fbpx
বিনোদনহেডলাইন

নায়ক থেকে পার্শ্বচরিত্রে উজ্জ্বল রাধামোহন ভট্টাচার্য

অরিজিৎ মৈত্র: ‘সূঁচের মত ছোট্ট যন্ত্র দিয়ে দারিদ্রর মত দৈত্যের সঙ্গে লড়াই করা যায় না’। এটি ‘উদয়ের পথে’ ছবির বিখ্যাত সংলাপ। ‘পথের পাঁচালী’-র অনেক আগে বাংলা চলচ্চিত্রের মোড় ঘোরানো ছবি ‘উদয়ের পথে’ মুক্তি পেয়েছিল ১৯৪৪ সালে। আর রাতারাতি খ্যাতির শিখরে পৌঁছে গিয়েছিল ‘অনুপ’, মানে সেই ছবির নায়ক। অনুপের চরিত্রে কাজ করেছিলেন রাধামোহন ভট্টাচার্য। সেই ছবিতে তাঁর পোশাক, তাঁর কথা বলার ধরন, সবই অনুকরণ করতে শুরু করেন তৎকালীন বাঙালি যুবকেরা। ছবিতে অভিনয় করে অভূতপূর্ব খ্যাতি পাওয়ার পরে জ্যোতির্ময় রায়, রাধামোহনকে এক পত্রে লিখেছিলেন, ‘আপনি আমার পরিকল্পিত চরিত্রে প্রাণ সঞ্চার করেছেন, আপনার অভিনয় শুধু নৈপুণ্যে উজ্জ্বল নয়, প্রতিভার স্পর্শে গভীর।’

ক্ষুধিত পাষাণ ছবিতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে

অভিনয়ের পাশাপাশি রাধামোহন ভট্টাচার্য ছিলেন লেখক। এককালে দীর্ঘদিন একটি ইংরেজি দৈনিক পত্রিকায় ভারতীয় ছবির সমালোচনা লিখতেন। ছিলেন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের গভর্নিং বডির এবং একজিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্য। বহু বছর ধরে তিনি এই পদে ছিলেন। রবীন্দ্রভারতীর পি. এইচ. ডি-র গবেষণা পত্রের পরীক্ষকও ছিলেন তিনি। শুধুমাত্র একটি বিশেষ ইংরেজি দৈনিকে নয়, অন্যান্য বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকাতেও নিয়মিত লিখতেন। বেশিরভাগই প্রবন্ধ।

উদয়ের পথে ছবির বুকলেট

রাধামোহন ভট্টাচার্য অভিনীত প্রথম ছবি ‘অপরাধ’। এই ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৪২ সালে। সেই ছবিতে রাধামোহন অভিনয় করেন একটি খলনায়কের চরিত্রে। হিন্দি ছবি ‘তামান্না’-তে অভিনয় করতে তিনি মুম্বইতেও গিয়েছিলেন। কিন্তু ছবিটি সেরকম জনপ্রিয়তা লাভ করেনি। শুরু করেছিলাম ‘উদয়ের পথে’ ছবির সংলাপ দিয়ে। সেই বিশেষ ছবিটি সম্পর্কে আরও দু-একটি তথ্য দেব। নিউ থিয়েটার্সের কর্ণধার বীরেন্দ্রনাথ সরকার তাঁর নিজের প্রযোজনায় মুক্তি পাওয়া অন্যান্য ছবির সঙ্গে ‘উদয়ের পথে’-র ছবিরও হিন্দি ভার্সান তৈরি করেছিলেন। সেই ছবির নাম ছিল ‘হামরাহি’। নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন বিনতা রায়। ১৯৪৭ সালে মুক্তি পেয়েছিল রাধামোহন অভিনীত ‘অভিযাত্রী’। এই ছবিতেও তাঁর বিপরীতে নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন বিনতা রায়। যতদিন যেতে লাগল, ততই দর্শকদের কাছে প্রিয় হয়ে উঠতে লাগলেন তিনি।

আরও পড়ুন:বিশ্বের সেরা যুদ্ধবিমান হিসেবে প্রমাণিত রাফাল শ্রেষ্ঠ ফাইটার পাইলটদের হাতে এল: ধোনি

একে একে চলচ্চিত্র নির্মাতারা তাঁকে ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব দিতে লাগলেন। রাধামোহন ভট্টাচার্য অভিনয় করলেন, ‘স্বর্ণসীতা’, ‘মানদণ্ড’, ‘শঙ্খবাণী’, ‘রাণী ভবানী’, ‘দর্পচূর্ণ’, ‘আঁধি’, ‘কাবুলিওয়ালা’, ‘ক্ষণিকের অতিথি’, ‘ক্ষুধিত পাষাণ’, ‘কান্না’, ‘ন্যায়দণ্ড’, ‘নিশীথে’, ‘আকালের সন্ধানে’ ইত্যাদি ছবিতে। ‘ক্ষুধিত পাষাণ’-এর করিম খাঁকে আজও কেউ ভুলতে পারেনি। ‘কাল কি হাকিকত আজ এক আফসানা বনকার রহে গয়া’। তাঁর মুখের উর্দু সংলাপ শুনে অবাক হয়েছিলেন দর্শকেরা। জানা যায় যে করিম খাঁর মুখের উর্দু সংলাপ বলার জন্য তিনি কলকাতার পার্ক সার্কাসের এক মৌলবীর কাছে প্রায় ছ মাস ধরে যাতায়াত করেছিলেন নিয়মিত। বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরে যাঁর জন্ম, তিনি চোস্ত উর্দুতে আগাগোড়া সংলাপ বলে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন।

কাবুলিওয়ালা ছবিতে ছবি বিশ্বাসের সঙ্গে

বাংলা ও হিন্দি মিশ্রিত সংলাপ বলেছিলেন, ‘ঝিন্দের বন্দি’ ছবিতে। ‘ন্যায়দণ্ড’-তে তাঁর অভিনয় শৈলীকে এক অন্য গোত্রে অনায়াসেই ফেলা যায়। এই ছবিতে তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন কানন দেবী। চলচ্চিত্র জগৎ ছাড়াও আরও নানা বিষয়েও তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল। প্রতিভাবান এই মানুষটি খুব ভালো কীর্তণও গাইতে পারতেন। তাঁর গাওয়া কীর্তণের রেকর্ডটিও এক সময় বাজারে পাওয়া যেত। ‘মা জাগো জাগো’ গানটি তাঁর গলায় এক সময় ভীষণই জনপ্রিয় হয়েছিল। পেয়েছেন বেঙ্গল জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার। করিম খাঁ চরিত্রে অভিনয় করার জন্য তৎকালীন উপ-রাষ্ট্রপতি ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণাণের কাছ থেকে স্বারক পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৬০ সালে গিরিশ থিয়েটারে অভিনীত ‘ডাউন ট্রেন’ নাটকে অভিনয়ের কারণে রাধামোহন ভট্টাচার্য শ্রেষ্ঠ মঞ্চাভিনেতার পুরস্কারও পেয়েছেন।

আরও পড়ুন:রিয়া চক্রবর্তীর গ্রেফতারের পর সুশান্তের মৃত্যু নিয়ে মুখ খুললেন অঙ্কিতা

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অকৃতদার। বাংলা ছায়াছবির ইতিহাসের পাতা উলটোলে রাধামোহন ভট্টাচার্যের কাজের বিশ্লেষণ করা অবশ্য পালনীয় কর্তব্য বলেই মনে হয়। তাঁর কথা না বললে বাংলা ছবির ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সুযোগ হারাবে এক অসাধারণ মানুষ এবং অভিনেতার কথা জানার।

Related Articles

Back to top button
Close