fbpx
পশ্চিমবঙ্গব্লগহেডলাইন

নয়া কৃষিবিল, পক্ষ-প্রতিপক্ষ তরজা এবং বিশ্লেষণ

শুক্লা সিকদার, দমদম: কেন্দ্রের প্রতিপক্ষ জোটের মতে নয়া কৃষি বিল ন্যুনতম সহায়ক মূল্য (মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস সংক্ষেপে এমএসপি) – এর সুরক্ষা ব্যবস্থা থেকে কৃষকদের বের করে দেওয়ার এক কৌশল। সেখানে কেন্দ্রীয় সরকার   পক্ষের পাল্টা দাবি যে নয়া কৃষি বিল এমএসপি-কে প্রভাবিত করবে না এবং এমএসপি ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। তাদের মতে কৃষি বিল এপিএমসি (এগ্রিকালচারাল প্রডিউস মার্কেট কমিটি অর্থাৎ কৃষিজ পণ্য বিপণন সমিতি, পাঞ্জাব ও হরিয়ানার ক্ষেত্রে মাণ্ডী) বাজার ব্যবস্থার বাইরেও কৃষকদের ন্যায্য দাম পেতে অতিরিক্ত অন্ত:রাষ্ট্রীয় পণ্য লেনদেনের সুবিধা দেবে। ফলস্বরূপ মূল ফসল উৎপাদক চাষি এমএসপি নিয়ন্ত্রিত বাজার কিংবা মাণ্ডীর বাইরেও চাহিদা এবং বাজার দর যাচাই করে নিয়ে সর্বোচ্চ মূল্যে নিজেদের উৎপাদিত কৃষিজ পণ্য বিক্রি করতে পারবেনI কেন্দ্রীয় গোষ্ঠীর ধারণা এতে করে ভারতীয় কৃষকগণ লাইসেন্স রাজের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে সর্বোচ্চ মূল্যে নিজেদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে সরাসরি লাভবান হবেন এবং ভারতীয় কৃষি বিপণন ব্যবস্থা অন্ত:রাষ্ট্রীয় মুক্তবাজারের সুবিধা পাবে। ঠিক যেমনটি বলবৎ হয়েছিল নরসিমহারাও সরকারের মুক্ত অর্থনীতি ব্যবস্থায় কিংবা সাম্প্রতিক “ওয়ান নেশন ওয়ান রেশন কার্ড” প্রকল্পের ক্ষেত্রে (পশ্চিমবঙ্গ ছত্রিশগড় অরুণাচল প্রদেশ আসাম এবং তামিলনাড়ু ব্যতিরেকে)I

এমএসপির বিষয়ে তথ্য বিশ্লেষণ করতে গেলে দেখা যায় ২০১২-১৩ সালের (NSSO) এনএসএসও-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে ভারতের ১০ শতাংশেরও কম কৃষক এমএসপি (মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস অর্থাৎ সর্বনিম্ন সহায়ক মূল্য) তে তাদের উৎপাদিত কৃষিজ পণ্য বিক্রি করতে আগ্রহ প্রকাশ করে থাকেন এবং মাত্র ৬ শতাংশ কৃষক তাদের উৎপাদিত পণ্যের জন্য এমএসপি মূল্য পেয়ে থাকেন। অবশিষ্ট ৯৪ শতাংশ কৃষক তাদের উৎপাদিত কৃষিজ পণ্য বাজারে বিক্রি করেন। উক্ত ৬ শতাংশ কৃষকই মাণ্ডী ব্যবস্থা এবং সর্বনিম্ন সহায়ক মূল্য ব্যবস্থার সমর্থক  যাদের অধিকাংশই পাঞ্জাব ও হরিয়ানার।

তাই নয়া কৃষি বিল নিয়ে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের কৃষকদের অসন্তুষ্টি ও বিক্ষোভের যতই খবর বেরোক না কেন সেগুলিকে বিক্ষিপ্ত আঞ্চলিক বিক্ষোভ, এমনকী কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্ররোচনামূলক বিক্ষোভ বলেও অভিহিত করেছেন কেন্দ্রীয় সরকার পক্ষ I তাদের মতে উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ এবং বিহারের মত বড় রাজ্য সমূহের কৃষকরা এমএসপি মূল্যে সন্তুষ্ট নন তারা ভালো মূল্যের জন্য মুক্ত বাজারের উপর নির্ভর করেন I আর এমএসপি ব্যবস্থার অবলুপ্তি না হওয়ায় কৃষকদের যে ঝুঁকি থাকে ফসল নষ্ট হওয়ার তা থেকেও কৃষকদের রক্ষা করার ব্যবস্থা আছে এই নয়া কৃষি বিলে এমনটাই অভিমত কেন্দ্রীয় সরকার পক্ষের। অন্তঃরাজ্য ও অন্তঃদেশীয় বাজারমূল্য বিবেচনা কল্পে কৃষক  বৃহত্তর বাজার পেয়ে যাবেন তার উৎপাদিত কৃষজ পণ্য বিক্রি করার জন্যI সেক্ষেত্রে দেশীয় কৃষিপণ্য স্থানীয় বাজারের পরিসর পেরিয়ে চাহিদা অনুযায়ী বৃহত্তর বাজারের সুবিধা পাবে বলে কেন্দ্রীয় সরকার পক্ষ মনে করেনI যদিও পরিবহন সংক্রান্ত ঝুঁকি কিংবা কৃষকদের প্রযুক্তিগত অপারগতার ব্যাপারে কিছু আলোকপাত করা হয়নিI বলা হয়নি কৃষক ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নিশ্চিত করতে না পারলে তার ক্ষেত্রে সরকারের কোনও হস্তক্ষেপের ব্যাপারেI তবে বলা হচ্ছে যে মূল উৎপাদক অর্থাৎ কৃষকদের লাইসেন্স রাজের রমরমা থেকে মুক্তি দেওয়া এবং মধ্যস্বত্ব ভোগীদের অবসান কল্পেই তৈরি হয়েছে নয়া কৃষি বিল।

নয়া কৃষি বিলে চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ, গম, ভোজ্য তেল ইত্যাদি আর আবশ্যকীয় পণ্য হিসেবে বিবেচিত হবে না এবং উক্ত পণ্যগুলি  মজুতদারির ক্ষেত্রে উর্ধ্বসীমা আর থাকবে না। যা নিয়ে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বীতার মুখে পড়তে হচ্ছে  কেন্দ্রীয় সরকার পক্ষকেI এক্ষেত্রে কেন্দ্রের প্রতিপক্ষ জোটের মতে যেহেতু চাল, ডাল, গম, আলু, পেঁয়াজ আর অত্যাবশ্যকীয় পণ্য সমুহের তালিকায় রইল না এবং এগুলি মজুতদারীর কোন উর্ধ্বসীমা যেহেতু থাকছে না তাই উক্ত পণ্যগুলো মজুতদারগন খেয়াল খুশি মতো এবং ইচ্ছে মতন পরিমাণে মজুত করতে পারবেন। মজুতদারগণ তাদের ব্যবসায়ীক লাভের জন্য বাজারে এই পণ্যগুলোর কৃত্রিম অভাব তৈরী করতে পারবেন, পণমূল্য ফলে স্বাভাবিক ভাবেই বৃদ্ধি পাবে।

এপ্রসঙ্গে বলা হচ্ছে যে ৪৩ এর ভয়াবহ মন্বন্তরের একটি অন্যতম কারণ ছিল মজুতদারদের লাগামহীন মজুতদারি। যার ফলে অজস্র মানুষ দুর্ভিক্ষে মারা গিয়েছিলেন বা সর্বস্বান্ত হয়েছিলেন।

আর এই যে মজুতদারির অবশ্যম্ভাবী বিপদ কেন্দ্রের প্রতিপক্ষ জোট চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাচ্ছে তার কি কোন প্রতিবিধান নয়া কৃষি বিলে থাকছে না ? বিল অনুযায়ী স্পষ্টতই থাকছে। কিন্তু সেক্ষেত্রে রাজ্য সরকারগুলোর কার্যত আর কিছু করণীয় থাকছে না। বিশেষ প্রয়োজন মনে হলে কেন্দ্রই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিরূপণ করব

আপত্তি সেখানেওI সেক্ষেত্রে আবার রাজ্যের ক্ষমতা হ্রাস করার ব্যাপারে কেন্দ্র “সরকারের ট্র্যাক রেকর্ড” এবং “বিশেষ প্রয়োজন” নির্ধারণের  নিরপেক্ষতার উপর উঠেছে প্ যদিও উক্ত প্রশ্নগুলি আবার রাজ্য সরকারের ক্ষেত্রেও কম প্রযোজ্য নয়I রাজ্য সরকারের আদায়ীকৃত সেস, কর ইত্যাদির বিলোপ ঘটায় কেন্দ্র বিরোধী গোষ্ঠীগুলির কৃষি বিল নিয়ে আপত্তি আবার এক নতুন মাত্রা পেয়েছে।

এরপর আবার কৃষি বিলটিতে চুক্তিভিত্তিক চাষের কথা বলা হচ্ছে। অর্থাৎ এখন থেকে কর্পোরেট সংস্থা কৃষকের সাথে অগ্রিম চুক্তির মাধ্যমে কৃষককে দিয়ে চাষ করাতে পারবে। দরদাম চাষের আগেই চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত হয়ে যাবে। কেন্দ্রীয় সরকার পক্ষ এই ব্যবস্থাকে কৃষকের স্বাধীনতা বলে অভিহিত করেছে। সেক্ষেত্রে কেন্দ্রের প্রতিপক্ষ জোটের যুক্তি একই মডেল অনুসরণ করে এদেশে কৃষক শোষণের নৃশংসতম নজির রেখে গিয়েছে নীলকররা। নীলচাষও এরকমই চুক্তিভিত্তিক ছিল। দরদাম চাষের আগেই ঠিক হয়ে যেত আর তারপর সর্বস্ব খোয়াতেন কৃষককুলI ওই ঘটনার পুণরাবৃত্তি আবার হবে না এরকম কোন গ্যারান্টি নতুন কৃষি আইনে নেই। কৃষক যে তার ফসলের ন্যায্য দাম পাবেনই বা কর্পোরেট সংস্থার সাথে বার্গেনিংয়ে সরকার কৃষকের পক্ষে থাকবেন বা কর্পোরেট সংস্থা জুলুম করলে সরকার কৃষককে সাহায্য করবেন এমন কোন প্রতিবিধানও নেই। কেন্দ্রীয় গোষ্ঠীর এক্ষেত্রে যুক্তি কর্পোরেট বিলগ্নিকারীদের সঙ্গে সরাসরি চুক্তিবদ্ধ হওয়ার সুযোগ থাকায় কৃষিক্ষেত্রে কর্পোরেট বিলগ্নিকরণ বাড়বে। কৃষক ও লগ্নিকারী কোন তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা ছাড়াই নিজেদের নিজেদের সর্বোচ্চ লাভ বিবেচনা করে চুক্তিবদ্ধ হতে পারবে, যাতে করে মুক্ত কৃষি ব্যবস্থার এক নতুন অধ্যায় শুরু হবে।

কেন্দ্রীয় সরকার পক্ষের মতে নীল চাষ যেখানে কৃষি জমির চরিত্র স্থায়ীভাবে পরিবর্তন করে ফেলত সেখানে নয়া কৃষি বিলে কৃষি জমির স্থায়ীভাবে চরিত্র পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলিও নিষিদ্ধ করা হয়েছেI জমিতে কি ফসল উৎপাদিত হবে তা জমির মালিকের উপরেই নির্ভর করবে। কৃষকদের সঙ্গে যেকোনো চুক্তির ক্ষেত্রে শুধুমাত্র উৎপন্ন ফসলের উপরে ভিত্তি করেই চুক্তি হবে বলে স্পষ্ট করা হয়েছে। বলা হয়েছে চাষের জমি, পদ্ধতি কিংবা উপকরণ নিয়ে চুক্তি নয়I উৎপন্ন ফসল এবং মূল্যের উপর চুক্তি এবং এই চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পর ফসল নষ্ট হলে বা কৃষক চাইলে চুক্তি থেকে বের হতে পারবেন। চুক্তি সংক্রান্ত সমস্যার জন্য ব্লক মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে বিচার চাইতে পারবেন। তাই নীলকর বা নীল চাষের মতন ব্যবস্থার সম্ভাবনা নেই। চুক্তি উৎপন্ন ফসল ও দামের সঙ্গে।  জমির মালিকানা কিংবা চাষ সংক্রান্ত বিষয়ে নয়।

কেন্দ্রের প্রতিপক্ষ জোটের মতে এই বিল কর্পোরেটসংস্থাগুলিকে কৃষি জমি অধিগ্রহণের সুবিধা করে দেবে এবং কৃষকদের শ্রমিকে পরিণত করবে। সেক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকার পক্ষের বক্তব্য যে এই বিলে কৃষকের জমি বিক্রয়, লিজ দেওয়া ও বন্ধকী সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এমনকী, মালিকানার অধিকার পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলিতেও সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে পক্ষ প্রতিপক্ষের কলরবে হারিয়ে যাচ্ছে কৃষকদের ভাষা। কেউ প্রকৃত কৃষকদের কথা একটু শুনবেন কি ? কোন ব্যবস্থার পরিমার্জন প্রয়োজন হলেও মুখোমুখি তো বসতে হয়, আলোচনায় তো আসতে হয়। মনে হচ্ছে সেই ফলপ্রসূ আলোচনার রাস্তাই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দিন দিন I গণতন্ত্রের স্বার্থকে মাথায় রেখেও পক্ষ প্রতিপক্ষ যেন আপস করার রাস্তায় ভুল করেও হাঁটবে না। গণতন্ত্রের মন্দির সংসদ ভবনে নজিরবিহীন চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা বোধহয় তারই ইঙ্গিত।

(মতামত নিজস্ব)

Related Articles

Back to top button
Close