথা ভেবেই দিন কাটছে তাদের। যাদের ১৪ দিনের বন্দীদশা শেষ হয়ে আসছে তাদের মুখে হাসি ফুটছে হয়তো। কিন্তু যাদের সেই দশার শুরু তাদের জীবনে এই ১৪ দিন ১৪ বছরের মতো হয়ে উঠছে।

Related Articles

Back to top button
Close