fbpx
গুরুত্বপূর্ণব্লগহেডলাইন

ভুয়ো নয়, পশ্চিমবঙ্গে প্রকৃত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা বিজেপিই করবে

সৌমিত্র খাঁ: বর্তমান সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গে নাকি বেকারত্বের হার ৪০ শতাংশ কমেছে! এই দাবি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সহ তাঁর মন্ত্রিসভার অন্যতম সদস্য অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র সরকারিভাবে বহুবার করেছেন। তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যাক এই তথ্য সঠিক। এবার একটু যুক্তি দিয়ে ভাবা যাক। মুখ্যমন্ত্রীর বয়ান অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে যদি প্রতি বছর গড়ে ৯ লক্ষ চাকরি হয়ে থাকে তাহলে গত ৯ বছরে ৮১ লক্ষ ছেলেমেয়ের চাকরি হয়েছে? তাই যদি হয়ে থাকে তাহলে সারা দেশে বেকারত্ব বাড়ছে বলে (সস্তা রাজনৈতিক স্বার্থে ভোটের কথা মাথায় রেখে) মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে দাবি করছেন সেটা কি ধোপে টেকে? গত লোকসভা নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিজি ঠিক একই দাবি করে বলেছিলেন, “পশ্চিমবঙ্গ কি ভারতের বাইরে? সেখানে যদি বছরে ৯ লক্ষ কর্মসংস্থান হয়, তাহলে দেশে বেকারত্বের সমস্যা থাকে কী করে?” এখন আপনারাই বুঝুন কোন তথ্য ঠিক? যে রাজ্য মহিলাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোকে সঠিক তথ্য পাঠাতে ভয় পায় তারা যে রাজ্যের বেকারত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের তথ্য চেপে দেবেন সে কথা বলাই বাহুল্য।

বেকারত্ব এক সামাজিক ব্যাধি এবং পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে এই সমস্যা গত কয়েক দশকে এক অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা খুবই দুর্ভাগ্যের হলেও সত্যি যে, কংগ্রেস সরকার থেকে শুরু করে পূর্ববর্তী বাম সরকার এবং বর্তমানে তৃণমূল কংগ্রেস, বেকারত্ব দূরীকরণে এদের কেউই কোনও সদর্থক ভূমিকা গ্রহণ করেনি। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে হাজার হাজার কলকারখানা বন্ধ হয়েছে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ কর্মহীন হয়েছেন। ষাট এবং সত্তরের দশকে বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নগুলোর নেতিবাচক মনোভাবের জন্য বহু কলকারখানা বন্ধ হয়েছে আর তৃণমূলের আমলে সেটা আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। শিল্পায়নে লগ্নি টানা থেকে বিনিয়োগের উপযুক্ত জমি-নীতি তৈরি করা, একটা রাজ্য যদি এইসব বিষয়গুলিতে পিছিয়ে থাকে তাহলে তারা বেকারত্বে যে এগিয়ে থাকবে সেটাই স্বাভাবিক।

আমরা যদি রাজ্যসভায় কেন্দ্রের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিচার করি তাহলে দেখব পশ্চিমবঙ্গে ২০১৫-১৬ অর্থবর্ষের নিরিখে প্রতি হাজার বেকারের মধ্যে স্নাতক ৯৮ জন এবং স্নাতকোত্তর ১৩৯ জন, একথা গত ফেব্রুয়ারি মাসে রাজ্যসভায় কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রী সন্তোষ গাঙ্গোয়ার জানিয়েছিলেন। কেন্দ্রের তরফে তথ্য পেশ করে আরও জানানো হয়েছে যে, ২০১৭-২০১৮ অর্থবর্ষে এই রাজ্যে ১৫ বছরের বেশি বয়সি বেকারদের মধ্যে ১২ শতাংশ স্নাতক৷ ১৫ বছরের বেশি স্নাতকোত্তর বেকার ১৩.৭ শতাংশ। শুধু তাই না, ২০১৫ সালে কেন্দ্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী যেহেতু পশ্চিমবঙ্গে সেভাবে কোনও নতুন শিল্প বা কারখানা হয়নি তাই বেকারভাতা পাওয়ার জন্য ৭০ লক্ষ ৮৬ হাজার মানুষ এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জে নাম লিখিয়েছিলেন।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে প্রতিবছর ঘটা করে বিজনেস সামিট করলেও তার কোন সুফল রাজ্যের জনগণ পায়নি। গত কয়েক বছরে এই রাজ্যে কোন ভারী বা মাঝারি শিল্প হয়নি কারণ এখানে শিল্পবান্ধব পরিবেশের অভাব তাই উদ্যোগপতিরা পশ্চিমবঙ্গে লগ্নি করতে উৎসাহী নন। উদাহরণস্বরূপ বিশ্ববিখ্যাত ইনফরমেশন অ্যান্ড টেকনোলজি কোম্পানি ইনফোসিসের রাজারহাটে ক্যাম্পাস তৈরি হলে কয়েক হাজার ছেলেমেয়ের কর্মসংস্থান হত কিন্তু আইনি জটিলতার কারণে সেই প্রজেক্ট গত পাঁচ বছরে ধরে থেমে আছে। জিন্দলরাও মেদিনীপুরের শালবনিতে ৩৫,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে যে ভারী শিল্প করবে বলে ঘোষণা করেছিল তাও বাস্তবায়িত হয় নি। রাজ্যসরকারের সঙ্গে বোঝাপড়ার অভাবে কারখানার জন্য অধিগৃহীত জমি তারা ফেরত দিয়ে দিয়েছিল। এখানেই শেষ নয়। সিন্ডিকেট রাজ্ এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, শাসকদলের দাদাদের নিয়মিত তোলা না দিলে শিল্পপতিরা রাজ্যে ব্যবসা করতে পারবে না। সিন্ডিকেট রাজ, সিপিএমের আমলে তৈরি হওয়া চারাগাছ যা আজ বিষবৃক্ষে পরিণত হয়েছে। যার ফল ভোগ করতে হচ্ছে এই রাজ্যের সাধারণ জনগণকে।

আমরা দেখেছি চাকরির দাবিতে বেকার ছেলেমেয়েদের অনশন ভাঙতে রাজ্য পুলিশ কিভাবে তাদের উপর লাঠিচার্জ করে। এই স্বৈরাচারী সরকারের আমলে কারও কোনও গণতান্ত্রিক পরিসর নেই তাই বেকার ছেলেমেয়েদের যেমন পুলিশের মার খেতে হয় তেমনি পরিকল্পনা করে রাজনৈতিক হত্যাকান্ড ঘটিয়ে বিরোধী দলের কণ্ঠরোধ করা হয়। যেমনটা টিটাগড়ে ঘটল। আমাদের দলের মণীশ শুক্লাকে খুন হতে হল শুধুমাত্র তিনি বিজেপির সদস্য বলে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে রাজনৈতিক সংস্কৃতির উপর ভর করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চাইছেন তার পরিণাম ভয়াবহ। আজকের বর্তমান এক ধ্বংসাত্মক ভবিষ্যতের পথ প্রশস্ত করছে। আর তার জন্য দায়ী থাকবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাই যদি এই স্বৈরাচারী সরকারকে গদিচ্যুত না করা হয় তাহলে বাংলা মায়ের সম্মান আমরা বাঁচাতে পারব না।

আরও পড়ুন:ভারী বর্ষণের জেরে বিপর্যস্ত হায়দরাবাদ.. জলের তোড়ে ভেসে গেল একই পরিবারের ৯ জন

সরকারি নিয়োগের খুব বড় অংশ শিক্ষকদের কর্মসংস্থানের উপর নির্ভর করে। কিন্তু বর্তমান শাসকের আমলে প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চ বিদ্যালয় — শিক্ষক নিয়োগের প্রতি অবহেলা এবং অনীহা আজ এক জটিল প্রতিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজ্যে শিক্ষকদের জন্য প্রায় ৭০,০০০ এর বেশি শূন্য পড়ে আছে কিন্তু শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় কদিন আগেই সরকারি ভাবে জানিয়েছেন, তাঁরা নাকি শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে এখনি কিছু ভাবছেন না। “এখন নিয়োগ নিয়ে আমরা ভাবছি না নিয়োগ নিয়ে এখন কি করে ভাবব? মানুষ বাঁচবে কিনা তার ঠিক নেই… এমন কি যাকে নিয়োগ করা সেই বাঁচবে কিনা তার ঠিক নেই…” আমাদের দায়িত্বশীল শিক্ষামন্ত্রী একথা বলতে দ্বিধাবোধ করেন নি। শুধু তাই না, সরকারি নিয়োগ ঘিরে দুর্নীতি আজ এক সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। সরকারি চাকরিতে একমাত্র শাসকদলের নেতা, মন্ত্রীদের বাড়ির লোকেরাই অগ্রাধিকার পাবেন সেটা তৃণমূলের জমানায় অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। রাজ্যের শিক্ষিত যুবক-যুবতীদের প্রতি এর থেকে বড় অপমান আর কি হতে পারে? যদিও চলতি মাসে সরকারি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দাবি করা হয়েছে যে, পরের বছর নাকি ১৫,০০০ শিক্ষক নিয়োগ করা হবে কিন্তু সেটা যে আগামী বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক চমক দিয়ে বেকার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে স্রেফ একটা প্রতারণা সেটা বুঝতে আর কারো বাকি নেই।

শুধু শিক্ষকের চাকরির দাবি জানিয়ে ব্যর্থ হয়ে গত কয়েক বছরে অনেক যুবক-যুবতী আত্মহননের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে। তবু এই হৃদয়হীন সরকারের টনক নড়েনি। আমি জানতে চাই আর কতজন আত্মাহুতি দিলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন গলবে? কদিন আগে মুখ্যমন্ত্রী যখন উত্তরপ্রদেশের তরুণীর মৃত্যুর প্রতিবাদে পথসভা করেছিলেন, ঠিক তখন কয়েকশো শিক্ষক পদপ্রার্থী শহিদ মিনারে মৌন ধরনায় বসেছিল।

২০০৫ সাল থেকে অপেক্ষা করে তারা এখনও চাকরি পায়নি। তাই তারা মুখ্যমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছে হয় তাদের চাকরি দেওয়া হোক বা তাদের আত্মহত্যার জন্য গলার দড়ির ব্যবস্থা করা হোক। যারা মা, মাটি মানুষের সরকার গড়বে বলে ডাক দিয়ে ২০১১ সালে সরকার গড়েছিল তারা ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছে যে তাদের একমাত্র লক্ষ্য যেকোনও উপায়ে ক্ষমতায় টিকে থাকা। তাতে যদি চাকরির অভাবে রাজ্যের যুবক-যুবতীদের নিজেদের জীবন দিয়ে দিতে হয় তো হোক… তিনি গদি আঁকড়ে পড়ে থাকবেন।
যেমনটা আমি আগে বলেছি, পশ্চিমবঙ্গে বেকার সমস্যা নতুন কিছু নয়। কিন্তু তৃণমূলের আমলে যে পরিমাণ বেকার এরাজ্যে বেড়েছে তা গোটা দেশে নজিরবিহীন। শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের কাজের সন্ধানে ভিন রাজ্যে পাড়ি দেওয়ার উদাহরণ তো ছিলই। কিন্তু গত কয়েক বছরে উপার্জনের তাগিদে পরিযায়ী শ্রমিকদের পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে চলে যাওয়ার সংখ্যাটাও উদ্বেগজনক জায়গায় পৌঁছে গেছে। করোনা মহামারীর কঠিন সময়ে অসংখ্য পরিযায়ী ভাইবোনেরা বাড়ি ফিরে এসেছে কিন্তু স্থানীয়ভাবে কোনও কাজের সন্ধান না পেয়ে তারা আবার ভিন রাজ্যে ফিরে যেতে শুরু করেছে। শুধু তাই না, কেন্দ্রীয় সরকার পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা করার পরেও তৃণমূল সরকার তাদের নামের লিস্ট জমা দিতে পারে নি। যার জন্য রাজ্যের লক্ষ লক্ষ শ্রমিক ভাইরা কেন্দ্রীয় সরকারের সাহায্য থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। সঠিক কর্মসংস্থানের অভাবে প্রতি বছর হাজার হাজার ছেলেমেয়েরা তাদের বুড়ো বাপ-মাকে বাড়িতে একা রেখে রোজগারের তাগিদে অন্যরাজ্যে চলে যেতে বাধ্য হয়।

আরও পড়ুন:থামছেই না সংক্রমণ, ২৪ ঘন্টায় দেশে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল ৬১ হাজার ৮৭১

বেকারত্ব একদিনে তৈরি হয় না কিন্তু তা দূরীকরণে যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব থাকে তাহলে এই সমস্যা কোনদিনও মিটবে না। কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যাগে ২০১৫ থেকে ২০১৯, এই চার বছরে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পে প্রায় ৬ লক্ষ পেশাদার ব্যক্তি যুক্ত হয়েছেন যার মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ কর্মসংস্থান হয়েছে। পরিবহণ শিল্পে বিরাট পরিবর্তন এসেছে। করোনা মহামারীর সময়েও গাড়ি বিক্রি থেমে থাকেনি। প্রধানমন্ত্রী মুদ্রা যোজনাতে চার কোটিরও বেশি মানুষ লোনের জন্য আবেদন করেছেন। এছাড়া স্ট্যান্ড আপ ইন্ডিয়া, আত্মনির্ভর ভারত, মেক ইন ইন্ডিয়ার মতো প্রকল্পের মাধ্যমে বহুসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে অসংখ্য মানুষ কৃষিভিত্তিক জীবিকা নির্বাহ করে। তাই ক্ষমতায় এলে আমরা কৃষিকার্যে পরিকাঠামোগত পরিবর্তন, মিশ্র কৃষির প্রচলন ও ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে রাজ্যে বেকার সমস্যা মেটাবো। শুধু তাই না, কারিগরি ও পেশাদারি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে যুবক-যুবতীদের কর্মোপযোগী করে তুলব যাতে তাদের ভিন রাজ্যে যেতে না হয়। সার্ভিস সেক্টরে, পরিবহণ, ব্যাঙ্ক এবং টেলিকম্যুনিকেশনসের সম্প্রসারণ ঘটিয়ে প্রচুর চাকরি তৈরি করা হবে। শুধু তাই না, গ্রামীণ শিল্প, কুটির এবং হস্ত শিল্পের সম্প্রসারণ করে বেকারত্ব কমানোর উদ্যাগ নেওয়া হবে।

বাংলার মাটি অনেক সম্ভবনার মাটি তাই আমাদের সবাইকে একত্রিত হয়ে বেকারত্বের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। যদিও এই লড়াই খুব কঠিন লড়াই কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে সব করা সম্ভব। আমাদের দলের রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রশ্নাতীত তাই বিজেপিই একমাত্র দল যারা পশ্চিমবঙ্গে বেকারদের মুখে হাসি ফোটাতে পারে। আমরা বিশ্বাস করি, আগামী বিধানসভা নির্বাচনে নিজেদের স্বাধীন মত প্রকাশের মাধ্যমে তৃণমূলকে চিরবিদায় জানিয়ে বিজেপিকে আপনারা সেই সুযোগ করে দেবেন।

(লেখক বিষ্ণুপুর লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ এবং যুব বিজেপির রাজ্য সভাপতি)

(মতামত নিজস্ব)

Related Articles

Back to top button
Close