fbpx
ব্লগহেডলাইন

জীবন স্মৃতিতে ফিরে আসেন বারবার, ভাল থেকো ‘একলা তাসের ঘর’

যুগশঙ্খ ডিজিটাল ডেস্কতুমি কি সত্যিই নেই! হতো বা নেই , হতো বা আছো… মৃত্যু শুধু ঋতুপর্ণকে তো নিয়ে যায়নি, নিয়ে গিয়েছে তাঁর মাথার ভিতরে থাকা অজস্র অনন্ত চলচ্চিত্র ভাবনাকে, হাজারো চিত্রনাট্যকে। তিনি ছিলেন ভারতের এলজিবিটি সম্প্রদায়ের এক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। তিনি জানতেন, তাঁর সব চরিত্র কাল্পনিক। সেগুলিকেই বাস্তব রূপ দিতে মরিয়া ছিলেন। তিনি কি জানতেন মৃত্যুর কোন পিছুটান নেই? জীবনের শেষ বছরগুলিতে তিনি রূপান্তরকামী জীবনযাত্রা নিয়ে নানা পরীক্ষানিরীক্ষা করছিলেন। তিনি নিজের সমকামী সত্ত্বাটিকে খোলাখুলিভাবে স্বীকার করে নেন, যা খুব কম মানুষই করে থাকে। ভাগ্যিস মৃত্যুই শিল্পীকে স্বীকৃতি দেয় না কেবল। তাঁর মৃত্যুদিনে সেই শিল্পী বারবার ফিরে আসেন স্মৃতিতে। তাঁর চোখের কাজল, সমকামী তর্জনী, উন্নত বক্ষযুগল, পাগড়ি সব্বাই ভালো আছে। ভালো আছে তাঁকে নিয়ে ব্যস্ত কিছু হালকা রেখা দাড়ি-গোঁফ, কৌতূহল, তসর শাড়ি।

ঋতুপর্ণ-এই নামটির সাথে জড়িয়ে আছে হাজারো আলোচনা-সমালোচনা, তর্ক-বিতর্ক, ভালোবাসা-ঘৃণা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির গল্প। বাংলা সিনেমার জগতে তার পদচারণা ছিল বীরের মতো। পারিবারিক বা মানবজীবনের পারস্পারিক সম্পর্কগুলোর মধ্যকার জটিল মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনকে এতো সহজ করে উপস্থাপন করেছেন তিনি যে, যেকোনো শ্রেণীর দর্শক তাতে মুগ্ধ না হয়ে পারবে না। তিতলি, উনিশে এপ্রিল, দহন, বাড়িওয়ালি, অসুখ, উৎসব, শুভ মহরত, চোখের বালি, রেইনকোট, অন্তরমহল, দোসর, সব চরিত্র কাল্পনিক, আবহমান, আরেকটি প্রেমের গল্প, নৌকাডুবি, চিত্রাঙ্গদা, সানগ্লাস, মেমোরিজ ইন মার্চ, জীবনস্মৃতি, সত্যান্বেষী, খেলা, দ্য লাস্ট লিয়ার তার অনবদ্য সব চলচ্চিত্র। বিশেষ করে আজকে দাঁড়িয়ে যখন দেখি নারী-পুরুষের তর্জা থেকে বাদ পড়েনা শিশুও। এ সত্যি তো কবেই দেখিয়েছিলেন ঋতুপর্ণ। ছক বাঁধা গত ভাঙলেন ঋতুপর্ণ।

১৯৯৪ সালে তার দ্বিতীয় সিনেমা উনিশে এপ্রিল মুক্তি পায়। এই সিনেমাতে এক মা ও তার মেয়ের পারস্পরিক সম্পর্কের কাহিনি দেখানো হয়েছে। সিনেমাটি সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্যিকভাবেও সফল হয়। ১৯৯৫ সালে এই সিনেমা শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পায়। এরপর দহন মুক্তি পায় ১৯৯৭ সালে। ১৯৯৮ সালে এই সিনেমা শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্য বিভাগে জাতীয় পুরস্কার পায় এবং এই সিনেমার দুই অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত ও ইন্দ্রাণী হালদার একসঙ্গে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী বিভাগে জাতীয় পুরস্কার পান। ১৯৯৯ সালে মুক্তি পাওয়া অসুখ সিনেমাতে এক অভিনেত্রী ও তার আয়ের উপর অনিচ্ছুকভাবে নির্ভরশীল বাবার সম্পর্ক দেখানো হয়। এটি শ্রেষ্ঠ বাংলা সিনেমা বিভাগে জাতীয় পুরস্কার পায়। বাড়িওয়ালি মুক্তি পায় ২০০০ সালে। ২০০৪ সালে ঋতুপর্ণের প্রথম হিন্দি সিনেমা রেনকোট মুক্তি পায়। ২০০৫ সালে তার বাংলা সিনেমা অন্তরমহল মুক্তি পায়। ২০০৭ সালে দ্য লাস্ট লিয়ার মুক্তি পায়। ২০০৮ সালে মুক্তি পায় খেলা। এই সিনেমাটি শ্রেষ্ঠ বাংলা চলচ্চিত্র বিভাগে জাতীয় পুরস্কার পায়। ২০০৯ সালে যীশু সেনগুপ্ত, অনন্যা চট্টোপাধ্যায়, দীপংকর দে ও মমতা শঙ্কর অভিনীত সিনেমা আবহমান মুক্তি পায়। এটি শ্রেষ্ঠ পরিচালনা বিভাগে জাতীয় পুরস্কার পায়।

এক সাক্ষাৎকারে ঋতুপর্ণ ১৯ এপ্রিল সিনেমা প্রসঙ্গে, বলেছিলেন, সত্যজিৎ রায়ই আমাকে চলচ্চিত্র নির্মাতা হতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। আমি জানি না আমার সিনেমাগুলো তপন সিনহা কিংবা অজয় করের মতো মনে হয় কিনা। যদি হয়, তাহলে তা একেবারেই কাকতালীয়। তবে হ্যাঁ, আমি অজয় কর বা তরুণ মজুমদারের সিনেমা দেখতে ভালোবাসি। উনিশে এপ্রিল মূলত সত্যজিৎ রায়ের জলসাঘর থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই তৈরি করেছি আমি। দূরদর্শনে দেখছিলাম সিনেমাটি, তখনই মাথায় আসে উনিশে এপ্রিলের আইডিয়া। খেয়াল করে দেখবেন, টেলিভিশনে কোনো সিনেমা দেখার সময় সিনেমাটির প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে যাবে।টেলিভিশনের পর্দায় জলসাঘর দেখাটা আমার জীবনে বেশ উল্লেখযোগ্য একটা পরিবর্তন আনে। অবসরপ্রাপ্ত এক নাচিয়ের গল্প তাৎক্ষণিকভাবে আমার মাথায় খেলে যায়। মেয়ের চরিত্রটি অবশ্য অনেক পরে ভেবেছিলাম, মাকে নিয়ে গল্প সাজাতে গিয়েই মেয়ের আগমন ঘটে এখানে।সত্যি বলতে, আমি তখন জানতামই না কাদম্বরী দেবী ঐদিন আত্মহত্যার চেষ্টা করে দু’দিন পরে মারা যান। আমি ১৯ তারিখটি বেছে নিয়েছিলাম একেবারেই ভিন্ন একটি কারণে। দেখুন, ক্যালেন্ডার এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা পালন করেছে। আমার একটা তারিখের দরকার ছিল, এমন একটা সংখ্যার কথা ভাবছিলাম পরদিন যেটার দুটো অংকই বদলে যাবে, একদম নতুন একটি দিন শুরু হবে। ১৯ তারিখ শেষে আসবে ২০ তারিখ, সংখ্যাটা পুরোপুরি বদলে যাবে। বদলে যাবে চরিত্রগুলোর জীবনও। নতুন দিনের শুরুর সাথেই গল্পের শেষের সংযোগ ঘটাতে চেয়েছিলাম আমি।

অন্তরমহল সিনেমার ব্যাপারে মধ্যবিত্ত বাঙালি শ্রেণী যখন আপত্তি জানালো তখন ঋতুপর্ণ বলেছিলেন, সিনেমার বিষয়বস্তুর সাথে প্রাসঙ্গিক যা কিছু দেখানো হয়েছে তা নিয়ে কখনোই আমার মধ্যে কোনো অনুশোচনা কাজ করেনি। আমি ক্ষমা চেয়েছিলাম দর্শকের সাথে ভুল বোঝাবুঝির জন্য। মানে, সিনেমার কোনো পোস্টারেই এমন ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের ব্যাপারে কোনো ইঙ্গিত দেয়া হয়নি। চারজন প্রধান চরিত্রের ক্লোজ আপই পোস্টারে প্রাধান্য পেয়েছে। প্রায় একই সময়ে নির্মিত বিবর চলচ্চিত্রটির বেলায় সব ধরনের প্রমোশনে ‘অ্যাডাল্ট’ বিষয়বস্তু আছে তা উল্লেখ করে দিয়েছিলাম। আমি অবশ্য চাইনি সিনেমার পোস্টারগুলো উত্তেজক হোক, হতে পারে এটাই একটা ভুল ছিল। মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারগুলো, বিশেষ করে যারা বাচ্চা নিয়ে সিনেমা দেখতে গিয়েছিল, এই ধরনের কোনো দৃশ্য দেখার জন্য তারা মোটেই প্রস্তুত ছিল না।

ঋতুপর্ণ ঘোষ: পিতৃতান্ত্রিক সমাজে বসে একেবারেই উল্টো ধারায় গিয়ে নারীবাদ নিয়ে কাজ করাটা খুব কষ্টকর। আমি তাই সিনেমাগুলোকে ‘উইমেনিস্ট’ বলে ডাকি, ‘ফেমিনিস্ট’ না।রবীন্দ্রনাথ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমি সবসময় অনুভব করেছি যে তার লেখায় প্রতি মুহূর্তে তার ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন ঘটে। আর একটি ডকুমেন্টারিতে রবীন্দ্রনাথকে চিত্রায়িত করা মোটামুটি অসম্ভব একটা কাজ… দশটা ডকুমেন্টারিও বোধহয় কম হয়ে যাবে।আমি সবসময় নতুন ঘরানার সিনেমা তৈরি করতে চাই। তাছাড়া আমি ঠিক তা-ই বানাই, যা আমি নিজে বানাতে চাই। উনিশে এপ্রিল, বাড়িওয়ালি, দোসর, আবহমান এগুলো তো হলো। আমি এবার আরও ভিন্ন রকম কিছু বানাতে চাই। মহাভারত সবসময় আমাকে ভীষণভাবে টানে। বৃহন্নলা অর্জুনের চরিত্রটি নিয়ে কাজ করতে চাই এবার। তার জন্য অবশ্য অনেক মাথা খাটিয়ে গবেষণা করতে হবে, হোমওয়ার্ক করতে হবে। একদিন আমি এই চরিত্রটি নিয়ে সিনেমা বানাবো।

ছায়াছবির পাশাপাশিই বাংলা সাময়িক পত্রিকা সম্পাদনাও করতেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগরক্ষাকারী সাইটগুলোতেও তিনি ছিলেন জনপ্রিয়। মাত্র দুদিন আগে তিনি টুইটারে লিখেছিলেন, “সত্যান্বেষী’র শুটিং শেষ”। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোয়েন্দা চরিত্র ব্যোমকেশ বক্সীকে নিয়ে তৈরী হচ্ছিল তাঁর সর্বশেষ ছবি। সেই ছবি অসমাপ্ত হয়ে থাকার ফলে চিত্রাঙ্গদাই হয়ে রইল তাঁর শেষ ছায়াছবি – যার জন্য বিশেষ জুরি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন জাতীয় চলচিত্র পুরষ্কারে। তিনি নিজে অভিনয়ও করেছিলেন চিত্রাঙ্গদায় – যেখানে ঋতুপর্ণ ঘোষের গলায় একটি সংলাপে ছিল.. “তাহলে আসি, হ্যাঁ?”

 

Related Articles

Back to top button
Close