fbpx
অন্যান্যআন্তর্জাতিকগুরুত্বপূর্ণদেশহেডলাইন

নোবেল – একটা স্বপ্নের পুরস্কার !!

অনিন্দ্য কর: নোবেল পুরস্কার- একটা পৃথিবী জোড়া খ্যাতি, জগৎ জোড়া সন্মান, আরও কতকি! এই নোবেল পুরস্কার প্রত্যেক বছর, অ্যাকাডেমিক, সাংস্কৃতিক বা বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির স্বীকৃতি হিসাবে সুইডিশ এবং নরওয়েজিয়ান প্রতিষ্ঠানের দ্বারা দেওয়া বার্ষিক আন্তর্জাতিক পুরস্কারের একটি সেট।

১৮৯৫ সালের ২৭ নভেম্বর সুইডিশ রসায়নবিদ, ইঞ্জিনিয়ার এবং শিল্পপতি আলফ্রেড নোবেল তাঁর শেষ ইচ্ছা এবং টেস্টামেন্টে স্বাক্ষর করে গিয়েছিলেন। সেই ইচ্ছে অনুসারে তাঁর সম্পত্তির সবচেয়ে বড় অংশটি পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, ফিজিওলজি বা মেডিসিন, সাহিত্যও শান্তিবিভাগে এই পুরস্কার দেওয়া হয়।

উপরোক্ত বিভাগগুলিতে এই পুরস্কার সর্বপ্রথম ১৯০১ সালে ভূষিত করা হয়েছিল এবং সেই বছর থেকে পুরস্কারগুলি তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে উপলব্ধ সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার হিসাবে পৃথিবীতে বিবেচিত হচ্ছে।

যাইহোক, এরপর ১৯৬৮ সালে সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক – “সেরিজেস রিক্স ব্যাঙ্ক’’ (আমাদের দেশের যেমন রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া) তাঁদের ব্যাঙ্ক স্থাপনের ৩০০বছর পূর্ণ করে।

উপলক্ষ্যে, তখনকার ব্যাঙ্ক ম্যানেজমেন্ট, একটি মোটা অঙ্কের টাকা নোবেল ফাউন্ডেশন কমিটির হাতে তুলে দেয়। সেই সময় থেকে, এই আলফ্রেড নোবেলের স্মরণে, “ইকোনমিক সায়েন্সেস”, একটি অতিরিক্ত বিষয়ের ওপরে “সেরেজেস রিক্স ব্যাঙ্ক’’-একটি পুরস্কার চালু হয়। এই পুরষ্কার, সেরেজেস রিক্স ব্যাঙ্কের কাছ থেকে নোবেল ফাউন্ডেশনের প্রাপ্ত অনুদানের ভিত্তিতেই, অর্থনৈতিক বিজ্ঞান বিষয়ের উপরে, একদম নোবেল পুরস্কার দেওয়ার নিয়ম মেনেই, ১৯৬৯ সাল থেকে দেওয়া শুরু হয়েছে।
কিন্তু, এই পুরস্কারটি দেয় রয়েল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস, স্টকহোম , সুইডেন। এখানে আরও একটু বলা দরকার যে, আলফ্রেড নোবেল তাঁর শেষ ইচ্ছায়, এই অতিরিক্ত বিষয়টির কোনও উল্লেখ করে যাননি।

প্রত্যেক বছর, পুরস্কার অনুষ্ঠানগুলো (একটি বিষয় বাদে) সুইডেনের স্টোক হোলম এ অনুষ্ঠিত হয়। “শান্তি বিষয়ক পুরস্কার” অনুষ্ঠানটি হয় নরওয়ের ওসলোতে। প্রতিটি প্রাপক (এঁদের “লরেট” বলে অভিহীত করা হয়) একটি স্বর্ণপদক, একটি ডিপ্লোমা এবং নোবেল ফাউন্ডেশন কর্তৃক সিদ্ধান্ত নেওয়া একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পেয়ে থাকেন।

বর্তমান ২০২০ সালের হিসাবে, প্রতিটি পুরষ্কার ৯0,00,000 এসইকে (এসইকে, হচ্ছে সুইডেনের জাতীয় মুদ্রা– সুইডেনের ক্রোনার এর কারেন্সি কোড)। এটা প্রায় সাতকোটি ভারতীয় টাকার সমতুল্য।

নোবেল ফাউন্ডেশনের বিধিতে বলা হয়েছে: “নোবেল কমিটির বিচারে যদি একই বিষয়ে দুজন বা তিনজন বিবেচিত হন, তবে সম্মিলিতভাবে তাঁদেরকে পুরস্কার দেওয়া হবে এবং সেক্ষেত্রে পুরস্কারের অর্থ সমানভাবে ভাগ হবে, কিন্তু কোনও অবস্থাতেই কোনও পুরস্কারের পরিমাণ তিনজনের বেশি প্রাপককে ভাগ করা যাবে না।

১৯০১ এবং ২০১৯-এর মধ্যে নোবেল পুরস্কার এবং অর্থনৈতিক বিজ্ঞানের পুরস্কার ৫৯৭বার প্রদান করা হয়েছে (এর মধ্যে এককভাবে পেয়েছেন ৩৫০বার, যুগ্মভাবে ১৪১বার এবং তিনজনের গ্রুপ ১০৬বার)। ১৯০১ সালে শুরু হওয়ার পরে, কিছু বছর নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়নি। সেটা ঘটেছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯১৪ -১৯১৮) এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯৩৯ -১৯৪৫)।

নোবেল ফাউন্ডেশনের আইন-কানুনে বলা হয়েছে: “বিবেচনাধীন যেকোনও একটি কাজ যদি নির্দিষ্ট কোনও বছরে, গুরুত্বের বিষয় হিসাবে খুঁজে পাওয়া না যায়, তবে পুরষ্কারের টাকাটি পরের বছর পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকবে। যদি, তবুও পুরস্কার দেওয়া না যায়, তবে এই অর্থের পরিমাণটি ফাউন্ডেশনের নির্দিষ্ট তহবিলগুলিতে যুক্ত করা হবে।

ভারতীয় পরিস্থিতিআমরা জানি, প্রথম ভারতীয় হিসাবে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার পান। তাঁর সৃষ্ট গীতাঞ্জলির রচনার স্বীকৃতি স্বরূপ তাঁকে সাহিত্যের নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।

এরপর, ১৯৩০ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পেয়েছিলেন মি: সি.ভি.রমণ। এখানে একটা কথা উল্লেখ করা দরকার যে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ এবং সি ভি রমণ, এঁনারা যখন দুজন নোবেল পেয়েছিলেন তখন আমাদের দেশ পরাধীন ছিল এবং সেই সূত্রে, ওনারা দুজনই ব্রিটিশ রাজ্যের নাগরিক ছিলেন। তারপরে, মাদার তেরেসা (১৯৭৯- শান্তি), অমর্ত্যসেন (১৯৯৮- অর্থনৈতিক বিজ্ঞান) এবং কৈলাশ সত্যার্থী (২০১৪ -শান্তি) নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। এই তিন নোবেল বিজয়ী কিন্তু এই পুরস্কারে ভূষিত হওয়ার সময় স্বাধীন ভারতের নাগরিক ছিলেন।

এরপর, নোবেল পুরস্কার পান কয়েকজন, যারা জন্মসূত্রে ছিলেন ভারতীয়। কিন্তু এই পুরস্কার লাভের সময় তাঁরা অন্য দেশের সিটিজেনশিপ লাভ করে নিয়েছিলেন। এঁরা হলেন, হরগোবিন্দ খোরানা (মার্কিন নাগরিক, ১৯৬৮- ফিজিওলজি বা মেডিসিন), সুব্রামানিয়ান চন্দ্রশেখর (মার্কিন, ১৯৮৩- পদার্থবিজ্ঞান), ভেঙ্কি রাম কৃষ্ণান (মার্কিনও ব্রিটিশ, ২০০৯- রসায়ন) এবং অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় (মার্কিন, ২০১৯ – অর্থনৈতিক বিজ্ঞান)।

আরও একটি বিভাগ রয়েছে, যারা ভারতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং ভারতের বাসিন্দা ছিলেন কিন্তু এই পুরস্কার পাওয়ার সময় ভারতীয় নাগরিক ছিলেন না। এঁরা হলেন, রোনাল্ডরস (১৯০২ – ফিজিওলজি বা মেডিসিন), রাইয়ার্ড কিপলিং (১৯০৭-সাহিত্য) এবং ১৪তম দালাইলামা (১৯৮৯–শান্তি)।

এছাড়া, আরও একজন আছেন, তিনি হলেন ২০০১ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত স্যার বিদিয়াধর সুরজপ্রসাদ নাইপল, ত্রিনিদাদে জন্মগ্রহণকারী ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক।

বিশ্ব পরিস্থিতি আজ পর্যন্ত, বিজয়ীদের লিস্ট অনুযায়ী, পাকিস্তানের তরুণ কর্মী মালালা ইউসুফজাই মাত্র ১৭ বছর বয়সে ২০১৪ সালে শান্তির জন্য এই নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন। তিনিই নোবেল জয়ীদের সবচেয়ে কম বয়সী, অন্যদিকে, জন বি গুডেনোফ, একজন আমেরিকান, যিনি রসায়নের জন্য (২০১৯সালে) এই পুরস্কার পেয়েছেন, তাঁর ৯৭ বছর বয়সে।

১৯০১ এবং ২০১৯ এর মধ্যে নোবেল পুরস্কার এবং অর্থনৈতিক বিজ্ঞানের পুরস্কার মহিলাদের ৫৪বার দেওয়া হয়েছে- ম্যারিকুরি, যিনি প্রথম এই সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন। উনি প্রথম, ১৯০৩ সালে তাঁর স্বামী পিয়েরেকুরি এবং হেনরি বেকারেলের সঙ্গে পদার্থ বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছিলেন।

এরপরে ১৯১১ সালে, তিনি আবার রসায়নে এই পুরস্কার জিতেছিলেন। সেই জন্য, ম্যারি কুরি, পৃথিবীতে একমাত্র মহিলা যিনি দুবার নোবেল পুরস্কার জিতেছেন। এই কারণে, শ্রীমতিও শ্রীকুরিকে অত্যন্ত একটি সফল “নোবেল প্রাইজ ফ্যামিলি’’ বলা হয়। তাঁদের ছাড়াও পৃথিবীতে আরও পাঁচ বিবাহিত দম্পতি রয়েছেন (পুরস্কারের সময়) যারা যৌথভাবে এই পুরস্কার পেয়েছেন। তারপরে, মা-কন্যা, পিতা-কন্যা, পিতা-পুত্র এবং দুইভাইয়ের সমন্বয়ে যৌথ প্রাপকের উদাহরণও রয়েছে। এরপরে, ইতিহাস বলেযে ১৯৬৪ ও ১৯৭৩ সালে দুজন নোবেল বিজয়ী, কিছু ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক কারণে তাঁদের পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

ইতিহাস আরও বলে, চার বিজয়ীকে, তাঁদের নিজ নিজ দেশের কর্তৃপক্ষ নোবেল পুরষ্কার অস্বীকার করতে বাধ্য করেছিলেন। অ্যাডল্ফ হিটলার, তিন জার্মান নোবেলজয়ী রিচার্ড কুহন, অ্যাডল্ফ বুটেন্যান্ডট এবং জারহার্ড ডম্যাগকে নোবেল পুরস্কার গ্রহণে নিষেধ করেছিলেন। তারা অবশ্য সকলেই, পরে নোবেল পুরস্কার ডিপ্লোমা এবং পদক পেয়েছিলেন- তবে পুরস্কারের নগদ পরিমাণটি পায়নি।

ঠিক এমনিভাবে, ১৯৫৮ সালে সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী বরিস প্যাস্তর নাক, প্রথম দিকে নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করেছিলেন, তবে পরে সোভিয়েত ইউনিয়নের কর্তৃপক্ষ ওনাকে এই প্রাপ্ত নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য করেন।
আমেরিকার লিনাসপলিং একমাত্র ব্যক্তি যিনি দু’টি একক ভাবে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন – ১৯৫৪ সালের রসায়নের নোবেল পুরস্কার এবং ১৯৬২ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার।

যদিও নিয়ম আছে যে নোবেল পুরস্কার, তিন জনের বেশি ব্যক্তির মধ্যে ভাগ করা যাবে না, কিন্তু এরকম উদাহরণ আছে যেখানে, বিশেষত নোবেল শান্তি পুরস্কার তিনের বেশি লোকের সংস্থাগুলিকে দেওয়া হয়েছে।

১৯৭৪ সাল থেকে নোবেল ফাউন্ডেশনের লিখিত আইনে বলার রয়েছে যে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার পরে মৃত্যু না হলে কোনও বিজয়ীকে মরণোত্তর পুরস্কার দেওয়া যাবেনা। যাইহোক, ১৯৭৪ এর আগে, নোবেল পুরষ্কার মরণোত্তর ভাবে দুটি বার দেওয়া হয়েছিল: সুইডেনের ড্যাগ হামার স্কেলজিল্ডকে (নোবেল শান্তি পুরস্কার, ১৯৬১) এবং এরিক অ্যাক্সেল কারফল্ডেটকে ( সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার, ১৯৩১)।

আজ পর্যন্ত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সর্বোচ্চ নোবেল পেয়েছে-৩৮৩টি, তারপরে যুক্তরাজ্য- ১৩২টি এবং জার্মানি-১০২টি পুরস্কার পেয়েছে।নোবেল বিজয়ীদের নিয়ে ব্যাঙ্কনোটএখন অবধি, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া আমাদের দেশের কোনও নোবেল বিজয়ীদের নিয়ে, তাঁদের সম্মানার্থে আজ পর্যন্ত ব্যাঙ্ক নোট মিন্ট করেনি। তবে, কিছুটা আশার আলো আমরা দেখি যখন ২০১১ সালে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫০তম জন্মবার্ষিকী এবং ২০১০ সালে, মাদার তেরেসার জন্মশত বার্ষিকীতে দুটি স্মারকমুদ্রা ভারত সরকার রিলিজ করেন। এই দুটি বাদে অন্যকোনও নোবেল বিজয়ীকে আমাদের স্মারক মুদ্রায় বা ব্যাঙ্ক নোটের কোনও অংশে আমরা কখনও দেখিনি।

তবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের পরিস্থিতি একদম আলাদা। নরওয়ে, আয়ারল্যান্ড, পোল্যান্ড এবং সুইডেন এমন কয়েকটি দেশের উদাহরণ, যারা প্রথম দিকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী / বিজয়িনীকেও তাদের ব্যাঙ্কনোটের উপরে স্থান দিয়েছিল।
এখন অবধি, ২২টি দেশের ২৮ জন নোবেল বিজয়ী/ বিজয়িনীকে তাঁদের নিজ নিজ দেশ এনাদের নামে ৬৭টি স্মরণীয় ব্যাংক নোটজারি করে তাদের সম্মানিত করেছেন।

এর মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার নোবেল জয়ী নেলসন ম্যান্ডেলা এই তালিকার শীর্ষে রয়েছেন। ১৯৯৩ সালে তিনি শান্তিতে নোবেল জিতেছিলেন। তাঁর দেশতাকে সম্মান জানাতে ২০১২ সালে বিভিন্ন মূল্যের ৪টি ব্যাঙ্ক নোট, ২০১৩ সালে পাঁচটি বিভিন্ন মূল্যের ব্যাঙ্ক নোট এবং ২০১৮ সালে পাঁচটি পৃথক মূল্যের নোট জারি করেছে।

Related Articles

Back to top button
Close