fbpx
অন্যান্যআন্তর্জাতিকদেশবাংলাদেশহেডলাইন

ননীচোর কৃষ্ণ নয়, জন্মাষ্টমীতে অন্য কৃষ্ণের খোঁজে জরা

নীলোৎপল বন্দ্যোপাধ্যায়: বাংলাদেশে থাকার সময় ভাগবত আসরে ডাক পেতাম। বক্তা হিসেবে। ব্যাসাসনে বসবার কোনও যোগ্যতাই আমার কোনোদিন ছিল না, আজও নেই। সংস্কৃত ভাষাই জানি না সঠিক ভাবে, শাস্ত্রব্যাখ্যা করব কোন দুঃসাহসে?! যতটুকু শুনেছি মহাজ্ঞানী-মহাজনের মুখে ততটাই বলবার চেষ্টা করতাম। ঢাকা শহর থেকে দূরে দূরে প্রত্যন্ত গ্রামে হত সেই সব আসর। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অল্প ক’জন মানুষ থাকতেন এমন আসরেও গিয়েছি, আবার হাজার হাজার লোকের ভিড় এমন আসরেও বলেছি। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই ওই অল্পলোকের ছোটখাটো আসরেই আয়োজনটি আন্তরিক হত। সামনে চট পেতে বসে আছেন বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা। একটু দূরে খেলা করছে ছোটরা, একটু বড় ছেলেরা একসঙ্গে বসে মোবাইল টিপছে একটু দূরে।

সোমত্ত লোকেরা হিসেব পত্র নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত। মহিলারা ফল বানাচ্ছে, সিন্নি মাখছে, এসবেই ব্যস্ত। একটু আড়ালে খিচুড়ি-লাবড়া-চাটনি-পরমান্ন রান্না হচ্ছে। গোপালের সেবা দিয়ে আমরা সকলেই প্রসাদ পাব। আমি একটি আসনে বসে। পাশে তুলসীগাছ। সামনে রসকলি আঁকা বৃদ্ধারাই মূলত। অল্প কয়েকজন লুঙ্গিপরা, গায়ে তামাকের গন্ধ বেরোনো বৃদ্ধ। মূলত এইরকম পরিবেশে ভাগবত আলোচনা করতাম অল্প শীতের সেই সন্ধ্যাগুলোতে। সন্ধ্যার আজানের পর সংখ্যালঘুর আরাধনার আয়োজন, শাঁখ, কাসর, ঘন্টা বাজিয়ে শুরু হত। মন্দিরের পুরোহিত আরতি শেষ করে আসরে এসে বসতেন ও আমি কি আচার আচরণ ভুল করছি, সেগুলো খুঁটিয়ে নজর করতেন পরে আসরের শেষে হেসে হেসে সেগুলো আমায় শোনাতেন। আমি নেহাৎ অর্বাচীন পাঠক। সেসব গায়ে মাখলে আমার তো চলবে না। সামনে উৎসুক শ্রোতার মন অবধি পৌঁছানোই আমার কাজ।

আরও পড়ুন: রুদ্ধশ্বাস গতিতে বাড়ছে সংক্রমণ, ভারতে আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়ালো ২৩ লক্ষ

যাহোক, মনে সাহস সঞ্চয় করে গুরুস্মরণ করে বলা শুরু করতাম। হু-হু করে ঘন্টা দুই-আড়াই কেটে যেত। কী বলতাম? নাহ, রাসলীলা, কৃষ্ণজন্ম, মিলন, মাথুর এসব কিছুই বলতাম না। আমি বুঝতাম, ওইসব বলার অধিকারীও আমি নই, শ্রোতারাও নন। শ্রোতারা সকলেই পরকালে যাবার দিন গুণছেন ও এখন ছেলে-বউয়ের সাংসারিক অত্যাচারে বিপর্যস্ত। তাই দূর দূর-গাঁ থেকে অন্ধকার ঠেলে, বা কয়েকজন মিলে ই-রিকশা ভাড়া করে ‘একটু শান্তি’ পেতে আসরে এসেছেন। তাঁদের কাছে আমি বলতাম শ্রীভগবানের জীবনের অন্তিম কাহিনী।

শ্রীমদ্ভাগবতগীতা, বেদ-উপনিষদের সার, জ্ঞানমার্গের কথা। বেদব্যাস, যাঁকে শ্রীবিষ্ণুর অংশ বলে ভাবা হয়, তিনি বিধৃত করে গেছেন। ভাষাতাত্বিক গবেষকদের মধ্যে মহাভারতের সঙ্গে গীতার সময়গত ফারাকও আবিষ্কার করেছেন কেউ কেউ।

এদিকে ভাগবত হল শ্রীকৃষ্ণের জীবনবৃত্তান্ত। গীতায় যাঁর বাণীরূপ মূর্তি ধরেছে, এখানে তিনিই স্বয়ং মাধুর্যভাবে প্রকটিত। বেদকে ভাগ করে, মহাভারত-গীতা এইসব লিখেও যখন কিছুতেই শান্তি পাচ্ছেন না কৃষ্ণদ্বৈপায়ন, তখন নারদের উপদেশ লাভ করে গোবিন্দের রক্তমাংসের জীবনলীলা রচনা করতে বসলেন বেদব্যাস। ভাবতে হবে, জ্ঞানের আধার যিনি, তাঁরও মন উচাটন হয়। তিনিও দুঃখী হন। এইবার লিখবেন ভাগবত, কিন্তু তাঁর তো লেখার লোক লাগে। মহাভারতের সময় গণেশকে পেয়েছিলেন, এইবার উপযুক্ত   অধিকারী কোথায় পাবেন? তাই নিজের ঔরসে জন্ম দিলেন পুত্র শুকদেবের। সে পুত্র আবার মায়ের গর্ভেই বাবার থেকে ভাগবত জেনে নিয়েছে। কিংবদন্তী, এই ছেলে ষোলো বছর নাকি মাতৃগর্ভে ছিলেন। কিন্তু এর বাইরে গিয়ে কাহিনীর আকস্মিকতা ও গুরুত্ব অন্যরকম। যেহেতু ছেলে মায়ের পেটেই ভাগবত জেনে ফেলেছে, তাই জন্মের পরেই তিনি সংসার ত্যাগ করলেন।

বিনা পোশাকে ষোলো বছরের উজ্জ্বল কিশোর ছুটে চলেছেন সংসার ত্যাগ করে। পথের ধারে পুষ্করিণীতে স্নান করছিলেন নারীরা, এই অত্যুজ্বল আভাযুক্ত বাহ্যত নগ্ন কিশোরকে দেখে হাঁ করে চেয়ে রইলেন। গায়ে কাপড় টানবার কথা মাথাতেও এলো না। পেছন পেছন ছুটে আসছেন বৃদ্ধ ও সর্বজ্ঞানের আধার ব্যাসদেব। তাঁকে দেখে মহিলারা লজ্জায় কাপড় টেনে নিলেন। এরপরের কাহিনী সকলেই জানেন। তখন দ্বাপর শেষে কলি প্রবেশ করেছে সদ্য। মহারাজ পরীক্ষিত অভিশপ্ত হয়েছেন। আগামী সাতদিন মাত্র সময় হাতে। তখন শুকদেব পরীক্ষিতকে শোনালেন শ্রীকৃষ্ণের জীবনকাহিনী। যা কিনা ভাগবত বলে বিধৃত।

এখন ভাগবতের আধার শুকদেবকে দেখে নারীরা বাহ্যজ্ঞানহারা হলেন কিন্তু ব্যাসকে দেখে সচেতন হলেন কেন? এখানেই লুকিয়ে আছে ভাগবতের মহিমা, যাকে পদকর্তারা সুন্দর ভাবে বেঁধে ফেললেন ছন্দে।

“আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা তারে বলে কাম।

কৃষ্ণেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা ধরে প্রেম নাম।

“একারণেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জীবনকাহিনী জেনে জন্মের পরেই শুকদেব বৈরাগ্য লাভ করলেন। এখান থেকেই মূল আলোচনায় প্রবেশ করব।

হিন্দুশাস্ত্র অত্যধিকতাদোষে দুষ্ট। সেখানে বলাই আছে ‘অধিকন্তু ন দোষায়’। তাই হিন্দুদের তেত্রিশকোটি দেবদেবী, শ্রীকৃষ্ণের ষোলোহাজার গোপী বৃন্দাবনে, ষোলোহাজার স্ত্রী দ্বারকায়। সাধারণ দৃষ্টিতে শ্রীকৃষ্ণ একজন ভোগী পুরুষ। রাজা হননি বটে, কিন্তু রাজৈশ্বর্য সবই ভোগ করেছেন। এত এত নারী সঙ্গ করেছেন।

এই দৃষ্টি দোষের কারণে রাসলীলা, বৃন্দাবনলীলা জ্ঞানীরা ব্যাখ্যা করেন না সাধারণ শ্রোতার কাছে।

এত এত গোপী, স্ত্রী, সখা, বন্ধু থেকেও সারাজীবন শ্রীকৃষ্ণ কি ভয়ানক রকমের একা ছিলেন, আমরা কি কেউ কখনও ভেবে দেখি? সমাজ সংসারের দায়িত্ব সামলে, নিজের বিচার বুদ্ধি প্রয়োগ করে আর কীই বা তিনি করতেন? রাধার কাছে বৃন্দাবনে ফিরে গেলে ‘মহা-ভারতের’ কী হত?

তখন উত্তরভারতে সবচেয়ে ক্ষমতাশালী রাজা ছিলেন মগধরাজ জরাসন্ধ। মথুরার গণতন্ত্র ধ্বংস করেছিলেন কংস, সেই ধ্বংস সম্পূর্ণ করতে বিয়ে করেছিলেন জরাসন্ধের কন্যাকে। মথুরা-মগধ মৈত্রীর ফলে সারা ভারতে এ এক অজেয় অক্ষ হয়ে উঠল। বৃষ্ণি-যাদবকূল উত্তরভারতে সবচেয়ে ক্ষমতাবান তখন। পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের পুত্র কিশোর তখন। পাণ্ডব-কৌরবরাও কিশোর। কুন্তীভোজ বৃদ্ধ। সমগ্র উত্তরাপথে জরাসন্ধ-কংসই ক্ষমতার কেন্দ্র। এমতাবস্থায় কৃষ্ণ-বলরাম হত্যা করলেন কংসকে। মথুরায় ফিরিয়ে আনলেন গণতন্ত্র। তার নেতৃত্ব ফিরিয়ে দিলেন উগ্রসেনকে। স্বাভাবিকভাবেই কন্যার আকস্মিক বৈধব্য মানতে পারলেন না জরাসন্ধ। আক্রমণ করলেন মথুরা, উদ্দেশ্য কৃষ্ণ-বলভদ্র বধ। বুঝতে হবে তখন জরাসন্ধ সোমত্ত পুরুষ, বয়স তাঁর চারের কোঠায়।

আরও পড়ুন: শাসক দলের অঙ্গুলিহেলনে পুলিশ চলছে , রায়গঞ্জের কর্মসূচিতে পুলিশি অতিসক্রিয়তা অভিযোগ, সোচ্চার বিজেপি

কৃষ্ণ বুঝলেন, এখন জরাসন্ধকে পরাজিত করা সম্ভব নয় তাঁর পক্ষে। কংসকে প্রকাশ্য রাজসভায় কৌশলে হত্যা করেছিলেন। ব্যক্তিগত আবেগ জড়িয়ে ছিল সেইখানে। আর জরাসন্ধ এসেছেন যুদ্ধবাহিনী নিয়ে। তাকে পরাস্ত করা অসম্ভব। গোছানোর কাজই হয়নি এখনও। কংসের পক্ষের রাজপুরুষেরা জরাসন্ধের পক্ষ নিয়ে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করবেন। তাই সেসময়ে রণে ক্ষান্ত দিলেন। দুইভাই পালিয়ে গেলেন দ্বারকায়। কৃষ্ণের নাম হল রণছোড়জি। রণ অর্থাৎ যুদ্ধ ছেড়ে যিনি চলে গেছেন। এক্ষেত্রে তিনি পালিয়ে বাঁচলেন আর অপেক্ষা করলেন আরও বছর দশেকের। জরাসন্ধ পঞ্চাশ পেরিয়ে বৃদ্ধ হবেন আর ভীমসেন হয়ে উঠবেন সম্পূর্ণ যুবক।

গৃহীদের জন্য এইখানে চরম শিক্ষা লুকিয়ে রয়েছে। জীবনযুদ্ধে কি সবসময় সম্মুখসমরই করতে হবে? ধৈর্য ধরে সুযোগের অপেক্ষা করতে হবে কিছুসময়ে অবশ্যই। কিন্তু, কৃষ্ণ হয়ে গেলেন আবারও একা। বৃন্দাবন ছাড়ার পর থেকে সারাজীবনই তিনি একা। একেবারে। রুক্মিণী, সত্যভামা কেউই তাঁর সঙ্গী হয়ে উঠতে পারেননি। একা একাই কাটিয়েছেন সারা জীবন। বহিরঙ্গে যত মানুষই থাকুক, ভেতরে ভেতরে সম্পূর্ণ রিক্তভাবে, জীবন থেকে বেরিয়ে জীবনকে দেখেছেন কৃষ্ণ, আর তাইই তাঁর বিচার হয়েছে অব্যর্থ।

এহেন মানুষের, যাঁর কর্মময় জীবনটিই আমরা জানি, যাঁকে শিশু, কিশোর ও যুবকরূপেই কেবল জেনেছি, শিল্পীদের তুলিতে, ছেনিতে সেইরূপেই তিনি ধরা দিয়ে চলেছেন আজো, সেই মানুষটিকে কি বৃদ্ধরূপে কখনও আমরা ভেবেছি?

তথাগত বুদ্ধ জরা-ব্যাধি-মৃত্যু দর্শন করে, তার পারে যাবার পথ হিসেবে বুদ্ধত্বকে আবিষ্কার ও প্রয়োগ করলেন নিজের জীবনে। ভারতীয় সমাজে গৃহীর উপরে সন্ন্যাসীকে প্রতিষ্ঠা করলেন। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ? চুড়ান্ত গৃহী অথচ অন্তরে চিরত্যাগী সন্ন্যাসী কি করলেন?

কৃষ্ণ, চিরযুবককৃষ্ণকে মেরে ফেললো কে? শেষ করল কে? জরা। হ্যাঁ, জরা। যে ব্যাধের মারা তীরের আঘাতে বিষক্রিয়ায় কৃষ্ণের মৃত্যু হল, সেই ব্যাধের নাম জরা।

তখন যাদবদের শেষ কাল উপস্থিত। পুরুষ হয়ে নিজেকে নারীর পোশাকে আবৃত করে দুর্বাসাকে পরীক্ষা করতে গিয়ে অভিশপ্ত হলেন কৃষ্ণপুত্র শাম্ব। ভারতের সবচেয়ে ক্ষমতাবান পুরুষের ছেলে হবার অহংকারে বনবাসী জ্ঞানী বৃদ্ধকে অপমান করলেন শাম্ব। পেটে ছিল মুষল। লোহার মুষল ঘষে ঘষেও শেষ করা গেলো না। নাকি অহংকারে মত্ত যাদবেরা ফাঁকিবাজি করলেন? ভাবলেন এইটুকু লোহায় আর কি হবে! কী করেই বা এতবড় যাদবকূল শেষ করবে ক্ষইয়ে দেওয়া মুষলের এইটুকু অংশ?!

কালচক্রে অভিশাপ এভাবেই সাকার হয়। আরবসাগরে ফেলে দেওয়া মুষলের ক্ষয়ে যাওয়া অংশ গিলে খেলো এক মাছ। জেলে মাছের পেট কেটে পাওয়া ফলা বিক্রি করে দিলো ব্যাধের কাছে। সেই ব্যাধের নাম জরা। সে সেই লোহা ঘষে ষষে তৈরি করল তীক্ষ্ণবাণ। তাতে মেশালো ভয়ানক বিষ। তাতেই যদুবংশ ধ্বংস হবে।

মা গান্ধারীর অভিশাপ নতমস্তকে গ্রহণ করেছিলেন, ভক্তদের চোখে স্বয়ং ভগবান, সর্বক্ষমতাবান কৃষ্ণ। যুদ্ধ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া, অভিশাপ মাথায় নেওয়া, এগুলোই কৃষ্ণকে কৃষ্ণ করেছে। তাই সাগরপারে মত্ত হয়ে তুচ্ছকথায় মারামারি করে শেষ হয় যাদবপুরুষেরা। বীতশ্রদ্ধ হয়ে সমুদ্রের ধারে প্রায়োপবেশনে বসে দেহত্যাগ করেন বলরাম।

একলা একাকী কৃষ্ণ গাছের উপর বসে অপেক্ষা করেন তীক্ষ্ণবাণের। মৃত্যুর। কত বয়স হয়েছিল? জরা কি গ্রাস করতে শুরু করেছিল তাঁকে? গাছের ঘন পাতার ফাঁকে টুকটুকে লাল পদতল দেখে জরা মনে করল হরিণের কান। কি অদ্ভূত! যেই পদতললাভের জন্য সারা ভারতের সমস্ত যোগী-জ্ঞানী-প্রেমিক-ভক্ত আকুল, সেই পদতল দেখে জরা মনে করল হরিণের কান। এইই তো মায়া। সেই শাম্বর পেটে লুকানো মুষলের অংশ দিয়ে বানানো ফলা গিয়ে বিদ্ধ হল কৃষ্ণের পায়ে। ক্ষতের মধ্য দিয়ে বিষ প্রবেশ করতে লাগল শরীরে। হতভম্ব জরাকে বললেন হস্তিনাপুরে অর্জুনকে খবর দিতে। অর্জুন এসে কৃষ্ণ-বলরামের সৎকার করলেন আরবসাগরের তীরে। কৃষ্ণজীবন শেষ হল।

এখন পাঠকেরা বলবেন, কৃষ্ণ-জন্মাষ্টমীতে লীলাসংবরণের কথা কেন? আমি বলব, কোনও আসরেই এই শেষলীলা আস্বাদন হয় না। পরীক্ষিত তাঁর মৃত্যুর আগে শুনলেন। ভাগবত মতে কলির বদ্ধজীবের মুক্তি হরিকথা শ্রবণে। তা আপনি কলির বদ্ধ জীব, আপনি সংসারযন্ত্রণা থেকে মুক্তি চান, তা শুধু গোবিন্দের মাধুর্যলীলা শুনলেই হবে? তাঁর একাকীত্ব, তাঁর শেষটা ভাবতে হবে না? ভক্তির আঁশ ছাড়িয়ে তাঁর সহমর্মী না হলে আর কি ভক্ত হলেন মশাই? শুধু তাঁকে ক্ষীরকদম খাইয়ে নিজে খেলেই হবে? তাঁর জীবনের ভেতরে ঢুকবেন না? ভবিতব্য তিনি কি রচনা করলেন, আর কিভাবে তা মেনে নিলেন, সেটাও ভাবতে হবে বৈ কি!

ভগবানও তো ভক্তের কাঁধ চান মাথা রাখার জন্য। শাস্ত্র তো তেমনই বলে। তাই মরণোন্মুখ কলির জীবকে অন্ত্য-লীলা শুনতে হবে বৈ কি! ভাগবতের ব্যাখ্যাকার বলছেন পরীক্ষিত তো তবু জানতেন সাতদিন সময় আছে। কলির জীব কি জানে? এখুনিই তার মৃত্যু হাজির হতে পারে। তাই কীর্তনীয় সদা হরি।

এরকম করেই শেষ হত সেইসব আলোআঁধার মাখা গ্রামগুলোয় ভাগবতের আসর। বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা স্তব্ধ হয়ে বসে থাকতেন। কাঁদতেন। জীবনশেষের কথা আরেকটু বেশি করে ভাবতেন। খঞ্জনির আওয়াজে ঘোর কাটত। চোখ মুছে বৃদ্ধারা আমাকে জড়িয়ে ধরতেন। কেউ কেউ বেশ অনেক্ষণ ধরে জড়িয়ে কাঁদতেন হাউহাউ করে। বৃদ্ধরা এসে কোলাকুলি করতেন। মহিলারা এসে সেসব থেকে ছাড়িয়ে সেবা করাতে নিয়ে যেতেন। ই-রিকশা করে কেউ, কেউ বা দলবেঁধে হেঁটে ফিরতেন কুয়াশামাখা গ্রামের পথে। শেষ শয্যায় শায়িত কৃষ্ণের ছবি ভাবতে ভাবতে মন শক্ত করতেন। চলে তো যেতেই হবে। ভাবনা কিসের!

হরে কৃষ্ণ।

Related Articles

Back to top button
Close