fbpx
গুরুত্বপূর্ণপশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির স্মৃতিচারণায় রাজনৈতিক মহল

নিজস্ব সংবাদদাতা কলকাতা: ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম চাণক্য তথা এনসাইক্লোপিডিয়া ও বিচক্ষণ মানব দরদী নেতা ছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। তাঁর মৃত্যুতে শোক বিহুবল গোটা রাজনৈতিক মহল। দিল্লি থেকে বাংলা শোকাহত সবাই। দিল্লির লোধা ঘাট শ্মশানে মঙ্গলবার তাঁর শেষ কৃত্য সম্পন্ন হয়। কিন্তু এখনও রাজনৈতিক মহলের স্মৃতি চারণায় তাঁর সঙ্গে কাটানো প্রতিটা মুহুর্ত টাটকা। স্মৃতি চারণায় এদিন অল ইন্ডিয়া লিগাল এড ফোরামের সাধারণ সম্পাদক তথা সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী জয়দীপ মুখোপাধ্যায় থেকে তৃণমূল বিধায়ক মানস ভুঁইয়া ও রাজ্যের পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম সর্বস্ব উজার করে দিলেন।

জয়দীপ এক সক্ষাতকারে বলেন, প্রণব মুখোপাধ্যায় মহাশয়কে চিনেছিলাম আমার মাতামহ স্বাধীনতা সংগ্রামী প্রয়াত ও সনৎ কুমার সরকার মহাশয়ের সান্নিধ্যে এসে ‌। আমার মাতামহ সনৎ কুমার সরকার একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং জাতীয় কংগ্রেসের একনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে দীর্ঘদিন যাবৎ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। ছেলেবেলা থেকেই দাদুর মুখের প্রণববাবুর ভূয়সী প্রশংসা শুনেছিলাম। ছাত্রাবস্থায় দাদুর সৌজন্যেই প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে প্রথমবার পরিচয় হয়েছিল। তার পরবর্তীকালে সেই যোগাযোগ নিরবিচ্ছিন্ন ছিল তাঁর সম্প্রতি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগে পর্যন্ত। ছাত্র রাজনীতির আঙিনা থেকে বহু সময় বহু বিষয়ে প্রণববাবুর কাছে বহু সুপরামর্শ এবং অভিভাবকত্ব পেয়েছি। সব সময় তিনি শিক্ষা দিয়েছেন সুনির্দিষ্টভাবে যে কাজের দায়িত্ব পাওয়া যায় সে কাজের দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করার।
১৯৮৫ সালের পরে তিনি যখন কংগ্রেস ছেড়ে রাষ্ট্রীয় সমাজবাদী কংগ্রেস দল গঠন করেছিলেন, তখন পশ্চিমবঙ্গের প্রণব মুখোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ বেশ কিছু মানুষ তাঁর সদ্য গঠিত দলে যোগদান করেছিলেন। সেই সময় প্রণববাবু হুগলি জেলার বিভিন্ন প্রান্তে দলীয় বৈঠক ও প্রকাশ্যে জনসভা করতে এসেছিলেন। সেই সময় একজন ছাত্র আন্দোলনের কর্মী হিসেবে তাঁর সভা সমিতিতে উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। নব্বইয়ের দশকে যখন তিনি কংগ্রেসের ফিরে এলেন, পরবর্তীকালে আমরাও তখন জাতীয় কংগ্রেসের কর্মী হিসেবে প্রণববাবুর নেতৃত্বে এবং আদর্শে কংগ্রেসের কর্মী হিসেবে কাজ করেছিলাম। আজ মনে পড়ছে, ১৯৯৬ সালে লোকসভা নির্বাচনে তৎকালীন বাম আন্দোলনের অন্যতম নেতা হুগলি জেলার কমিউনিস্ট আন্দোলনের পুরোধা ‌ তথা প্রাক্তন সাংসদ মনোরঞ্জন হাজরাকে কংগ্রেসে যোগদান করাতে আমি একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলাম। মনোরঞ্জন বাবু আপাদমস্তক বামপন্থী এবং সৎ মানুষ ছিলেন। ১৯৯৬ সালে রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী তথা তৎকালীন কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ব্রিগেডের জনসভা থেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাওয়ের উপস্থিতিতে মনোরঞ্জন হাজরা কংগ্রেসে যোগদান করেন। আমি মনোরঞ্জনবাবুর দীর্ঘসময় ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলাম, তাঁকে নিয়ে প্রণববাবুর দিল্লির তালকোটরা বাসভবনে দীর্ঘদিন বহু গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নিয়েছিলাম। আজ বলতে দ্বিধা নেই, সেই সময় প্রণববাবু ও মমতাদির সুপারিশেই মনোরঞ্জনবাবুকে ১৯৯৬ সালে আরামবাগ লোকসভা জাতীয় কংগ্রেসের প্রার্থী করা হয়েছিল। সেই সময় প্রণব মুখোপাধ্যায় আমাকে তাঁর নির্বাচন পরিচালনা করার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন।সেই সময় আমি আরামবাগ লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস প্রার্থী মনোরঞ্জন হাজরার চিফ ইলেকশন এজেন্টের দায়িত্ব পালন করেছিলাম।
পরে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল গঠিত হওয়ার পর আমরা কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলের পতাকা তলে চলে আসি। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রণববাবুর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সখ্যতা এবং যোগাযোগ সবসময় বজায় থেকেছে। আমি আইনব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হলে দিল্লিতে তাঁর বাসভবনে আশীর্বাদ নিতে গিয়েও বিমুখ হতে হয়নি।

প্রণব মুখোপাধ্যায়ের উদারতা ও অভিভাবক সুলভ উচ্চতা আমার কাছে ছিল বটবৃক্ষের মতো। আমার এই লেখনীতে, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার উল্লেখ করতে চাই। যা উল্লেখ না করলে নিজেকে সারাজীবন অপরাধী বলে মনে হবে। কারণ, অভিভাবক প্রণববাবুর এই উপকারগুলো, জীবনে কখনও ভোলা যাবে না। ২০০৪ সালে প্রথম ইউপিএ সরকার গঠিত হবার পরে পরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা সবাইকে নাড়া দিয়েছিল।
২০০৪ সালে বাংলায় সেই সংকটময় পরিস্থিতিতে সিপিএমের গুন্ডা বাহিনী ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমার প্রাণ সংশয়ের অবস্থা। পরে জেনেছিলাম, বিশেষ কয়েকজন পুলিশ আধিকারিককে আমার জন্য নিয়োগ করা হয়েছিল রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে। আমাকে হেনস্তা করার অভিপ্রায় নিয়ে তাদের নিয়োগ করা হলেও সেই সংকটময় পরিস্থিতিতে আমি আমার অভিভাবক প্রণববাবুকে বিষয়টি বিস্তারিত জানিয়ে ছিলাম। ‌সেই সময় প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের দায়িত্ব তাঁর হাতে, সত্যিই এতোটুকু ব্যস্ততা না দেখিয়ে আমাকে বলেছিলেন, “তোকে কিছু চিন্তা করতে হবে না আমি যা করার করব।” তাঁর ছোট কথায় আশ্বস্ত হয়ে ছিলাম। লক্ষ্য করে দেখেছিলাম ষড়যন্ত্রকারীরা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। ‌

আমি প্রণববাবুর সেই উপকার কখনও ভুলব না। তাঁর কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ। এরপর ২০০৫ সালে জঙ্গিপুর থেকে ফেরার পথে তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় এক পথ দুর্ঘটনার শিকার হন। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান তিনি। কিন্তু গুরুতর আহত হয়েছিলেন। তাঁর এই দুর্ঘটনার ব্যাপার নিয়ে দিল্লির রাজনীতির অন্দরমহলে অনেক কিছু শোনা যায়। কিন্তু সেই সমস্ত বিষয় আমি কখনও কোথাও প্রকাশ করিনি, আগামী দিনেও করব না।

২০০৪ সালে অবিভক্ত কংগ্রেসের নেতা অতুল্য ঘোষের জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপিত হয়। ‌আমি নিজ উদ্যোগে কলকাতার গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের অনুপ্রেরণায় অতুল্য ঘোষের শতবার্ষিকীর অনুষ্ঠান উদযাপন করেছিলাম। সেই অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে রাজ্য কংগ্রেসের তাবড় তাবড় নেতা নেত্রীদের সামনে প্রণববাবু আমাকে যেভাবে প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়ে উৎসাহী করেছিলেন কোনও ভাষা দিয়ে ব্যক্ত করা সম্ভব নয়। সেই সম্মান আমি কোনওদিনও ভুলতে পারব না। এর পরবর্তী সময় প্রণববাবু ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম নক্ষত্র হিসেবে দেশের ত্রয়োদশ রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পরেও তাঁর সঙ্গে নিয়মিত ব্যক্তিগত স্তরে যোগাযোগ ছিল। সেই সময় মহামহিম রাষ্ট্রপতির কাছে গিয়েছি কাছের মানুষের মতোই। রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অবসর নেওয়ার পরেও নিয়মিত তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ থেকেছে। প্রণব মুখোপাধ্যায় দৃঢ়চেতা মনোভাব অনেকাংশেই আমাদের দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল।
ব্যক্তিগত স্তরে নেতাজি অন্তর্ধান রহস্য সংক্রান্ত বিষয়ে আমার মতামত প্রণববাবুর থেকে ভিন্ন ছিল। আমার মতামতকে কোনওদিনও ছোট করার চেষ্টা করেননি। শুধুমাত্র বলতেন, “ভালো করে বিষয়টি মনোনীবেশ করে দেখো।” তাই তাঁর এই মহাপ্রয়াণে আরও একবার নতুন করে অভিভাবক হারানোর যন্ত্রণা অনুভব করছি। সবশেষে বলতে পারি, প্রণববাবু আক্ষরিক অর্থে একজন আন্তর্জাতিক মানের নেতা। আগামী ১০০ বছরেও প্রণববাবুর মত কোনও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন রাষ্ট্রনেতা জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে হয়তো আর আসবে না। তাঁর প্রয়াণকালে শ্রদ্ধা ও প্রণাম নিবেদন করছি।

অন্যদিকে একসময়ের কংগ্রেস সঙ্গী প্রণব মুখোপাধ্যায় প্রসঙ্গে অনুজ মানস ভুঁইয়া বলেন, একসময় কংগ্রেসী রাজনীতির অন্যতম স্তম্ভ মানসবাবু পিতৃতুল্য প্রণব মুখোপাধ্যায় কে সশ্রদ্ধ প্রণাম। তাঁর মৃত্যুতে ভরত বর্ষের রাজনীতিতে প্রভূত ক্ষতি হল। যা অপুরনিয়। ভারতবর্ষকে রক্ষা করার মানুষ চলে গেলেন। তিনি একজন প্রকৃত রাষ্ট্র নায়ক ছিলেন।

এদিন পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম এক সক্ষাতকারে বলেন, ‘বাংলা তথা ভারতের রাজনীতিতে নক্ষত্র পতন হল। আমরা যারা ছোট বেলা থেকে কংগ্রেস করতাম তার মধ্যে আমি একজন। ছোট বেলা থেকেই আমার সঙ্গে প্রণব দার একটা যোগযোগ ছিল। প্রণব দার সাউদর্ন এভিনিউ এর বাড়িতে প্রায়শই যেতাম দেখা করতে। একবার আমার মনে আছে আমাদের প্রথম সরকারের সময়ে মিন্টের একটা অনুস্ঠাণে আমার সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল। তখন তিনি ভারতের অর্থ মন্ত্রী ছিলেন। সে সময়ে বাংলার অর্থ মন্ত্রী ছিলেন অমিত মিত্র। হঠাৎ করে উনি আমাকে জিজ্ঞাসা করেন ববি তোর ভালো নামটা কি? আমি বলেছিলাম আমার নাম। এছাড়াও রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন একাধিক বার তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছিল। কারন যখন ই তিনি কলকাতায় আসতেন আমি তাঁকে অভ্যর্থ্না জানাতে আসতাম। তিনি সর্বদা আমার সঙ্গে অভিভাবকের মত আচরণ করতেন। প্রনবদা গাঁধীবাদ ও সুভাষবাদ এবং ধর্ম নিরপেক্ষতায বিশ্বাস করতেন। সেই শিক্ষা ছোট বেলা থেকেই আমাদের মধ্যে আছে। সেটা নিয়ে ই এগিয়ে যাব। সেটাই হবে তাঁকে শ্রদ্ধা জানান।’

Related Articles

Back to top button
Close