fbpx
অন্যান্যকলকাতাহেডলাইন

কুমোরটুলির ছবি…..

মনীষা ভট্টাচার্য: অন্যবার এই সময় কুমোরটুলি গেলে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। প্রথমত উত্তর কলকাতার সরু গলি তাতে আবার রাস্তার দুধারে সারি সারি ঠাকুর। সঙ্গে অবশ্যই ক্যামেরা হাতে মানুষজনের ভিড়। এবার সেই অর্থে ফাঁকা রাস্তা, গুটি কয়েক ক্যামেরা পর্যবেক্ষক। শিল্পীদের নিপুণ ছোঁয়ায় তৈরি হচ্ছে দুর্গাপ্রতিমা। তবে তার সংখ্যা যা তাতে স্টুডিওর বাইরে রাখতে হচ্ছে না। চেনা গলি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ছে শুধু টিকে থাকার লড়াই।

‘এবার ব্যবসা নয় দিদি , শুধু বেঁচে থাকা ও বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা। আমপানে যা ক্ষতি হয়েছে তা চিন্তার বাইরে। মায়ের সাজ এবার কী হবে তা মা-ই জানেন।’- মনের দুঃখ, কষ্ট এভাবে বেরিয়ে এলেও মাথা নীচু করে কাজে ব্যস্ত সকল শিল্পীই।

‘এ বছর বাজার খুব খারাপ দিদি। একে করোনা, তাতে আমফান। সঙ্গে বিজ্ঞাপনের অবস্থাও খুব খারাপ – সব মিলিয়ে বাজেট কমে গেছে, ফলত ঠাকুরও ছোট হয়ে গেছে। ২/৩ লাখের ঠাকুর এবার ৫০,০০০ – ৭০,০০০ এসে দাঁড়িয়েছে। সরকার থেকে প্রতিমার সাইজ ছোট করতে কিছু বলে নি, টাকার অভাবেই কর্তৃপক্ষরা ছোট প্রতিমা অর্ডার দিচ্ছেন।’

কথা হল কুমোরটুলি মৃৎশিল্প সাংস্কৃতিক সমিতির সম্পাদক বাবু পালের সঙ্গে। তিনি জানালেন, এ বছর কোনও চাঁদা পাওয়া যাবে না। হবে না কোনও সুভিনিয়র। আট থেকে সাড়ে আট ফুটের বেশি বড়ও হবে না এবারের প্রতিমা। বাড়িরপুজোর ঠাকুরও সাড়ে তিন ফুট থেকে ৪ ফুটের বেশি হবে না। অনেকেই ঘটে পুজো করার পরামর্শ দিলেও কুমোরপাড়া তা চাইছে না, মায়ের মূর্তিপুজোই হোক। মূর্তি তৈরির জন্য যা দরকার তা আনার জন্য বেশি খরচা হচ্ছে, কারণ ট্রেন চলছে না। ফলত গত বছর পর্যন্ত যেসব (দড়ি, খড় ইত্যাদি) জিনিসের দাম ৮০/১৭০/টাকা ছিল সেই জিনিসের দামই এবার ১১৫/ ২৮০টাকা। এবছর আমাদের লস করেই পুজো করতে হবে। প্রতি বছর প্রায় ৩২০০ লেবার নিয়ে কাজ হয়, এবার সেখানে ১১০০ লেবার। স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাজ চলছে সব স্টুডিওতেই।

বাবু পালের কথায় দুর্গাপুজোয় যারা মন খুলে আড়ম্বর করতে পারবেন না, তারা কালীপুজোয় এগিয়ে আসবেন কারণ করোনার ভয়টা অনেকটা কেটে যাবে। তাছাড়া কালীপুজো একদিনের। গত বছরেও প্রায় ৫০টির মতো ঠাকুরের বায়না হয়েছিল। এবার এখনও পর্যন্ত ৩০টি ঠাকুরের অর্ডার হয়েছে। তবে পুজোর ১০দিন আগেও ঠাকুরের অর্ডার হলে প্রতিমা তারা বানিয়ে দিতে পারবেন এ বিশ্বাস তাঁর আছে। ১৫ অগাস্টের পর থেকে মোটামুটি পুজোর বায়না শুরু হয়েছে।

থিমের ঠাকুরের চাহিদা এবার কম। আর যে প্রতিমা বিদেশ পাড়ি দেয় সেসব আগেই চলে গেছে। এ বছর প্রায় ৫৮টা ঠাকুরের অর্ডার ছিল, কিন্তু ২৩ টা মতো ঠাকুর তৈরি করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, বাকিগুলো বাতিল হয়েছে। বাবু পালের সঙ্গে কথা বলে বেরিয়ে দেখলাম আকাশের রং লালচে হয়েছে। ছোট ছোট ঠাকুরে কুমোরটুলি ভরে ঊঠছে। কোথাও চলছে খড়বাধার পালা। কোথাও আবার একমেটে সেরে দুমেটে। স্টুডিওর সামনে পড়ে রয়েছে খড় মেশানো মাটির স্তুপ। সাজের শিল্পীরা মনোনিবেশ করেছেন সূক্ষ নিপুণ কাজে। বাতাসময় একটা পুজো পুজো গন্ধ।

হঠাৎই চোখ গেল প্লাস্টার অফ প্যারিসের রবীন্দ্রমূর্তিতে। বাঁশে বাঁধা বেড়ার ফাঁক দিয়ে তিনি যেন তদারকি করছেন মাটির শিল্পীদের। অজান্তেই ক্যামেরায় ঊঠে এল সেই ফ্রেম। ফ্ল্যাশের ঝলকে শক্তিবাবু বললেন, ‘অবনী বাড়ি আছো?’

পরাঙ্মুখ সবুজ নালী ঘাস আজ পিচের নীচে আর দূরে গঙ্গায় তখন জোয়ারের জলে ভাসমান নৌকো জানান দেয় জীবন বহমান।

Related Articles

Back to top button
Close