fbpx
পশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

ধানের সাধভক্ষণ… বাংলার বুক থেকে হারিয়ে যাচ্ছে নলসংক্রান্তি প্রথা

ভাস্করব্রত পতি, তমলুক: হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার চিরন্তন ঐতিহ্য নলসংক্রান্তি। আশ্বিনের সংক্রান্তি এলেই ফসলের দেবী লক্ষ্মীর সাধভক্ষণ করানোর রীতি বা উপচার হোলো এই নলসংক্রান্তি বা ডাকসংক্রান্তি বা সারধরা বা ডাক সাঁকরাত। প্রসূতিকে যেমন প্রসবের আগে সাধ ভক্ষণ করানোর চল আছে, তেমনি আশ্বিন মাসের শেষ দিন যখন ধানের শিষ এসে যায়, তখন ঢলঢলে জমিতে তথা আসন্ন প্রসবা লক্ষ্মীকে নানা খাদ্য সহকারে সাধভক্ষণ করানোর রীতি রয়েছে এই নলসংক্রান্তির মাধ্যমে।

কিন্তু ব্যস্ততার জীবনে এই চিরন্তন লোকঘরানাটি প্রায় অবলুপ্তির পথে। এখন গ্রামে গঞ্জে প্রায় দেখাই যায়না নল বাঁধার ব্যস্ততা। সাহড়দা গ্রামের গুরুপদ মাইতি জানান, শিষযুক্ত নলগাছে প্রথমে ‘বরোজ’ বাঁধতে হয়। এই বরোজ বাঁধতে গেলে প্রয়োজন বড়সড় পাতা। একাজে ব্যবহার করা হয় বোড় পাতা বা বাজবরণ গাছের পাতা। সেই পাতায় একটা বিশেষ মিশ্রন মুড়ে নতুন পাট দিয়ে বাঁধতে হয় নলগাছে। প্রথমেই সংগ্রহ করতে হয় কালমেঘ, কাঁচা হলুদ, বনকেঁউ, ঘেঁটু পাতা, চিংড়ি মাছ এবং নলগাছ। কোথাও কোথাও নল বা সরকাঠির সাথে বোড় গাছের পাতায় মুড়ে শালুক ফুল, নিম, হলুদ, আদা, কেতকী পাতা, কালোমেঘ, বেলপাতা, সিঁদুর সহযোগে মিশ্রন করে বাঁধা হয়। এসব দিয়েই ‘বরোজ’ বাঁধতে হয়।

এই ‘বরোজ’ বাঁধার জন্য বেছে নেওয়া হয় গ্রামের কোনো মোড়ল বা মক্কেল শ্রেনীর বাসগৃহ। মূলতঃ সন্ধ্যার পরই একাজে জড়ো হতেন গ্রামের মানুষ।রঞ্জিত পাড়ই, বিনোদ পাড়ই, গুরুপদ মাইতি, ধীরেন্দ্রনাথ পাড়ই, যুগল পানিগ্রাহীরা যেতেন গ্রামের মোড়ল ‘কর’দের বাড়ি। প্রায় তিন চার ঘন্টা ধরে চলতো তা। সেই সঙ্গে ওই মোড়লের বাড়িতে চলতো খাওয়া দাওয়া। ওই মোড়লই খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। এ কাজের সময় ঘনঘন হরিধ্বনি দেওয়া বাধ্যতামূলক। এভাবেই কথাবার্তা, আনন্দ ,হইহুল্লোড়, খাওয়া দাওয়ার মাধ্যমে শেষ হোতো নলগাছে বরোজ বাঁধার কাজ। হরিধ্বনির সাথে শাঁখ বাজানোর রেওয়াজ রয়েছে।

নল পোঁতার সময় অঞ্চলভেদে বিভিন্ন ছড়া উচ্চারিত হয়। কোথাও কোথাও বলে ‘অন সরিষা কাঁকুড় নাড়ি / যা রে পোক ধানকে ছাড়ি / এতে আছে শুকতা / ধান ফলবে মুকতা / এতে আছে কেঁউ / ধান হবে সাত বেঁউ / এতে আছে হলদি / ধান ফলবে জলদি / এতে আছে ওল / মহাদেবের ধ্যান করি, বোল হরিবোল’‌। কেউ কেউ বলেন, ‘এতে আছে কেঁউ / ধান হবে আড়াই বেঁউ / এতে আছে শুকতা / ধান হবে গজমুক্তা / এতে আছে ঝোটপাট / সব পোকার মাথা কাট’। মুসলিম কৃষকেরা জমিতে নল পোঁতার সময় বলেন, ‘হিন্দুয়াকা যোহি বোল / হামরা ভি ওহি বোল / ধান ফো ও ল / ধান ফো ও ল’। পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথি এলাকায় ছড়াটি এরকম, ‘এইরে (এতে) আছে কাঁকুড়নাড়ি (শশা গাছের অংশ) / ধান ফলিব কাঁড়ি, কাঁড়ি / এইরে আছে ঝোট পাটা / সবু পোকার মথা কাটা / এইরে আছে ওল / মহাদেবের নামে হরিবোল ‘।

আরও পড়ুন: শারদীয়া উৎসব উপলক্ষে কবি রণজিৎ বিশ্বাসের অনবদ্য উপস্থাপনা “নতুন শতাব্দী”

আসলে আশ্বিনের মাঝামাঝি থেকে কার্তিকের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে আমন ধানের গর্ভকাল। তাই ধান তথা লক্ষ্মীকে সাধভক্ষণ করানোর রীতি বাঙালি হিন্দু সমাজের বহুদিনের চল। ভোরবেলা বিশেষভাবে তৈরি নলগাছগুলোকে বিভিন্ন স্থানে পুঁতে দিতে হয়। প্রথমেই তুলসীমঞ্চে দিতে হবে। এরপর বাড়ির চালে বা ছাদে রাখতে হবে। ডাক ঝোড়াতে এবং পুকুরেও একটি করে নলগাছ রাখতে হবে। সবশেষে প্রতিটি ধানজমিতে পুঁতে দিতে হয় একটি করে নলগাছ।

এই নলসংক্রান্তি উৎসবের সাথে একটু অন্য ধরনের উপচারও পালন করা হয়। একে বলে ‘আলুই’ খাওয়া। নলসংক্রান্তিতে ‘আলুই’ খাওয়ার চল বহু পুরোনো। আগের দিন সন্ধ্যাবেলায় একটা চুবড়িতে রাখতে হয় নিমপাতা, চালকুমড়োর ডাঁটা, কালমেঘ, নটে শাক, তালের গজড়, পুঁই গাছের ডোগা এবং কাঁচা হলুদ। এবার ঐ চুবড়িটিকে প্রথমে পুকুরে ডোবাতে হয়। এই চুবড়িকে বলে ‘ডাক ঝোড়া’। এর সাথে পুঁটুলিতে কিছু আতপ চাল বেঁধে রাখতে হয়। এবার পুকুরে ডাক ঝোড়াটি ডোবানোর পর ঝোড়া থেকে নির্গত জল সংগ্রহ করতে হয় ঘটিতে। যা দিয়েই ওই সব সব্জিগুলিকে বেটে প্রস্তুত করা হয় ‘আলুই’। তখন শাঁখ বাজাতে হয়। সংক্রান্তির দিন জমিতে নল পোঁতার পর এই বাটা আলুই, ভিজানো আতপচাল এবং তাল গজড় খাওয়ানো হয় সকলকে।

এই নলগাছ হোলো বহু প্রজনন শক্তির অধিকারী। মানুষের বিশ্বাস এই নলখাগড়া গাছের মতোই ধানগাছগুলো হয়ে উঠুক গর্ভিনী। তাই নলগাছ পোঁতা হয় জমিতে। আর আলুই সম্পূর্ণ ভেষজ গাছগাছালি দিয়ে বানানো হয়। এই মরসুম আসলে পরিবর্তনের সময়কাল। ফলে রোগ জ্বালা আক্রমনের সম্ভাবনা থাকে। এসবের হাত থেকে রেহাই পেতেই কৃষিজীবী মানুষের একান্ত ধর্মীয় বিশ্বাস এবং অবৈজ্ঞানিকভাবে বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনার বহিঃপ্রকাশ হল এই নলসংক্রান্তি উৎসব।

 

 

 

Related Articles

Back to top button
Close