fbpx
দেশব্লগহেডলাইন

বিহারের জন্য দ্বিতীয় এইমসের মানে

রবীন্দ্র কিশোর সিনহা: আপনি কোনও দিন হঠাৎ করে রাজধানীর দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্স এইমসে গেলে দেখতে পারবেন যে চিকিৎসাধীন ৫০ শতাংশ রোগী বিহারের বাসিন্দা। সংখ্যাটা আরও বেশি হতে পারে। এই অসহায় গরীব মানুষগুলি এখান থেকে ওখানে ঘুরে বেড়ায়। বিহারে ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য পরিষেবার জন্যই এখানকার বাসিন্দারা দিল্লির এইমসের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। সুখের খবর এটাই যে এমন পরিস্থিতিতে দ্বারভাঙ্গা জেলায় এইমস গড়ার ছাড়পত্র মোদী সরকার দিয়েছে। মনে করা হচ্ছে আগামী ৪৮ মাসের মধ্যেই দ্বারভাঙ্গা এইমস চিকিৎসা পরিষেবার কাজ শুরু করে দেবে।

 

গত সপ্তাহে জানা গিয়েছিল বিহারের দরভাঙ্গায় এইমস স্থাপনের প্রস্তাবটি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা অনুমোদন করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সভাপতিত্বে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। প্রতিষ্ঠানটি প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা যোজনা (পিএমএসএসওয়াই) এর আওতায় প্রতিষ্ঠিত হবে। এর নির্মাণ করতে খরচ হবে ১২৬৪ কোটি টাকা। এখানে স্নাতক (এমবিবিএস) এর ১০০টি আসন, বিএসসি (নার্সিং) এর ৬০ টি আসন, ১৫ থেকে ২০ সুপার স্পেশালিটি বিভাগ এবং একটি ৭৫০ শয্যা বিশিষ্ট অত্যাধুনিক হাসপাতাল থাকবে। এটি দেশের ২২ তম এবং বিহারের দ্বিতীয় এইমস হবে।

                        আরও পড়ুন: উৎসবের মরশুমে চালুর পথে মাঝেরহাট ব্রিজ

একবার এইমস দ্বারভাঙ্গায় নির্মিত হলে উত্তর বিহারের বেতিয়া থেকে কোসি আর সীমাঞ্চলের সাহারসা, সুপৌল এবং পূর্ণিয়া তথা নেপালের তরাই পর্যন্ত লোকেদের আর চিকিৎসা জন্য দিল্লি বা পাটনা যেতে হবে না। নতুন এইমস তৈরি হয়ে গেলে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার ওপিডি রোগী এবং প্রতি মাসে প্রায় এক হাজার আইপিডি রোগীর চিকিৎসা করা হবে। এটি সবার জানা উচিত যে এইমসের চিকিৎসক, নার্স এবং অন্যান্য কর্মীরা প্রশিক্ষণের কারণে বিশিষ্ট কর্মসংস্কৃতি নিজেদের মধ্যে তৈরি করেছে। রোগীদের সুস্থ করে তুলতে তারা সবকিছু উৎসর্গ করে দেন। এখানে শুরু থেকেই নিজের কাজের প্রতি সততা এবং নিষ্ঠা তথা সেবা করার মনোবৃত্তির ঐতিহ্য রয়েছে।

এইমসের স্বপ্ন কে দেখেছিলেন

আসলে এইমস হ’ল ভারতের প্রথম স্বাস্থ্যমন্ত্রী রাজকুমারী অমৃত কৌরের দূরদৃষ্টির ফল। এইমস চিকিৎসকরা যে নিষ্ঠা এবং নিঃস্বার্থ সেবার মনোভাব নিয়ে রোগীদের দেখেন, তা থেকে বোঝা যায় এটি কোনও সাধারণ মানের হাসপাতাল নয়। তবে এই হাসপাতলে রাজধানী দিল্লি বা এনসিআর থেকে যাওয়া রোগীদের খুব কমই দেখা যায়। তারা নিজেদের সমৃদ্ধি প্রকাশ করার জন্য বেসরকারি হাসপাতালে যান এবং তার পরে আফসোস করতে থাকেন। বিহার, পূর্ব উত্তরপ্রদেশ এবং মধ্যপ্রদেশের রোগীদের দিল্লির এইমস-এর প্রতি বিশ্বাস রয়েছে।  এখানে বিহারের পাটনা, দ্বারভাঙ্গা, কিষানগঞ্জ, আরারিয়া, মুজাফফরপুর থেকে আসা রোগীরা এখানে চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে উঠলে বাড়িতে ফিরে যান।

                  আরও পড়ুন: জোরালো ভূমিকম্পে কাঁপল রাশিয়া, কম্পনের মাত্রা ৫.৯

এইমসে অনেকাংশে আপনি সমাজতন্ত্রের দর্শন দেখতে পাবেন। বড় ব্যক্তিত্ব হলেও তাদের লাইনে দাঁড়াতে হয়। এইমস প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রায় এক দশক পর ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ চক্ষুবিজ্ঞান কেন্দ্রটি ১৯৬৭ সালে তৈরি করা হয়। চোখের দুরহ রোগের চিকিৎসা এই হাসপাতালে হয়। এই হাসপাতালের মূলমন্ত্র হল ‘ তমসো মা জ্যোতিরগামায় ‘। এর প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন অধ্যাপক ডাঃ এল পি আগরওয়াল। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বোস্টন রেটিনা কেন্দ্র থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে এখানে এসেছিলেন। তিনি এই চক্ষু চিকিৎসা কেন্দ্রে অনেক দক্ষ চিকিৎসককে যুক্ত করেছিলেন। এই কেন্দ্রের রিসেপশনে টুপি ছাড়া রাজেন্দ্র প্রসাদের মূর্তি বসানো রয়েছে। এই জায়গাটি বাদে আপনি খুব সহজেই টুপিতে রাজেন্দ্রবাবুকে দেখেছেন। এই কেন্দ্রে অধ্যাপক প্রদীপ ভেঙ্কটেশ, অধ্যাপক তরুণ দাদা, অধ্যাপক বিনোদ আগরওয়ালের মত দুর্দান্ত চক্ষু চিকিৎসক রয়েছে।

 

আপনি তাদেরকে বিশ্বের সর্বাধিক দক্ষ চোখের চিকিৎসকদের শ্রেণীতে রাখতে পারেন। বিশ্বখ্যাত লেখক ও মোটিভেটর গুরু ডা: দীপক চোপড়া, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাথলজি বিভাগের অধ্যাপক ডাঃ বিনয় কুমার, বর্তমান এইমসের অধিকর্তা ডা: রণদীপ গুলেরিয়া, ইএনটি বিশেষজ্ঞ ডা: রমেশ ডেকা, ডা: পি ভেণুগোপাল, ডাঃ সিদ্ধার্থ তঞ্চুংয়ের মতো কয়েকশত চিকিৎসক এখানে পড়াশোনা করেন এবং তারপরে এখানে তাঁর জীবন অতিবাহিত করেন। দুঃখের বিষয় যে সকল জ্ঞানী লোক বিহারে এইমস খোলা নিয়ে রাজনীতি দেখছেন তাদের লজ্জা হওয়া উচিত।

এর মধ্যে একটি সুখবর এটাই যে করোনার বিরুদ্ধে কার্যকর হতে পারে এমন টিকার পরীক্ষা শুরু হয়ে গিয়েছে। ভ্যাকসিনের প্রথম পর্বের ট্রায়ালটি এইমস-এ মোট ১০০ জন স্বেচ্ছাসেবীর উপর করে সমাপ্ত হবে। দেশে তৈরি প্রথম করোনার ভাইরাস ভ্যাকসিনের নাম কোভাক্সিন। ট্রায়ালের দায়িত্বে রয়েছেন ডাঃ সঞ্জয় রাই। কোভাক্সিনকে হায়দরাবাদের ভারত বায়োটেক, ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিকেল রিসার্চ (আইসিএমআর) এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ভাইরোলজি (এনআইভি) এর সহযোগিতায় তৈরি করেছে।  ভ্যাকসিনের কোডনামটি বিবিভি ১৫২। এর পরীক্ষা দেশের যে বারোটি জায়গায় হচ্ছে তার মধ্যে দিল্লির এইমস রয়েছে। এর স্যাম্পল সাইজ পুরো দেশের মধ্যে বড়। ফলে এর ফলাফল গবেষণার দিশাকে নির্ধারণ করবে। ইতিমধ্যে এইমস পাটনা এবং রোহটক পিজিআইতে ভ্যাকসিনের ট্রায়াল চলছে। ইতিমধ্যে গোয়ায় ট্রায়াল শুরু হয়েছে।

 এবার একটু আলাদা প্রসঙ্গে আলোচনা করি। বিহারের, যা আপনি দেশের প্রাচীন জ্ঞানের কেন্দ্র বা রাজধানী হিসাবে বিবেচনা করতে পারেন। মহাবীর, বুদ্ধ এবং চারজন প্রথম শঙ্করাচার্য মধ্যে এক (মন্দন মিশ্র) এবং এমনকি ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি দেশরত্ন ড. রাজেন্দ্র প্রসাদকে বিশ্বের কাছে বিহারের উপহার ছিল। এমনকি বিহারের চম্পারন আন্দোলনের মহাত্মা গান্ধী গোটা ভারত জুড়ে জাতীয় স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। জ্ঞানের তৃষ্ণা প্রতিটি বিহারীতে সর্বদা থাকে। এখন বিহারকেও খেলাধুলায় এগিয়ে আসতে হবে। বিহারের ক্রীড়া পরিকাঠামোকে সঠিকভাবে বিকশিত করতে হবে। দুর্ভাগ্যক্রমে বলা যেতে পারে যে সর্বশেষ রিও অলিম্পিক গেমসে অংশ নেওয়া ভারতীয় দলে বিহারের একজনও খেলোয়াড় ছিলেন না। এ দিকেও সব রাজনৈতিক দলকেই ভাবতে হবে যাতে তারা বিহারের খেলাধুলার সর্বাত্মক উন্নয়ন করতে পারে।

শুধু জ্ঞান অর্জনই কি যথেষ্ট? হকি জাতীয় খেলা দিয়ে শুরু করতে হবে। পুরো বিহারজুড়ে একটিও অ্যাস্ট্রো টার্ফ-সজ্জিত হকি মাঠ নেই। ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) মরসুম শুরু হয়ে গেছে। পুরো দেশ এখন ক্রিকেট হয়ে উঠেছে। কেবল হাতেগোনা কয়েকজন বিহার খেলোয়াড় সুযোগ পেয়েছে। দুঃখের বিষয় যে বিহারের মতো জ্ঞানের রাজ্য উন্নয়নের পথে হাঁটতে পারছে না। ইতিহাসকে এটাও মেনে নিতে হবে যে লালু প্রসাদ যাদবের মতন নেতারা বিহারকে উন্নয়নের পথ থেকে অনেক দূরে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।

Related Articles

Back to top button
Close