fbpx
পশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

লাটে উঠেছে ল্যাংচার দেশ, করোনায় ফেঁসে রসনায় লালবাতি

ভাস্করব্রত পতি, তমলুক : আজ আর দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে যানবাহন চলছে না। লোকজন দাঁড়িয়ে দু-দণ্ড বিশ্রামটুকুও নেওয়ার সুযোগ কারোরই নেই। ফলে মাছি তাড়াচ্ছে শক্তিগড়ের ঐতিহ্যশালী ল্যাংচা দোকানগুলো। ‘ল্যাংচার দেশ’ নামে সবাই মানে।  প্রায় সব দোকানেরই ঝাঁপ বন্ধ। কর্মীরা ঘরমুখো কবেই। রাস্তার দুপাশে রকমারি নামের ল্যাংচা দোকানগুলো এখন খাঁ খাঁ করছে ২৪ ঘন্টা।

যাঁরা ল্যাংচা ভালোবাসেন, তাঁদের  ল্যাংচার জন্য যেতেই হবে বর্ধমানের শক্তিগড়ে। ল্যাংচার আঁতুড়ঘর। অসংখ্য দোকান। নানারকম নাম সেইসব দোকানগুলোর। নাম দেখলেই জিভে জল। তখন ” জীব সেবাই শিব সেবা ” বদলে গিয়ে হয়ে ওঠে ” জিভ সেবা “! তবে একটু সচেতন না হয়ে সেবাকর্মে ডুবলেই ভেসে ওঠা মুশকিল! বসেই থাকতে হবে বাথরুমে!  আসলে তখন ঠকতে হয় ভুলভাল স্বাদ আর লো-ক্যাটাগরির রসানাময় ল্যাংচাতে! সেই ল্যাংচার স্বাদ আজ মানুষ ভুলেই গিয়েছে কোভিড ১৯ এর আক্রমনে।

ল্যাংচা নিলয়, ল্যাংচা ভবন, ল্যাংচা কুঠি, ল্যাংচা ঘর,  ল্যাংচা নিকেতন,  ল্যাংচা বাজার, ল্যাংচা হোম,
ল্যাংচা স্টল, ল্যাংচা দেশ, ল্যাংচা প্যালেশ, ল্যাংচা ধাম, ল্যাংচা সাগর, ল্যাংচা ভাণ্ডার, ল্যাংচা বাড়ি — এমনিই আরও কত নাম! কে কে আসেননি এখানে? সিনেমার অভিনেতা অভিনেত্রী, রাজনীতিবিদ, বিজ্ঞানী, খেলোয়াড় থেকে যাত্রাশিল্পীদের পদচারণা ঘটেছে এখানে। এখন সেইসব স্মৃতি সযতনে রক্ষিত এইসব দোকানগুলিতে। এগুলিই এখন ল্যাংচা বিক্রির প্রোমোটিং সাবজেক্ট! কিন্তু ল্যাংচা ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত। খদ্দের নেই। ব্যবসাও নেই।

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই শক্তিগড়ে ল্যাংচা শিল্পের উন্নয়নে গঠন করেছে ” ল্যাংচা হাব “। আর যাঁরা যাঁরা এই দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে যাতায়াত করেন, এখানে এলেই ক্ষনিকের বিশ্রামের তুলনায় একপিস ল্যাংচা উদরীকরণ সহ পরিবারের বাকিদের জন্য নিয়ে যেতে ভোলেননা। কিন্তু আজ তাঁদের দেখা নেই, গত একমাস জুড়ে।

কিন্তু কিভাবে এলো এই “ল্যাংচা” ?? এই নামকরনের পিছনের কাহিনীটা কি ?? তবে একটু ঢুঁ মেরেই দেখি বরং। একটা সুন্দর কাহিনী লুকিয়ে আছে ল্যাংচার নামকরণের পেছনে। দারুন চমকপ্রদ সেই তথ্য এবং ঘটনা !

বহুদিন আগের ঘটনা। নদিয়ার বিখ্যাত রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পরিবারের এক কন্যার বিয়ে হয়েছিল বর্ধমান রাজার এক রাজপুত্রের সাথে। একদিন মেয়েটি সন্তানসম্ভবা হয়।  তখন তাঁর সব খাবারেই চরম অনীহা। কিছুই মুখে রুচছেনা। কিছুই খেতে ইচ্ছে করছে না। সবাই ব্যতিবস্ত। শাশুড়ি রানিমা নানান সুখাদ্য নিয়ে মুখে গুঁজে দেন। কিন্তু পুত্রবধূ কিছুতেই সেসব মুখে তুলতে রাজি নয়। একদিন শাশুড়ি বৌমাকে জিজ্ঞেস করলেন যে তাঁর এখন কী খেতে ইচ্ছে করছে। সন্তানসম্ভবা বধূটি চোখ নামিয়ে লজ্জিত মুখে বলল, ‘ল্যাংচা’!

‘ল্যাংচা’! সে আবার কী! চমকে উঠলেন তিনি। চিন্তায় পড়লেন রানিমা !  জানতে চাইলেন, সেটা আবার কেমন খাবার? সেই বধূ তখন লজ্জায় মুষড়ে পড়লো। কিছুতেই আর বলতে চায় না এই বিষয়ে। পরেরদিন সেই বধূ তাঁর স্বামীকে জানায় যে এই  ‘ল্যাংচা’ কোন খাবারের নামই নয়। তবে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রাসাদে সে একটা  খুব সুন্দর মিষ্টি খেয়েছিল একবার। সেই মিষ্টিটার নাম তাঁর মনে নেই। তবে যে সেই মিষ্টি তৈরি করেছিলো তাঁর একটা পা খোঁড়া। তাঁর তৈরি ঘিয়ে ভাজা ঐ একটি বিশেষ মিষ্টিই খাওয়ার সাধ জেগেছে এখন। সন্তানসম্ভবা মায়ের কোনো লোভ অপূর্ণ রাখতে নেই। তাই ছেলের কাছে এই তথ্য জেনে মহারাজকে সেকথা জানালেন রানিমা।

আদুরে পুত্রবধূর ইচ্ছে বলে কথা! ফেলে দেওয়া তো যায়না! বর্ধমানের রাজার নির্দেশে তক্ষুনি এক বিশ্বস্ত কর্মচারীকে নদীয়া পাঠানো হোলো। রাজার জরুরি পত্র নিয়ে ছুটলেন রাজ কর্মচারী। অবশেষে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের অনুমতিতে সেখানকার সেই খোঁড়া ময়রাকে বর্ধমানে নিয়ে আসা হল মিস্টি বানানোর জন্য।

সেদিন বর্ধমানের মহারাজ ঐ খোঁড়া ময়রাকে বর্ধমানের বড়শুল গ্রামে  ভূসম্পত্তি দান করলেন। ঘর করে দিলেন। তাঁর দোকান হল আগেকার বাদশাহী সড়কের উপর শক্তিগড় গ্রামে। প্রতিদিন তাঁর ভিয়েন থেকে একমণ করে সেই সুস্বাদু মিষ্টি সরবরাহ হত বর্ধমান রাজপ্রাসাদে। খোঁড়া ল্যাংড়া ময়রার সেই মিষ্টি ‘ল্যাংচা’ নামে পরিচিতি পেল। আজ বড়শুলের কাছে দু নম্বর জাতীয় সড়কের দু ধারে ল্যাংচার দোকানের রমরমা। ল্যাংচার এই বিকশিত হওয়ার পিছনে বর্ধমান রাজ পরিবারের অবদান অনস্বীকার্য।

স্বাভাবিকভাবেই এ ঘটনা আমাদের বেশিরভাগ ল্যাংচাপ্রেমীদের কাছেই সম্পূর্ণ অজানা। আজ যেখানে ল্যাংচা দোকানগুলো রয়েছে আগে কিন্তু এখানে এসব ছিলোনা। ২০০২ নাগাদ বাইপাস রাস্তা তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তখন বড়শূল ১ ও ২ গ্রাম পঞ্চায়েতের উদ্যোগে বিরোধিতা করা হয়। পাশাপাশি গড়ে ওঠে ‘শক্তিগড় বাজার বাঁচাও কমিটি’। ২০০২ এর ১৩ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক মন্ত্রক শক্তিগড় বাজারকে বাঁচিয়ে তিন কিলোমিটার দূর দিয়ে স্থানীয় ৬ টি মৌজার কৃষি জমিকে অধিগ্রহণ করে রাস্তা তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফাইল নম্বর – NHA/11014/3A/2002/PN.PL/TECH/GM9CKII ।সেই মোতাবেক পার্শ্ববর্তী আমড়া, বড়শূল, পশ্চিম মেমারি, শেখপুর, শক্তিগড় এবং কুমারপুর মৌজা দিয়ে বাইপাস তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই বাইপাসের ধারেই এখন সার সার ল্যাংচা দোকান। যেগুলো আগে ছিলো শক্তিগড় বাজারে।

এই বাইপাসের ধারে রয়েছে ‘আদি ল্যাংচা প্যালেস’। দোকানের মালিক সাদিক খান জানান, ‘এখন কোনো উপায় নেই আমাদের। একসময় প্রতিদিন গড়ে কুড়ি হাজার টাকার ল্যাংচা বিক্রি করতাম। এখন উপার্জনহীন। কর্মচারীদের ছেড়ে দিয়েছি। লক ডাউন উঠলে তখন নাহয় ভাবা যাবে।’ এরকম হাল এখানকার প্রায় ৬০ টি ল্যাংচা দোকানেই। ব্যবসা লাটে। শুধু ছড়ায় টিকে আছে ল্যাংচার লালসা – ” জিলিপি সামোসা খেয়ে / যতই মুখ ভ্যাংচা! / বাঁকা মুখ সোজা হবে / খাও যদি ল্যাংচা !! “

Related Articles

Back to top button
Close