fbpx
ব্লগহেডলাইন

পরীক্ষায় কম নম্বর পেলে মনোবল বাড়ান, উৎসাহিত করবেন না

আর কে সিনহা: যেমনটা আশঙ্কা করা হয়েছিল, ঠিক তেমনটাই হচ্ছে। সিবিএসই দশম ও দ্বাদশ শ্রেণীর পরীক্ষার ফল প্রকাশ হতেই, অনেক জ্ঞানী মানুষ ময়দানে নেমে পড়েছে। এঁরা সেই সমস্ত জ্ঞানী, যাঁরা প্রতিবারের মতো বেশি নম্বর পাওয়া পরীক্ষার্থীদের উপলব্ধিকে কমিয়ে, তুলনামূলক কম নম্বর পাওয়া পরীক্ষার্থীদের সান্ত্বনা দিচ্ছে।

 

বেশি নম্বর পাওয়া পরীক্ষার্থীদের কঠোর পরিশ্রমে কার্যত জল ঢেলে দিয়ে বলছে, কারও পক্ষে ৯৮ অথবা ৯৯ শতাংশ নম্বর পাওয়া কীভাবে সম্ভব? এই বিষয়টি তাঁরা পুরোপুরি উপেক্ষা করছে যে, এই পরীক্ষাতেই হাজার হাজার পরীক্ষার্থী তো অনুত্তীর্ণ হয়েছে। অনেকে তো ৪০-৫০ শতাংশ নম্বর পেয়েছে। জ্ঞানী মানুষজন এটাও বলছে যে, যাঁরা পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেয়েছে, তাঁদের মধ্যে অনেকেই আইআইটি, মেডিক্যাল অথবা আইএইএম-এ যাবে। কিন্তু, কেউ তো করোনার ওষুধ তৈরি করবে না অথবা বেকারত্ব দূরীকরণের জন্য অর্থনীতির কোনও সূত্র খুঁজে বার করবে। এঁরা তো শুধুমাত্র কর্পোরেট হিসেবে বিপুল আয় করবে অথবা নিজেদের ক্লিনিক খুলে অর্থ উপার্জন করবে। বুঝতেই পারছি না এত নেতিবাচক চিন্তাভাবনা কেন তাঁদের মাথায় আসে? কর্পোরেটে ভালো চাকরি পাওয়া অথবা নিজস্ব ক্লিনিক খোলা কী অপরাধ হিসেবে গণ্য?

 

ভারতের লক্ষ লক্ষ যুবক-যুবতী কর্পোরেট দুনিয়ায় চাকরি করছেন। তাঁরা প্রতিবছর প্রচুর ট্যাক্সও দেন। তাঁরা কী কোনও খারাপ কাজ করছেন? এটা তো কেউ বলছে না যে, কম নম্বর পাওয়া অথবা অনুত্তীর্ণ হওয়া মানে জীবনের সমাপ্তি। জীবন আপনাকে প্রচুর সুযোগ দেয়। আপনার সামনে নতুন নতুন বিকল্প রয়েছে। কম নম্বর পাওয়াও অপরাধ নয়। জীবনে উন্নতির সম্ভাবনা সর্বদা রয়েছে, আপনিও উন্নতি করুন। আপনাকে কে আটকে রেখেছে?

এজন্যই পরীক্ষায় কম নম্বর আসে

প্রস্তুতি ছাড়া অথবা কম প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষা দিতে যাওয়া সঠিক নয়। অর্থাৎ যাঁরা কম নম্বর পেয়েছেন, তাঁরা পরীক্ষার জন্য ভালোভাবে প্রস্তুতি নেননি। কম প্রস্তুতির জন্য সতর্ক করা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু, প্রসংশা করার অর্থ তাঁদের জীবন নষ্ট করে দেওয়া। এটা কাঁচের মতো পরিষ্কার। এবার তাঁদের চোখ খুলে যাওয়া উচিত। কম নম্বর পাওয়ার কারণে ভালো কলেজে কাঙ্খিত কোর্স তাঁরাই ভর্তি হতে পারবে না। কিন্তু যে সমস্ত জ্ঞানীরা মনে করেন বেশি নম্বর পাওয়া কোনও কৃতিত্বই নয়, তাঁদের চিন্তাভাবনা দেখে সত্যিই দুঃখ হয়। তাঁরা কী এটাও চাইছে যে, তাঁদের পরিবারের ছেলে-মেয়েরাও কম নম্বর আনুক? তাঁরা কী এটা চাইছে না নিজেদের পরিবারের কেউ অথবা বন্ধুদের মধ্যে কেউ সেরা হোক, কাউকে জ্ঞান দেওয়া খুব সহজ। এটা সঠিক যে প্রতিটি সন্তানই অনন্য হয়।

 

তাঁদের মধ্যে উন্মাদনা বাড়াতে হবে এবং দুর্বলতা হ্রাস করতে হবে। এই প্রক্রিয়ার বিপরীতে শুধুমাত্র ব্যর্থতা রয়েছে। সমাজ ও পরিবারকে তাঁদের বৈশিষ্ট্যগুলি বুঝতে হবে এবং উন্নতিতে সহায়তা করতে হবে। এজন্যই যাঁরা পরীক্ষায় কম নম্বর পেয়েছে অথবা অনুত্তীর্ণ হয়েছে তাঁদের নিকৃষ্ট বলে বিবেচনা করার দরকার নেই। এক্ষেত্রে অভিভাবকদেরও সহায়তা করতে হবে।

শিক্ষক ও অভিভাবকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

একটি বিষয় তো বুঝতেই হবে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য অথবা পরীক্ষায় সফল হওয়ার জন্য কঠোর পরিশ্রমের প্রয়োজন। এমনি এমনি আপনি এগিয়ে যেতে পারবেন না। যদিও আমাকে বলতেই হবে, যে সমস্ত পড়ুয়ারা শীর্ষে পৌঁছে চায়, তাঁদের অগ্রগতিতে শিক্ষক ও অভিভাবকদের অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে। কারণ দেখা যায় একটি স্কুলের অধিকাংশ পড়ুয়া বিজ্ঞান, আর্টস ও কমার্স বিভাগে ৯০ শতাংশ নম্বর অর্জন করছে। অপরদিকে বহু স্কুলের ফলাফল একেবারে ভিন্ন। দিল্লি, পাটনা, লখনউ, রাঁচি, দেহরাদুন-সহ কিছু শহরের স্কুলের বিষয়ে দাবি করে বলতে পারি, ওই সমস্ত স্কুলের ফলাফল সবচেয়ে ভালো হবে। এই কারণেই দাবি করতে পারছি, যেহেতু ওই সমস্ত স্কুলে অধ্যক্ষ ও শিক্ষকদের জন্য খ্যাতি রয়েছে।

 

আমিও দেহরাদুনের এমনই একটি স্কুলের অধ্যক্ষ। আমাদের একটি পড়ুয়া কমার্সে ৫০০-র মধ্যে ৪৯৭ নম্বর পেয়েছে। আরও বহু পড়ুয়া ৯০ শতাংশের বেশি নম্বর পেয়েছে। তা সত্বেও, কম নম্বর পাওয়া পরীক্ষার্থীর জন্য সমগ্র স্কুলের গড় ছিল ৮৩ শতাংশ। পড়াশোনা তো একই রকম হয়েছে। তাহলে পার্থক্য কীভাবে হল? বিবেচনা করুন এবং উত্তর আপনি নিজেই পেয়ে যাবেন। যেখানে পড়ুয়াদের নম্বর কম এসেছে, সেখানকার শিক্ষকদের তা বিবেচনা করতে হবে। আপনি কী পড়ুয়াদের ভালোভাবে পড়াতে পারছেন? যে সমস্ত শিক্ষার্থীরা ভালো ফল করেছে তাঁদের শিক্ষকদের পুরস্কৃত করা উচিত সরকারের। এছাড়াও শিক্ষকদের ক্লাস নেওয়া উচিত।

 

এরইমধ্যে উত্তর প্রদেশ বোর্ডের হাইস্কুল এবং ইন্টারমিডিয়েটের ফল বেরিয়েছে। একটি বিষয় ভীষণ উদ্বেগজনক। এবছর উত্তর প্রদেশ বোর্ডের পরীক্ষায় ৮ লক্ষ পরীক্ষার্থী হিন্দি বিষয়ে ফেল করেছে। হিন্দি ভাষী রাজ্যের নতুন প্রজন্ম কী কারণে হিন্দি থেকে এত দূরে চলে যাচ্ছে? বিশদে এ বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। এত খারাপ ফলাফলের জন্য এখন বলা হচ্ছে, উত্তর প্রদেশের হিন্দি পাঠ্যক্রম নাকি ভীষণ কঠিন। এই পাঠ্যক্রমে অবধী এবং ব্রজ ভাষার কবি, লেখক রচনা রয়েছে। যা বোঝার জন্য পড়ুয়াদের নাকি লোহার ছোলা চিবোতে হবে। তাহলে সময় থাকতেই এ বিষয়ে কেন চিন্তাভাবনা করা হল না।

 

গত বছরও উত্তর প্রদেশ বোর্ডের পরীক্ষার ফলাফল নিরাশাজনক ছিল। খারাপ ফলাফলের জন্য তখনও প্রচুর কারণ দেখানো হয়েছিল। হিন্দির কাশী উত্তর প্রদেশে হিন্দির প্রতি আবেগ কেন হ্রাস পাচ্ছে? হিন্দির শিক্ষকরা কী নিজেদের কাজ ভালোভাবে করতে পারছেন না? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। অবধি, ব্রজভাষা কী সমৃদ্ধকারী সহায়ক ভাষা নয়? কিছু মনে করবেন না, এতটুকু তো বলতেই হবে ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে আরও সচেতন হতে হবে সমাজ ও সরকারগুলিকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্কুল ও কলেজের পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন আনতে হবে। সর্বাগ্রে থাকার উন্মাদনা তৈরি করতে হবে পড়ুয়াদের। এগিয়েই যেতে হবে।

Related Articles

Back to top button
Close