fbpx
পশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

পঞ্চায়েত সদস্যের শিশুপুত্রকে অপহরণ করে খুনের ঘটনায় ধৃতদের বাড়িতে তীব্র জনরোষ

 তিন ধৃতেকে ১০ দিন পুলিশি হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ আদালতের

প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়, বর্ধমান:  সাত লক্ষ টাকা দিলে তবেই ফেরৎ পওয়া যাবে ছেলেকে। আর এই বিষয়ে পুলিশকে কিছু জানালে ছেলেকে প্রাণে মেরে দেওয়া হবে। পূর্ব বর্ধমানের গলসির সাঁকো গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্যের শিশু পুত্রকে অপহরণ করার পর ফোন করে এই ভাবেই হুঁশিয়ারি দিয়ে মুক্তিপণ দাবি করেছিল অপহরণকারীরা। সেই হুমকি অগ্রাহ্য করে শিশুপুত্রের বাবা গলসি থানার দ্বারস্থ হওয়ায় বাস্তবেই অপহরণকারীদের হাতে প্রাণ খোয়াতে হল শিশুপুত্রকে।

শুক্রবার সকালে বাড়ির অদূরে ডিভিসি সেচ খাল থেকে হাত পা বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার হল ৯ বছর বয়সী শিশুপুত্র সন্দীপ দলুই-এর নিথর দেহ। শিশু পুত্রকে অপহরণ ও খুনের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ তিনজনকে  শুক্রবার গ্রেপ্তার করেছে । ধৃতরা হল সুব্রত মাঝি ওরফে বাদশা, নিরঞ্জন বাগ ও মঙ্গলদীপ দলুই । তিন যুবকেরই বাড়ি গলসির সাঁকো গ্রামে । সুনির্দিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করে পুলিশ এদিন তিন ধৃতকেই পেশ করে বর্ধমান আদালতে ।এই অপহরণ ও খুনের ঘটনার সবিস্তার তথ্য  উদ্ধার ও ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ যুক্ত আছে নাকি তা জানার জন্য তদন্তকারী অফিসার তিন ধৃতকেই ১০ দিন পুলিশী হেপাজতে নিতে চেয়ে আদালতে আবেদন জানান ।

বিচারক তদন্তকারী অফিসারের আবেদন মঞ্জুর করেছেন। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে টাকা না পেয়েই অভিযুক্তরা এই খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে। এদিকে এই খুনের ঘটনা জানাজানি হতেই এদিন সকাল থেকে তিন ধৃতের বাড়িতে জনরোষ আছড়ে পড়ে। যা নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে হিমসিম খেতে হয়। উত্তেজনা থাকায় সাঁকো এলাকায় মোতায়েন রাখা হয়েছে বিশাল পুলিশ বাহিনী। জারি রয়েছে পুলিশ টহল ।

 

 

 

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বুধবার সাঁকো গ্রামে মনসা পুজো ছিল। ওইদিন বিকালে পঞ্চায়েত সদস্য বুদ্ধদেব দলুই-এর ৯ বছর বয়সী শিশুপুত্র সন্দীপ পাড়ার মনসা মন্দিরে যায়। মা সান্ত্বনা দলুই বলেন, তাঁর ছেলে সন্দীপ স্থানীয় বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে। ছেলে মনসা মন্দিরে যাবার পর থেকেই তিনি ছেলের আর কোনও খোঁজ পান না। সন্ধ্যার পর থেকে গোটা পাড়ার সবাই মিলে সন্দীপের খোঁজা চালায় । কিন্তু কোথাও সন্দীপের খোঁজ মেলে না । সান্ত্বনাদেবী বলেন, তারই মধ্যে বুধবার রাতে তাঁর স্বামী বুদ্ধদেববাবুর মোবাইলে ফোন করে এক অপহরণকারী মুক্তিপণ দাবি করে।

 

এই প্রসঙ্গে বুদ্ধদেববাবু বলেন, তাঁকে ফোন করে অপহরণকারী প্রথমে ৭ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ চায় । পরে দ্বিতীয়বার ফোনকরে  তাঁর কাছে ৩ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। একই সঙ্গে ফোনে হুমকি দিয়ে তাঁকে জানানো হয় , ‘মুক্তিপনের ব্যাপারে পুলিশ  কিংবা প্রতিবেশীদের কাউকে কিছু জানালে ওরা আমার ছেলেকে প্রাণে মেরে দেবে ।’ সন্দীপ দলুই এদিন বলেন, ছেলেকে ফিরে পাবার জন্য সেই হুমকি অগ্রাহ্য তিনি বৃহস্পতিবার সবিস্তার অভিযোগ গলসি থানায় জানান।

 

 

 

শিশু পুত্রের বাবার অভিযোগ পাবার পরেই নড়ে চড়ে বসেছে গলসি থানার পুলিশ। তদন্ত নেমে পুলিশ হুমকি ফোন কলের টাওয়ার লোকেশন ধরে তদন্ত চালিয়ে রাতেই পাঁচ জনকে আটক করে । তাদের জিজ্ঞাসাবাকরে  পুলিশ নিশ্চিৎ হয় শিশু পুত্রকে অপহরণের ঘটনায় সুব্রত মাঝি , নিরঞ্জন বাগ ও মঙ্গলদীপ দলুই নামে তিন যুবক জড়িত রয়েছে ।পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে । পুলিশের দাবি জেরায়  ধৃতরা কবুল করেছে  ধরা পড়ার ভয়ে তারা শিশু পুত্রকে প্রাণে মেরে দিয়ে রাতে  ডিভিসি খালের জলে ফেলে দিয়েছে । এরপর রাত থেকে ডিভিসি খালের জলে শিশুর খোঁজ শুরু হয় । এদিন সকালে ওই খালের জল থেকেই হাত ও  পা বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার হয় শিশুপুত্র সন্দীপের নিথর দেহ । ময়নাতদন্তের জন্য এদিনই মৃতদেহটি পাঠানো হয় বর্ধমান হাসপাতাল পুলিশ মর্গে ।

 

 

সাঁকো পঞ্চায়েত সদস্য বুদ্ধদেব দলুই এদিন বলেন, পুলিশের কাছ থেকে তিনি জানতে পেরেছেন বুধবার তাঁর ছেলে সন্দীপকে বাদশা-ই মনসাতলা থেকে মোটর বাইকে চাপিয়ে নিয়ে পালায় । এই কাজে তাকে  সাহায্য করে মঙ্গলদ্বীপ ও নিরঞ্জন । অসিম খাঁ নামে এক ব্যক্তির নামে তোলা সিমকার্ড বাদশার কাছে থাকতো। বাদশা নিজের মোবাইলে সেই সিম কার্ড ভরে তাঁর স্ত্রীর ফোনে ফোন করে মোটা টাকা  মুক্তিপণ দাবিকরে । বুদ্ধদেব বাবু বলেন, তিনি ৭ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ দিতে পারবেন না বলে জানানোর পর বাদশাই  তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিল ‘ধান বিক্রি করার টাকা তাহলে কোথায় গেল। এছাড়াও পুলিশ কিংবা প্রতিবেশীদের কাউকে কিছু জানালে ছেলে সন্দীপকে প্রাণে মেরে দেওয়া হবে বলেও সে হুমকি দিয়েছিল।’ পুলিশ এই ঘটনার তদন্তে নামতেই অপহরণকারীরা রাতে জীবন্ত অবস্থায় সন্দীপের হাত পা বেঁধে তাকে খালের জেলে ফেলে দেয় । নিহত শিশুর মা সান্ত্বনা দলুই বলেন,  ঠান্ডা পানীয়র সঙ্গে নেশাদ্রব্য মিশিয়ে খাইয়ে তাঁর ছেলেকে বেহুঁশ করে দেয়  অপহরণকারীরা ।এরপর তারাই সন্দীপের হাত পা বেঁধে রাতের অন্ধকারে ডিভিসি খালের জলে ফেলে দিয়ে গা ঢাকা দেয় । ছেলেকে নৃশংস ভাবে খুনের ঘটনায় জড়িতদের ফাঁসির দাবি করেছেন সান্ত্বনাদেবী ।

 

 

জেলার পুলিশ সুপার ভাস্কর মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ঘটনায় জড়িত তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে । তাদের ১০ দিন পুলিশী হেপাজতে নেওয়া হয়েছে। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি গোটা ঘটনার পুনর্নির্মাণ করা হবে। এদিকে সাঁকো গ্রাম পঞ্চায়েতের তৃণমূল সদস্যের ছেলেকে অপহরণ ও খুনের ঘটনা নিয়ে গলসিতে শাসক ও বিরোধীদের রাজনৈতিক তর্জা তুঙ্গে উঠেছে । গলসি ২ ব্লক তৃণমূলের প্রাক্তন সভাপতি তথা পঞ্চায়েত সমিতির বর্তমান সভাপতি বাসুদেব চৌধুরী অভিযোগ করেছেন,  ধৃতরা গত লোকসভা নির্বাচনে এলাকায় বিজেপির হয়ে প্রচার চালিয়েছে । তিনজনই সক্রীয় বিজেপি কর্মী হিসাবে এলাকায় পরিচিত। বাসুদেব বাবু দাবি করেছেন ,বুদ্ধদেব দলুই এলাকায় তৃণমূলের জনপ্রিয় সদস্য। তাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতেই ওই বিজেপি কর্মীরা পরিকল্পিত ভাবেই বুদ্ধদেবের ছেলেকে খুন করেছে।”

 

যদিও বিজেপির সদর জেলা সাধারণ সম্পাদক জয়দীপ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “অভিযোগ সত্য নয়। ধৃতর তাদের দলের কেউ নয়। পাল্টা অভিযোগ এনে জয়দীপবাবু বলেন,  কাটমানির টাকার ভাগ চেয়ে না পেয়ে  তৃণমূলের বুদ্ধদেব বিরোধী গোষ্ঠিয় লোকেরাই এই অপহরণের ঘটনা ঘটিয়ে। আসল সত্য ঢাকতে তৃণমূল নেতা বাসুদেব চৌধুরী এখন ঘটনার দায় বিজেপির ঘাড়ে চাপাতে চাইছে। পুলিশ সঠিক তদন্ত করলেই সব সত্য সামনে চলে আসবে।”

Related Articles

Back to top button
Close