fbpx
দেশব্লগহেডলাইন

‘নিযুক্ত বাবুদের চাকরিতে মেয়াদ বৃদ্ধির কী প্রয়োজন’

আর কে সিনহা: ভারতের বৃহত্তম পাবলিক সেক্টর ব্যাঙ্ক, স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান এবং ম্যানেজিং ডিরেক্টর রজনীশ কুমারকে পুনরায় ওই পদে বসানোর সম্ভাবনা প্রবল। ২০১৭ সালের ৭ অক্টোবর ওই পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন তিনি। তার আগে অরুন্ধতী সরকারের মেয়াদ বাড়িয়েছিল সরকার।

 

কোনও আধিকারিকের মেয়াদ বাড়ানো উচিত না-কি অনুচিত তা সরকারের উপরই নির্ভর করে। নিঃসন্দেহে, সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ কোনও আধিকারিকের পরিষেবা বৃদ্ধির বিষয়ে বুঝেশুনে সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু, একটি প্রশ্ন হল, অবসর নেওয়ার বয়সেও কোনও অফিসারের কী উচিত চাকরি চালিয়ে যাওয়া? তাঁরা কী এটা জানেন না, চাকরিতে মেয়াদ বৃদ্ধির ফলে তাঁর অধস্তন জুনিয়র অফিসারদের পদোন্নতির সমস্ত সম্ভাবনা সমাপ্ত হয়ে যায়? তাঁরা কী সেবা করার মানসিকতা নিয়ে সরকারি চাকরিতে আসেন না? কয়েক দশক ধরে জুনিয়র সহকর্মীদের সঙ্গে কাজ করার জন্য তাঁদের মধ্যে কী সংবেদনশীলতা নেই?

 

বুঝতেই পারছি না বাবুদের চাকরিতে মেয়াদ বৃদ্ধির কী প্রয়োজন? কারও মেয়াদ সরকার বৃদ্ধি করে, কিন্তু, তাঁদের মধ্যে অনেকেই মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য চেষ্টা করেন। অর্থ উপার্জনের জন্য এটা কী অতিরিক্ত লোভ নয়?

অপরিহার্য অফিসার কারা

আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, ১৯৭৭ ব্যাচের প্রাক্তন মন্ত্রিসভার সচিব পি কে সিনহাকে একাধিকবার মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছিল। ফলস্বরূপ, তাঁর অধস্তন জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে অনেকেই মন্ত্রিসভার সচিব হওয়ার সুযোগ পাননি। সিনহার আগে তাঁর তিন পূর্বসূরি, যথাক্রমে বি কে চতুর্বেদী, অজিত কুমার এবং কে এম চন্দ্রশেখরের মেয়াদ বৃদ্ধি করেছিল সরকার। এমনটা কেন হয় যে, কিছু অফিসারকে অপরিহার্য মনে করে সরকার। এই প্রক্রিয়া বন্ধ হওয়া অত্যন্ত আবশ্যিক। যদি মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়, তাহলে স্পষ্টভাবে জানানো উচিত, এই অফিসাররা বিশেষ কী অর্জন করেছেন। পি কে সিনহার মেয়াদ বৃদ্ধির ফলে কপিলদেব ত্রিপাঠি এবং রীতা তিতোটিয়ার স্বপ্ন চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল।

 

দেশের লক্ষ লক্ষ সরকারি কর্মীদের উর্দ্ধে একটি পদ হল ক্যাবিনেট সচিব। ক্যাবিনেট সচিবের তত্ত্বাবধানেই সড়কের কল্যানমূলক প্রকল্প ও কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ। কীভাবে ধরে নেওয়া যায় মেয়াদ বৃদ্ধি পাওয়া অফিসারই দক্ষ, অন্যান্যরা অযোগ্য!

অন্যদিকে রেল বোর্ডের চেয়ারম্যান বিনোদ কুমার যাদবের মেয়াদ এক বছরের জন্য বৃদ্ধি করেছে সরকার। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বি কে যাদবের কার্যকালের মেয়াদ ছিল। ভালো পারফরম্যান্সের জন্য যাদবকে এক বছরের জন্য অতিরিক্ত মেয়াদ বৃদ্ধি করেছে সরকার। অর্থাৎ অন্য কাউকে রেল বোর্ডের চেয়ারম্যানের উপযুক্ত মনে করেনি সরকার। যাদব আগে দক্ষিণ-মধ্য রেলের জেনারেল ম্যানেজার ছিলেন।

যোগ্য এই সমস্ত অফিসার

একটি বিষয় কাঁচের মতো পরিষ্কার হয়ে যাওয়া উচিত, রজনীশ কুমার থেকে বি কে যাদব পর্যন্ত কারও দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছি না। তাঁরা সবু যোগ্য ও অনুভবি অফিসার। তবে তাঁদের জুনিয়ররাও যোগ্য। নিজেদের ক্ষমতা একাধিকবার তাঁরা প্রমাণ করেছেন। অবসর নেওয়ার পর কোনও দক্ষতা সম্পন্ন অফিসারকে উপদেষ্টার পদে কী রাখা সম্ভব নয়? এর ফলে অন্যান্য অফিসাররা নিরুৎসাহিত হবেন না। সামগ্রিকভাবে যদি দেখা যায় সরকারি বাবুদের সর্দার প্যাটেলের শিক্ষা অনুপ্রাণিত করে।

 

১৯৪৭ সালের ২১ এপ্রিল দিল্লির মেটকাফ হাউসে দেশের আইএএস ও আইপিএস অফিসারদের সর্দার প্যাটেল বলেছিলেন, স্বাধীন ভারতের জনগণের প্রশ্নের প্রতি তাঁদের আন্তরিক ও সহানুভূতিশীল হতে হবে। সরকারি বাবুদের প্রশাসনিক যে মূল মন্ত্র দেওয়া হয়েছিল, তা তাঁরা অনুসরণ করতেন।

অধিকাংশ অফিসার ভালো পোস্টিংয়ের জন্য ব্যস্ত

এটা ঠিক কিছু অফিসার কর্তব্য পালনের জন্য জীবন বলিদান পর্যন্ত দেন। যেমন পঞ্জাব লাইসেন্সিং অথরিটির অফিসার নেহা শৌরি, জাতীয় সড়ক অথরিটির সত্যেন্দ্র দুবে এবং পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের মঞ্জুনাথের মতো সরকারি অফিসারদের বিষয়ে উল্লেখ করা দরকার। নেহা শৌরি কঠোর পরিশ্রমী ও কর্তব্যপরায়ণ অফিসার ছিলেন। বেইমানদের তিনি কখনও ছাড়তে না। জীবন দিয়ে সেই মূল্য তাঁকে চোকাতে হয়েছে। নেহার আগে সত্যেন্দ্র দুবে হোক অথবা অশোক খেমকা, তাঁদের প্রত্যেককে সততার জন্য ভারী মূল্য চোকাতে হয়েছে। সমাজও তাঁদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়।

 

এই পরিস্থিতি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। সৎ অফিসারদের চিরকাল নিপীড়িত। অকারণে তাঁদের পদোন্নতি দেওয়া হয় না, পাশাপাশি প্রায়শই তাঁদের বদলি করা হয়। হরিয়ানা ক্যাডারের সৎ আইএএস অফিসার অশোক খেমকাকে কে চেনেন না? তাঁকে কতবার বিভিন্ন স্থানে বদলি করা হয়েছে, তিনি ঘুষখোর অফিসার নন। ১৯৬৩ সালের ২১ ডিসেম্বর ভারতে দুর্নীতি দূরীকরণ বিষয়ে সংসদে রামমনোহর লোহিয়া বলেছিলেন, সিংহাসন ও বাণিজ্যের মধ্যে সম্পর্ক এতটাই দূষিত, দুর্নীতিগ্রস্ত ও অসৎ হয়ে উঠেছে, তা বিশ্বের ইতিহাসে কোথাও হয়নি। ব্রিটিশদের খাজনা আদায় করা অথবা নেতাদের পকেট ভর্তি করা, সবই একই। তাঁদের সর্দার বদলেছে, রূপ বদলেছে কিন্তু চিন্তাভাবনা বদলায়নি। জনগণকে তখনও শোষণ করা হয়েছিল, তা এখনও চলছে। আমাদের মধ্যে কিছু মানুষের ধ্যানধারণা শুধুমাত্র নিজের চাকরি, বিলাসবহুল সরকারি সুযোগসুবিধা, বিদেশ ভ্রমণ প্রভৃতি নিয়েই।

 

আসলে যেই সমস্ত অফিসার কর্তব্যপরায়ণ গুণ অর্জন করবেন, তাঁরা সর্বত্র এগিয়ে যাবেন। কিন্তু আমরা কী কখনও এই সমস্ত দায়িত্বভাব সরকারি অফিসারদের সম্মান জানিয়েছি? সরকার কী তাঁদের অগ্রাধিকার ও সুযোগ দিতে পেরেছে? সরকার যদি আমাদের দেশের সৎ অফিসারদের পাশে দাঁড়াবে তাহলে ভীষণ ভালো লাগবে। অবসর নেওয়ার পরও তাঁরা যেন গুরুত্বপূর্ণ পদ পেতে থাকেন, কিন্তু মেয়াদ বৃদ্ধি যেন না হয়, যাতে জুনিয়র অফিসাররা তাঁদের যোগ্যতা প্রদর্শনের সুযোগ পান।

Related Articles

Back to top button
Close