fbpx
অন্যান্যকলকাতাপশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

নিবেদিতার ভাবনায় শক্তি আরাধনা

শক্তিপ্রসাদ মিশ্র: ভগিনী নিবেদিতা জন্মসূত্রে ভারতীয় নন। আইরিশ খ্রীষ্টান ধর্মযাজকের সন্তান। আজন্ম ইশামসির প্রতি তাঁর অনুরাগ। নিয়মিত চার্চে যান। ঈশ্বরকে পিতা রূপে আরাধনা করেন। সেমেটিক ধর্মে ঈশ্বরের পিতৃত্ব অনুমোদিত। ‘মা’ বলে ডাকা যায় না। নিবেদিতার ক্ষেত্রেও চিরাগত সংস্কার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অথচ গুরুর আশীর্বাদ:‘স্বয়ং জগদম্বা তোমার দেহে-মনে আবিষ্ট হন।’ স্বামী বিবেকানন্দ বললেন, ‘মা হলেন ইউনিভার্সাল পাওয়ার বিহাইন্ড অল।’ পরবর্তীকালে আমরা দেখি নিবেদিতা মাতৃময় হয়েছেন। কোথাও যেতে গেলে বা কাজ শুরু করার আগে ‘দুর্গা দুর্গা’ বলতেন। ‘গিরি গৌরী আমার এসেছিল’– গানটি শুনে চোখের জল ফেলতেন। প্রায় এক বছর নিজেকে মায়ের ইচ্ছেয় সঁপে দেওয়ার সাধনা করেছেন নিবেদিতা। অবশেষে তিনি অনুভব করেছেন ‘মা’ সব সময় তাঁর হাত ধরে আছেন।

নিবেদিতার মাতৃভাবে তন্ময়তার জন্ম কাশ্মীরে। ১৮৯৮, জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে স্বামীজি অমরনাথে। সঙ্গে ভগিনী নিবেদিতা সহ আরও কয়েকজন। অমরনাথে স্বামীজি চৈতন্যময় শিবকে প্রত্যক্ষ করেছেন। শিবভাবে ভরপুর। মুখে কেবলই শিবপ্রসঙ্গ। এরপরই হঠাৎই কোনও এক দুর্জ্ঞেয় কারণে স্বামীজির শিবভাব মাতৃভাব-তন্ময়তায় পরিণত হয়। মুখে মাতৃসংগীত। অনুভব করছেন মা-ই সব। এমনকী দুঃখ যন্ত্রনাও ‘মা’। মা-ই যন্ত্রণা দিচ্ছেন। মা-ই যন্ত্রণা পাচ্ছেন। মা-ই স্বয়ং যন্ত্রণা। এই উপলব্ধির সময় ২৮ সেপ্টেম্বর স্বামীজি লিখলেন সেই বিখ্যাত কবিতা ‘কালি দ্য মাদার’। ৩০ সেপ্টেম্বর রওনা দিলেন ক্ষীরভবানীর উদ্দেশে। একাকী। ফিরলেন সাতদিনের মাথায়। এক সন্ধ্যায়। শরীর-মন-প্রাণ মাতৃভাবে ভরপুর। স্বামীজির চোখে-মুখে অপার্থিব দ্যুতি। হাতে হলুদ গাঁদা। মা-কে নিবেদন করা ফুল তিনি নিবেদিতার মাথায় স্পর্শ করলেন। আশীর্বাদ করলেন। প্রশান্ত গম্ভীর পরিবেশ। কিছু পরে স্বামীজি অস্ফুটস্বরে বললেন, ‘নো মোর হরি ওম। ইট ইজ অল মাদার নাও। অল মাই প্যাট্রিওটিজম ইজ গন। নাও ইট ইজ ওনলি মাদার, মাদার।’ কাশ্মীরে ক্ষীরভবানীর অলৌকিক দর্শনের পর স্বামীজির এই ভাবান্তর। মায়ের ভাবে পূর্ণ তিনি। সেই ভাব সংক্রমিত হয়েছিল নিবেদিতার মধ্যে। সেই ভাব ক্রমশ তাঁর মনকে আলোড়িত করে।

১০/২ বোসপাড়া লেনের বাড়িতে ১৮৯৮ সালে হ্যারিংটন তুলেছিলেন শ্রীশ্রীমা সারদা ও তাঁর আদরের খুকি নিবেদিতার এই ছবি।

তবে নিবেদিতা কর্মবিযুক্ত সন্ন্যাসী নন। সর্বত্যাগী ব্রহ্মচারিণী। যথার্থ নিষ্কামকর্মী। কর্মের যথার্থ রূপায়ণে শক্তির উপাসনা একান্ত কাম্য। নানা কর্মের মধ্যে যে শক্তির বিকিরণ তাই বস্তুত মাতৃশক্তি। জগতে ও মানুষের জীবনে এই শক্তির প্রবাহ অবিরাম। নিজের জন্যই হোক বা পরের জন্য শক্তি তাঁর চাই-ই। কর্মযোগী মহাশক্তিকে স্বীকার করে তাঁর হাতের যন্ত্র হয়ে কাজ করেন। নিবেদিতা তাঁর সাধনায় উপলব্ধি করেছিলেন, এই দৃশ্যমান জগৎ জগজ্জননীর শক্তির প্রকাশ। তাঁর দৃষ্টিতে ভারতবর্ষ কোনও জড় পদার্থ নয়। ভারত সম্বন্ধে তিনি কখনই ‘ইট’ শব্দের প্রয়োগ করতেন না। সব সময়ই করেছেন ‘হার’। বস্তুত নিবেদিতার ভারত উপাসনা আধ্যাত্মিক সাধনার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সেই সাধনায় জগন্মাতার সঙ্গে ভারতমাতা এক হয়ে গিয়েছিল।

স্বামীজি চলে গেলেন ১৯০২, ৪ জুলাই। শক্তিযোগে দীক্ষিত নিবেদিতা এক অশান্ত উত্তেজনায় ভুগছেন। স্বামীজির দেওয়া দায়িত্ব পালনে শোকাতুর রমনীর ক্রন্দন শোভা পায় না। স্বামীজি চেয়েছিলেন নিবেদিতা মায়ের হাতের প্রহরণ হোক। স্বামীজির পতাকা নিয়ে নিবেদিতা ঝাঁপ দিলেন কর্মসমুদ্রে। ভারতের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে অগ্নিগর্ভ বক্তৃতায় মাতৃ আরাধনায় ব্রতী হলেন শক্তি উপাসিকা। অক্টোবর মাসে এলেন নাগপুরে। নাগপুর তখন শারদীয়া উৎসবে মুখর। নিবেদিতা আমন্ত্রিত হলেন নাগপুরের মরিস কলেজে। পুরস্কার বিতরিণী সভার সভানেত্রী। গিয়ে দেখলেন সফল ক্রিকেটারদের পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান। সভানেত্রীর ভাষণে নিবেদিতা সমবেত ছাত্রদের ধমক দিলেন। দিনটি ছিল বিজয়া দশমী বা দশেরার আগের দিন। সমবেত শ্রোতাদের নিবেদিতা স্মরণ করিয়ে দিলেন, এখন দেবী দুর্গার আরাধনার সময়। তাঁর ভাষায়, ‘দুর্গাপূজা ইজ মিলিটারি ইন ক্যারেক্টার।’ দেবী দুর্গা শক্তির মূর্ত বিগ্রহ। সেই শক্তির প্রকাশ চাই। দেবীকে আরাধনার অর্থ শৌর্য বীর্যের উপাসনা। নাগপুর সহ ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে নবমী ও দশমীর দিন অস্ত্র পুজোর  ও কৌশল দেখানো হয়। ভোঁসলে রাজাদের রাজধানীতে এসে তিনি তা দেখতে পেলেন না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন।

স্বামীজির সঙ্গে ১৮৯৮ সালে কাশ্মীরে নিবেদিতা, ওলি বুল ও জোসেফিন ম্যাকলাউড।

নিবেদিতা বিস্মিত – তারা কীভাবে দেবী দুর্গাকে ভুলে গেলেন – ভুলে গেলেন তাঁর খড়্গকে – তাঁর শক্তির বাণীকে! স্বদেশী ঐতিহ্যকে অবহেলা করে বিদেশী খেলা নিয়ে মাতামাতি তিনি যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। নিবেদিতা বললেন, তিনি বিজয়া দশমীর দিন তরবারি খেলা, মল্লযুদ্ধ ইত্যাদি সামরিক কার্যকলাপ দেখতে চান। কলেজ কর্তৃপক্ষ পরদিন কোনও কোনও ছাত্র এবং বহিরাগত কয়েকজনকে এনে কোনও মতে মুখরক্ষা করে।নিবেদিতা বুঝলেন যে যারা আখড়ায় গিয়ে তরবারি চালানো, লাঠিখেলা, মুগুরভাঁজা ইত্যাদি শারীরিক কৌশল অভ্যাস করে, কলেজের অধ্যাপকও ছাত্ররা তাদের অবজ্ঞা করে। নিবেদিতা তাঁর বজ্রবাণীতে যা বললেন তা কেবলমাত্র সেই সময়ের ছাত্রদেরই নয়, বর্তমান প্রজন্মকেও শিক্ষা দিয়েছেন: ‘আমরা এখন বেশি রকম উচ্চশিক্ষা পাচ্ছি, অতিরিক্ত পরিমাণে গ্র্যাজুয়েট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরুচ্ছে, যারা একেবারে ভগ্নদেহ, বিপদেরকালে আত্মরক্ষা করতে পারে না, নিজেদের মা বোনের মর্যাদা রাখতে পারে না। এইসব ধ্বংসপুঞ্জ দিয়ে সমাজের কোনও উপকারণেই। দেশ চায় দেহ-মনে বলিষ্ঠ দেশ প্রেমিকদের।’

প্রসঙ্গত নিবেদিতা পরবর্তীকালে পাটনাতে সমবেত ছাত্রদের উদ্দেশে বক্তৃতায় প্রায় একই কথা বলেন, ‘বালকদের মুখে অপরিমেয় শান্তি দেখলে আমি দুঃখিত হব। …আমি চাই তোমরা নিজেদের মধ্যে মল্ল যুদ্ধ করো, বক্সিং করো, তরবারি খেলো। শান্তশিষ্ট গোবেচারা লোক চাই না – চাই শক্তিধর মানুষ।’ শুধু দৈহিক ভাবে বলশালী হওয়াই যথেষ্ট নয়, নিবেদিতা চাইতেন যুবকরা বীর হবে, তারা লড়াই করবে, অথচ তাতে নীচতা বাতিক্ততা যেন না থাকে। যখন সংগ্রামের ডাক আসবে, যেন তারা সাড়া দেয়, ঘুমিয়ে না থাকে। যাইহোক, নিবেদিতা নাগপুরের পর গেলেন ওয়ার্ধা, অমরাবতী, সুরাট এবং অবশেষে বরোদায়। বরোদায় তিনি ২৩ অক্টোবর শক্তি পুজোর উপর এক মনোজ্ঞ ভাষণ দেন এবং বিপ্লবী ঋষি অরবিন্দর সঙ্গে নানা বিষয়ে আলোচনা করেন। ১৯০৫ সালে নিবেদিতা ‘দ্য স্টেসম্যান’ পত্রিকায় দুর্গাপুজোর উপর এক মনোজ্ঞ প্রবন্ধ লেখেন। প্রবন্ধটি নিবেদিতার ইংরেজি রচনাবলীর দ্বিতীয়খণ্ডে প্রকাশিত। এখানে সেই প্রবন্ধের অংশবিশেষ উল্লেখ করলাম।

১৯০২-‘০৫ সাল,নিবেদিতা যুক্ত হলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে। তৎকালীন আঁকা এই ছবিটি তাঁর এক ছাত্রীর। ছবিতে অসুররূপী ব্রিটিশ অফিসর।

‘অষ্টমী তিথি বীরাষ্টমীতে অসি পূজাও অসিঅর্ঘ্য দেওয়া হয়। বাংলাদেশে অবশ্য সামাজিক সামরিকও ধর্মীয় উপাদানগুলি মিশে যুক্তিগ্রাহ্য উপায়ে কালী-দুর্গা জগদ্ধাত্রীরূপে মাতৃমূর্তির বিশিষ্ট ধারণার উদ্ভব হয়েছে। দুর্গা ঐশ্বরিক শক্তি, সৃষ্টি ও সংহার করেন, পরাজিত হয়ে আবার জয়ী হন, তিনি নৈর্বেক্তিক এবং ব্যক্তিগত বাসনার উর্দ্ধে। কালী তামসী জননী, ধ্বংসদায়িনী, ত্যাগের গ্রহিতা, মৃত্যু তাঁর আশীর্বাদ। সব শেষে জগদ্ধাত্রী, ঈশ্বরের হৃদয়ের কোমলতা স্বরূপ, সতী নারীতে তাঁর বাস, বিশ্বের সব জননীর উদ্ভব তাঁর থেকে। বাংলাতে মায়ের মূর্তি যখন কিছুদিনের জন্য সন্তানদের ছেড়ে যায়, যখন ন’দিনের পুজোও দান শেষ হয়, তখন পবিত্র দশম দিনটি পালিত হয় মানবিক বন্ধন নতুন করে গড়ে তোলার কাজে; পারিবারিক মিলনের উৎসব বিজয়ার অভিনন্দন সারা দেশে ব্যাপ্ত হয়। প্রত্যেক বছর সব আত্মীয়তার বন্ধন কি দৈবী অতিথির চরণতলে পবিত্র ও পুনর্জীবিত হয় না? মায়ের সামনে সারা দেশ কি ঐক্যবদ্ধ হয় না?’


শিল্পী নন্দলাল বসুর আঁকা এই ছবিটি নিবেদিতা তাঁর স্কুল সাজাতে ব্যবহার করেছিলেন।

দুর্গাপুজোর নানা রীতি, মন্ত্র ও প্রথাগুলির অন্তর্নিহিত অর্থ ও যুক্তি বর্তমান প্রজন্মের অজানা। নিবেদিতা সেগুলির তাৎপর্যও গুরুত্ব অনুভব করে প্রবন্ধটিতে প্রকাশ করেছেন। দুর্গাপুজোর উদ্দেশ্য শক্তিসাধনা এবং নিজের সুপ্ত শক্তিকে জাগানো। চারপাতারও কিছু বড় প্রবন্ধটি বাঙালি তথা ভারতীয়র অবশ্য পাঠ্য।

 

(লেখক পরিচিতি – অধ্যাপক শক্তিপ্রসাদ মিশ্র, জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত ইংরেজি ভাষা সাহিত্যের শিক্ষকবর্তমানে ‘নিবেদিতা অধ্যাপক’, রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অব কালচার, গোলপার্ক, কলকাতা।)

Related Articles

Back to top button
Close