fbpx
কলকাতাশিক্ষা-কর্মজীবনহেডলাইন

ইউজিসির নিয়ম উলঙ্ঘন করে রাজ্যের কলেজ গুলিতে অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, আন্দোলনে জাওগস

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কেন্দ্র রাজ্য সংঘাত অব্যাহত। প্রতিবারই খুঁটিনাটি যেকোন বিষয় নিয়ে সংঘাত তুঙ্গে। এবার রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় গুলিতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ইউজিসির নিয়মকে মেনে না চলার অভিযোগ তুলল জাওগস।

তাদের মতে শিক্ষক নিয়োগের যোগ্যতা মান কে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়েই চলছে শাসক দল ঘনিষ্ঠ  অযোগ্যদের কলেজ গুলিতে চাকরি দেওয়ার প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় সূচনা গত ১৯ আগস্ট, ২০১৯ তারিখে হাওড়া জেলার এক প্রশাসনিক বৈঠকের মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক ঘোষণার মাধ্যমে।

সেই ঘোষণায় মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যের সমস্ত কলেজ গুলির অস্থায়ী শিক্ষকদের ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত স্থায়ী করার ঘোষণা করেন।  এছাড়া প্রতি বছর ৩ শতাংশ হারে বেতন বৃদ্ধি এবং চাকরি শেষে ৫ লক্ষ টাকা আনুদানের কথাও ঘোষণা করা হয়। সেইমর্মে ২৩ ডিসেম্বর ২০১৯ তারিখে একাটি সরকারি নির্দেশিকা জারি হয়।

উক্ত নির্দেশিকায় আস্থায়ী কলেজ শিক্ষকদের স্টেট এইডেড কলেজ টিচার বা স্যাক্ট হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউ. জি. সি.) নিয়মে এই রকম স্যাক্ট শিক্ষক নিয়োগের কোনো সংস্থান নেই। এই স্যাক্ট শিক্ষকদের সরকার দুটি ভাগে ভাগ করেছে, ক্যাটাগরি – ১, অর্থাৎ যাদের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউ. জি. সি.) নির্দেশিত কলেজ শিক্ষক হবার নূন্যতম যোগ্যতা রয়েছে এবং ক্যাটাগরি – ২, অর্থাৎ যাদের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউ. জি. সি) নির্দেশিত কলেজ শিক্ষক হবার নূন্যতম যোগ্যতামাণ নেই।

নিয়োগ পত্র দেওয়া শুরু হলে দেখা যাচ্ছে যে এদের বেশিরভাগই দ্বিতীয় ক্যাটাগরি অর্থাৎ কলেজ শিক্ষক হবার অযোগ্য। শুধু তাই নয়, ক্যাটাগরি – ২ শিক্ষকরা চাকরি স্থায়ী হওয়ার পরে যদি কখনো বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউ. জি. সি) নির্দেশিত কলেজ শিক্ষক হবার নূন্যতম যোগ্যতা অর্জন করতে পারেন তাহলে  তাদের পরবর্তী কালে ক্যাটাগরি – ১ এ পদন্নতির সুযোগও রয়েছে।

জাওগস’র পক্ষ থেকে বলা হয়, রাজ্যে বাম আমল থেকেই কলেজ সার্ভিস কমিশন বা পিএসসির মাধ্যমে ইউ. জি. সি. নির্ধারিত যোগ্যতা মান সম্পন্ন স্থায়ী শিক্ষক নিয়োগ না করে লাগাম ছাড়া ভাবে তুলনামূলক অযোগ্য পার্টি ক্যাডার দের দীর্ঘ সময় ধরে অস্থায়ী কলেজ শিক্ষক করে রাখা হয়েছে।

এদের অনেকেই নির্দিষ্ট যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও বিগত ১০-১৫ বছরের অধিক চাকরি করে চলেছেন। সেই ধারা বর্তমান সরকারের আমলে বাড়াবাড়ি পর্যায়ে পৌঁছেছে। বর্তমান সরকার আসার পর থেকেই বিভিন্ন কলেজ গুলিতে সরকারের অগোচরেই কলেজ পরিচালন সমিতির তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন বিষয়ে শাসক দল ঘনিষ্ঠ বা শাসক দলের নেতাদের আত্মীয় স্বজন দের কোনো পরীক্ষা না নিয়েই চাকরি দেওয়া শুরু হয়।

চাকরি দেওয়ার ক্ষেত্রে কোথাও নিয়ম অনুসারে চাকরিতে নিয়োগের কোটা বা সংরক্ষণ নিয়ম মান্য করা হয়নি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিয়োগের আগে সর্বসাধারণের অবগতির জন্য কোনো নোটিশ জারি করা হয়নি।

অথচ রাজ্যে বিভিন্ন বিষয়ে কলেজ শিক্ষক হবার যোগ্য প্রার্থীর কোন অভাব নেই। অভিযোগ, স্বজন পোষণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কলেজে কলেজে এই অযোগ্য শিক্ষক উদ্বৃত্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজ্যের উচ্চ শিক্ষা ক্ষেত্রে এই ভয়াবহ দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসংঘের পশ্চিমবঙ্গ শাখা জাতীয়তাবাদী অধ্যাপক ও গবেষক সংঘ (জাওগস) প্রথম থেকেই এর তীব্র বিরোধিতা করে এসেছে। রাজ্যের গবেষক ও যোগ্য কলেজ শিক্ষক প্রার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে জাওগস গত ১৫ জুলাই, ২০২০ তারিখে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডি.পি. সিংহ, কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রী রমেশ নিশাঙ্ক পোখরিয়াল ও শিক্ষা মন্ত্রকের সচিব অমিত খাঁরে কে লিখিত অভিযোগ জানান। এই অভিযোগের ফলশ্রুতিতে গত ৯ অক্টোবর ইউজিসির পূর্বাঞ্চলীয় শাখা রাজ্যে সরকারের উচ্চ শিক্ষা দফতরের কাছে উক্ত অভিযোগের ব্যাখ্যা তলব করে।

দুর্নীতির গুরুত্ব অনুধাবন করে জাতীয়তাবাদী অধ্যাপক ও গবেষক সংঘের (জাওগস) প্রতিনিধিরা আজ সল্টলেকে ইউজিসির পূর্বাঞ্চলীয় শাখার সহ সচিব ড. অজয় কুমার খান্দুরী ও উপ সচিব ড. আমল এম. আন্ধেরে র সাথে দেখা করে নতুন করে অভিযোগ পত্র জমা করেন। জাওগস-র সহ সভাপতি অধ্যাপক সন্দীপ চট্টোপাধ্যায় সংবাদমাধ্যম কে বলেন “স্যাক্ট শুধুমাত্র নিয়োগ দুর্নীতির বিষয় নয়, এর সাথে জড়িত রাজ্যের উচ্চ শিক্ষার ভবিষ্যত। অযোগ্য শিক্ষকরা কলেজ গুলিতে কি উপযুক্ত শিক্ষা দান করতে সক্ষম? নাকি তাঁরা শাসক দলের হয়ে কলেজ গুলি দখলে রাখার জন্য নিয়োজিত হয়েছেন? এইরকম চলতে থাকলে রাজ্যের উচ্চ শিক্ষা চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে। কলেজ গুলি পার্টি ক্যাডার তৈরির কারখানাতে পরিণত হবে, যা ইতিমধ্যেই আমরা দেখেছি এইসব অযোগ্য শিক্ষক দের সি এ এ ও এন আর সি বিরোধী আন্দোলনে শাসক দলের সমর্থনে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে, তবে ইউজিসির থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে পুরো বিষয়টি তদন্ত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

জাওগসের গবেষক শাখার আহ্বায়ক সৌমক পোদ্দার বলেন “রাজ্যে তো সমস্ত বিষয়ে যোগ্য প্রার্থীর কোন অভাব নেই, তবুও সরকার সি এস সি বা পি এস সি কে অবহেলা করে এই ভাবে অস্থায়ী শিক্ষক নিচ্ছে ও তাদের বেআইনী পদ্ধতিতে স্থায়ী করে দিচ্ছে। এরকম চলতে থাকলে আমরা যারা ইউজিসির নির্ধারিত যোগ্যতা মান অর্জন করছি ও গবেষনার সাথে যুক্ত আছি তাদের তো ভবিষ্যত অন্ধকার”।

সহ-আহ্বায়ক সুমন ভৌমিক বলেন “আমাদের মতো দরিদ্র পরিবারের ছেলে মেয়েরা যারা শত বাঁধা অতিক্রম করে নেট সেট পাস করলাম, যারা গৃহশিক্ষকতা করে সামান্য কিছু টাকা উপার্জন করে আধপেটা খেয়ে গবেষণার সাথে যুক্ত আছি সরকার তাদের কথা ভাবলো না। আমাদের এখন যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার স্বপ্ন ছেড়ে একশো দিনের কাজে নাম লেখাতে হবে, নাহয় দিন-মজুরি করে জীবন চালাতে হবে”।

Related Articles

Back to top button
Close