fbpx
পশ্চিমবঙ্গব্লগহেডলাইন

বাড়িয়ে দাও তোমার হাত, আর একটু মানবিক হোক আমরা বাংলা

শংকর দত্ত, কলকাতা: কলকাতা শহর মানেই বাঙালির শহর। কলকাতা মানেই বিশ্ব-সংস্কৃতির অন্যতম রাজধানী। কলকাতা মানেই উৎসব, উদ্দীপনা অনেক কর্ম-ব্যস্ততার মধ্যেও একটু উষ্ণ অভ্যর্থনা। কলকাতা মানেই শোভাবাজার, হাতিবাগান কিংবা হেদুয়ার রকে বসে আড্ডা। ঝাঁ চকচকে দক্ষিণের ঝলমলে শপিং মল। ভালোবাসার নন্দন, ভিক্টোরিয়া কিংবা কবিতার উৎসবের কবিতা-নাটক গানের উৎসবে মেতে যাওয়া রবীন্দ্র সদন চত্বর। তবে সব কিছুই বাঙালিপনা ভরপুর থাকলেও রাজধানী এখন আর শুধুই বাঙালির নয়। গত কয়েকদশকে কলকাতা হয়ে উঠেছে আম-আদমির। এ এক মিশ্র-সংস্কৃতির পীঠস্থান।

আরও পড়ুন: এবার দ্বিতীয় ভ্যাকসিনের ট্রায়ালে সাফল্য পেয়েছে বলে দাবী করল রাশিয়া

তাই একজন মারওয়ারি কিংবা গুজরাটের সহ নাগরিক যখন যেখানে স্বপরিবারে দুর্গাপুজোয় মেতে ওঠেন আমরাও দেওয়ালি কিংবা ধনতরসে গা ভাসাই মনের আনন্দে। আজকের দিনে মহারাষ্ট্রে বা দেশের অন্য প্রান্তে যেমন গণপতি বাপ্পা মোরিয়াকে নিয়ে উৎসবে মাতেন ভিন রাজ্যের বাদিন্দারা, আমরা বাঙালিরাও ব্যস্ত থাকি তাঁর সাস্বত আরাধনায়। গঙ্গারঘাটে ছট পুজোয় যেমন ঈশ্বরের কাছে নিবেদন ও উৎসর্গ করি আমরা অন্যের মঙ্গল কামনায়,  তেমনিভাবেই মেতে উঠি পবিত্র ইদ বা রমজানে। মোটমাট বাংলার এই ভিন্ন মিলন-উৎসব আর সংস্কৃতিতে আমরা সকলেই আজীবন জারিত। আমরাই পারি বাংলাকে এই বিপদ-সংকুল মহামারীর মুহূর্তে রক্ষা করতে। আমরাই জানি দুঃখ ভুলে নতুন করে জীবনকে খুশির রোশনাই -এ ভাসাতে।

কিন্তু এত ভালোবাসার বন্ধনের মধ্যেও কোথাও যেন ছন্দপতন ঘটছে কিছুদিন যাবৎ। বিশেষত এই অতিমারীর সময়ে মানুষের জাগ্রত বিবেক প্রমাণ দিচ্ছে মানুষ আর মানুষ নেই। বহু ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে মানুষ বড় ভীতু, স্বার্থপর। শুধু মাত্র নিজেকে ও নিজের পরিজনকে বাঁচাতেই আমরা মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছি,  আমারই সহ-নাগরিকদের থেকে। এই বিষম করোনা প্রকোপ থেকে আমাদের সবাইকে নিজেদের বাঁচাতে হবে এটা অবশ্যই। তবে একই সঙ্গে থাকতে হবে আগের মতোই অনেক টা মানবিক। আমরা নিজেদের বাঁচাবো কিন্তু তার সঙ্গেই হাত বাড়িয়ে দেব আমার প্রতিবেশীর জন্য। পাশের বাড়ির যে ভদ্রলোক, যে ভদ্রমহিলা বা যাঁর সন্তান আজ কোভিড আক্রান্ত তাঁদের প্রতিও থাকুক নিরন্তর সমবেদনা। যেমন আগে সাধারণ একটা অসুখ হলে, কারোর গলব্লাডার অপারেশন হলে আমরা খোঁজ নিতাম বা কারো ক্যানসার ধরা পড়লে আমরা তাঁর শারীরিক সুস্থতার খবর নিতাম ঠিক সেভাবেই কেউ কোভিড আক্রান্ত হলেও আমরা খোঁজ নেব। হ্যাঁ, হয়তো সংক্রমণের কারণে আমরা নিয়ম মেনে তাঁর কাছে যাব না।

আরও পড়ুন:পূর্ব বর্ধমানে কোভিড হাসপাতালে চিকিৎসাধীনদের ডেঙ্গি পরীক্ষাও করা হবে

হয়তো তাঁর হাত ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে সহানুভূতি বা আবেগ জানাতে পারব না এই মুহূর্তে। কিন্তু এইটুকু তো পারিই প্রতিদিন ফোনে তাঁর একটা খোঁজ নিতে। রোজ তাঁর পরিবার পরিজনকে উৎসাহ দিতে, সাহস জোগাতে। এটুকু তো পারিই তাঁর প্রয়োজন অনুযায়ী তাঁর ওষুধের যোগান টুকু দিতে,এটুকু তো করতেই পারি তাঁর পরিবারে একটু রান্না খাবার কিংবা বাজার পৌঁছে দিতে। সবার অবস্থা সবসময় ঠিক থাকে না। আর্থিক অবস্থাও সবার সমান থাকে না। তার বাইরেও আমরা না হয় একটা লকডাউনে ইলিশ মাছটুকু খেলাম না। না হয় এখনকার রবিবারগুলোই ব্যাগ ভর্তি বাজার না করে একটু কমই করলাম। বা দুই ব্যাগ বাজারের একটা ব্যাগ আমার কোনও পরিজন আমার কোনও প্রতিবেশীর বাড়ি কোনও ভাবে পৌঁছে দিলাম, যাঁরা সত্যি অভাবে আছেন, যাঁরা প্রকৃতই তাদের একটা করোনা আক্রান্ত সন্তানকে নিয়ে ভাবিত আছেন।

কিন্তু না আমরা তা করছি না। আমরা ভয় পাচ্ছি। প্রতি নিয়তই ভয় পাচ্ছি। আমরা প্রত্যেকে ভাবছি আমরা তো ভালোই আছি। আমরা অনেকেই ভাবছি আমরা তো বাইপাসের হাসপাতাল বাধা আছে। কেউ কেউ এটাও ভাবছেন আমার হাতে নেতা মন্ত্রী আছেন। এক ফোনেই কেল্লা ফতে। আর ঠিক এই কারণেই আমরা এগোচ্ছি না। আমরা ভয় পাচ্ছি। রোজ রোজই ভয় পাচ্ছি। হয়তো অমূলক নয়। হয়তো নিজেকেই রক্ষা করাটা আজ অনেক বেশি জরুরি। তবুও বলব, বাড়ির সামনে রাস্তায় তিনদিন যে মানুষটা অসহায়ভাবে পড়ে পড়ে ধুঁকছে। তবু বলব সুদূর মেদিনীপুর থেকে ৬২ বছরের যে বৃদ্ধ মানুষটি ব্যবসার কাজে এসে হঠাৎ সুগার ফল করে বাসস্ট্যান্ডে মাথা ঘুরে পড়ে গেছেন, তাঁর পাশে দাঁড়াই চলুন। যে একলা বয়স্ক মানুষটিকে তিনদিন বাড়ি বা ফ্ল্যাট থেকে বেরোতে দেখছি না হঠাৎ, আমরা তাঁর একটা খোঁজ নিয়ে দেখি।

আরও পড়ুন: শিবু সোরেনের পরে করোনায় আক্রান্ত ঝাড়খন্ডের কৃষিমন্ত্রী বাদল পাত্রলেখ

কিন্তু না সেটা হচ্ছে কই? আমরা সবাইকেই ভেবে নিচ্ছি করোনা আক্রান্ত। পরিচিত কারোর সামান্য জ্বর হলে, গলা ব্যথা হলে বা মাথা ঝিমঝিম করবার খবর পেলেও তাঁকে গুষ্টির জ্ঞান দিচ্ছি, হাজার খানেক লিঙ্ক পাঠাচ্ছি, স্বাস্থ্য দফতরের ফ্রি কলিং নম্বর দিয়ে। ঘুম থেকে উঠেই অনেক খোঁজ খবর সার্চ করে একশো এক ডাক্তারের ফর্দ পাঠাচ্ছি। আমরা বলছি না তোর কিছুই হয়নি, এটা সাধারণ জ্বর। আমরা সাহস দিয়ে বলছি না আরে ভাই চিন্তা করিস না চারটে প্যারাসিটামল খেয়ে নে। একটু ভিটামিন কিংবা হলুদ-লেবু-গোল মরিজের পাঁচন করে খাস দুইবেলা। আমরা শুধুই ভাবছি এইবার ওর হলো বলে। আমরা কেবলই চিন্তা করছি, আলোচনা করছি, একে-ওকে ডেকে বলছি ওইদিকে আর যাস না। আমরা একজন অসহায় মানুষের জন্য অনেকেই অ্যাম্বুলেন্সে ডেকে দিচ্ছি না। আমরা প্রশাসনের কাছে দৌড়ে গিয়ে খবরটা দিচ্ছি না। আমরা স্বাস্থ্য ভবনে ফোন করে জানাচ্ছি না, প্লিস আপনারা আসুন, মানুষটিকে বাঁচান। হয়তো সবাই নয়। অনেকেই সেটা করছেন। অনেকেই নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অন্যের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। কিন্তু না। তবুও হাত বাড়ানোর মানুষের সংখ্যা ক্রমশ কমে যাচ্ছে।

কিন্তু কেন হবে? এটাই কি এ বাংলার আদি-অকৃত্তিম সংস্কৃতি !  এটাই কী বাংলার মানুষের আসল মুখ? প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যাচ্ছে!

(মতামত নিজস্ব)

 

Related Articles

Back to top button
Close