fbpx
গুরুত্বপূর্ণব্লগহেডলাইন

মনের কথা…..

সুমন ঘোষ: তুহিনা যখন আমাকে ফোন করে বললো- আপনি একটু সময় দিন, আপনাকে আমার অনেক কথা বলার আছে, এবং আপনিই পারবেন আমাকে ভালো রাখতে, তখনই ও’র গলায় আমি ও’র কষ্টটা টের পেয়েছিলাম। আমি যে টের পেয়েছি, সেটি ওকে বুঝতে দিইনি। একটু নির্লিপ্ত ভাবেই অমুক দিন অমুক সময়ে আসবেন বলে ফোনটা ছেড়ে দিয়েছিলাম। তুহিনা আরও কিছু বলতে চেয়েছিল কিন্তু আমি শুনতে চাইনি। শুধু বলেছিলাম- আসবেন, সব শুনব। তারপর নিশ্চয়ই আপনি সত্যি ভালো থাকতে পারবেন।

ফোনটি রেখে, আমি ও’র কন্ঠস্বর, ও’র উদ্বেগের কারণ সমন্ধে একটা ধারণা করার চেষ্টা করছিলাম, যদিও তাকে আমি একদমই চিনিনা বা জানিনা। কিন্তু ওই, ও’টা আমার স্বভাব, ওটাই হয়তো আমার নেশা বা পেশা। আসলে কন্ঠস্বরের উথাল পাতাল বা বলার ভঙ্গী অনেক না-বলা কথা বলে দেয় বা অনেক চেপে রাখা কথা আরও দৃঢ় ভাবে চেপে দেয়। এগুলো হয়েই থাকে। তবে আমি জানি, আমি যা ভেবেছি তুহিনা আমার কাছে এসে সে কথাই বলবে‌। ও কাঁদবে, আবার মাঝে মাঝে নিজের সংগে নিজের কথা বলার ভঙ্গী হাসবে, আবার নিশ্চুপ হবে, আবার ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে আবার সরব হবে। ও’র অনেক অভিযোগ থাকবে নিজের পরিবারের প্রতি আবার সেই অভিযোগ নিজেই নিজে ভেঙ্গে দিয়ে আমার সামনেই তার জন্য অনুশোচনা করবে‌। ও’র কন্ঠস্বর, ও’র আমার সঙ্গে দেখা করার অভিপ্রায়ও হয়তো বলে ফেলেছে আমাকে ও’র কন্ঠস্বরের ‍মধ্যে দিয়ে। তবে ও’র সবচেয়ে পজিটিভ সাইডটি হচ্ছে ‘ও’ ভালো থাকতে চায়। আমি বুঝেছি, এই বোধটিই তুহিনার ভালো থাকার আসল চাবিকাঠি।

নির্দিষ্ট দিনেই যথা সময়ে তুহিনা, বয়স বড় জোর ছাব্বিশ- সাতাশ আমার সামনে এসে, ঝপ করে বসেই বলল- আমার অনেক কিছু বলার আছে আপনাকে। আপনি কিছু একটা করুন। এভাবে আমি আর পারছি না। আমি যেন কেমন বদলে বদলে যাচ্ছি। আমার খেতে ভালো লাগে না, ঘুরতে ভালো লাগে না, আমার ঘুম আসে না। অথচ আমি ঘুরতে খুব ভালোবাসতাম। আমি ছবি আঁকতাম। এখন আর ছবি আঁকি না। আমার ভালো লাগে না। আমার কিচ্ছু ভালো লাগে না। মেয়েটি বলছিল, আরও কথা, আরও বেদনা ভরা ছলছল চোখে কতো কথা, কতো মান, আর লুকোনো কতো অভিমানে ভরা ও’র- ‘মনের কথা’।

আরও পড়ুন: তৃণমূলের জনবিরোধী নীতি মানুষের কাছে তুলে ধরবো: তথাগত রায়

আমি নিশ্চুপ হয়ে ও’র কথা শুনছিলাম। তখন তুহিনা’র চোখে আমার চোখ। ও কখনো চোখ নামায়, কখনও চোখ বোজে আবার কখনও বা চোখ মোছে। আমি আমার চোখ সরাই না। তুহিনা বলতে থাকে- আমি এতো বিশ্বাস করেছি, আমি আমার সমস্ত গোপন অসীম বিশ্বাসে শ্রীদীপকে বিলিয়ে দিয়েছি, তবুও শ্রীদীপ আমাকে ছেড়ে চলে গেল। আমি ফোন করলে সে ফোন তোলেনা আর যদিও বা একবার ফোন তোলে তখন রূঢ় ভাবে বলে দেয়- আমি তোমাকে ভুলে গেছি। আচ্ছা বলুন তো, এভাবে কেউ কিছু ভুলে যায়, এভাবে ভোলা যায় ! আমাদের সমস্ত গোপন আমরা ভাগাভাগি করেছি, আমরা প্ল্যান করেছি, আমরা সংসারের স্বপ্ন দেখেছি, আমি আমার পরিবারের সবার চোখে খারাপ হয়েছি, আর এখন বলে কিনা ভুলে যাও, সব ভুলে যাও। যা হয়েছে ভুল হয়েছে। ভুল নাকি মনে রাখতে নেই।

অদ্ভু্ৎ!

মনের কথাগুলো কখনও তরতর করে , কখনও ভেতরে ভেতরে হোঁচট খেতে খেতে তুহিনা আমাকে বলতে থাকে। তুহিনা কাঁদতে থাকে, তুহিনা চোখ মুছতে থাকে, তুহিনা আবার শ্রীদীপের স্মৃতির কথা বলতে বলতে হাসতেও থাকে। আমার তুহিনাকে দেখে অবাক লাগেনা। নরম মনের খেলাটাই তাই। যারা বাস্তবকে সামনে ছুঁতে পারে না, অজানা ভবিষ্যৎ খুব কাছের সত্য বলে ভেবে নেয় তারা এরকম আচরণই করে সাধারণতঃ। তারা বঞ্চিত হয়ে একটা আশ্রয় চায়। সেই আশ্রয় অবশ্যই আমি দিয়েছিলাম তুহিনাকে। আমি ধীরে ধীরে ও’র মনের গভীরে প্রবেশ করেছিলাম। শ্রীদীপ কি, কেন, কোন অভিপ্রায়ে সে সরে গেলো তার ব্যাখ্যা হয়েছিল সেদিন। মনের নাড়াচাড়া, মনের বিস্ময়, মনের খেলা, মন জেতা, মন হারানো নিয়ে পরতে পরতে মনের কথা সেদিন ভাগাভাগি হওয়ার পর তুহিনা যখন আমার কাছ থেকে বিদায় নেয়, তখন তুহিনা’র চোখে আর জল ছিল না। তারপরও তুহিনা আমার কাছে আরো বেশ কয়েকবার এসেছিল আর আত্মবিশ্বাসের সুখ নিয়ে ফেরৎ গিয়েছিল। আর শেষবারের মতো যখন তুহিনা এসেছিল আমার কাছে তখন দেখি ‘ও’ সঙ্গে এনেছিলো ও’র বাবা আর মাকে। আর আমাকে চরম অবাক করে সঙ্গে নিয়ে এসেছিল ও’র বিয়ের একটা রঙীন কার্ড।

তুহিনা এখন ভালো আছে। সুখে আছে। এখন তুহিনা যে তার নতুন সংসারের ছবি আঁকছে, তাতে শ্রীদীপ বলে কেউ নেই‌। আছে তার বর, শ্বশুরমশাই, শাশুড়ি আর তার গর্ভে ছটপট করা তার সন্তান।

সেই আগত সন্তান যখন তার গর্ভে হাত পা নাড়ায়, তুহিনার মনে তখন জ্বলে ওঠে আনন্দের লক্ষ প্রদীপ। শ্রীদীপ বলে সেই ছেলেটা তখন কত দূরে সরে গেছে তুহিনা আর তা মনেই করতে পারেনা। আমি তুহিনার শুভাকাঙ্খী হয়ে তা উপভোগ করি। আর বসে বসে ভাবি ‘জগতের সব তুহিনাই ভালো থাকুক’।

লেখক_সুমন ঘোষ( সাইকোলোজিকাল কাউন্সেলার)
ফোন -9875549076

 

Related Articles

Back to top button
Close