fbpx
অফবিটহেডলাইন

অফুরন্ত ভালোবাসার আধার সত্য সাই বাবা

অরিজিৎ মৈত্র: সত্য সাই বাবা তো শুধু ধর্মীয় গুরু নন, বিরাট কর্মবীরও বটে। সঙ্গে সঙ্গে বিশিষ্ট জনসেবকও। ধর্মগুরুরূপে তিনি আত্মজ্ঞান লাভের প্রবক্তা। শুদ্ধজীবন, সাধন-ভজন, মানবপ্রেমই তাঁর অনুশাসন। তিনি ধর্মবৈষম্যের বিরোধী। সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাঁর আশ্রম প্রশান্তিনিলয়মে যেমন হিন্দুদের শিবরাত্রি, জন্মাষ্টমী, নবরাত্রি উৎসবগুলি পালিত হয়, তেমনই বড়দিন, ঈদুলফিতারও সাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হয়।

শিক্ষাবিস্তারেও সত্য সাই বাবা বদ্ধপরিকর ছিলেন। শিশুশিক্ষা, বালবিকাশ, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, বিজ্ঞানশিক্ষা কেন্দ্র, সংগীতশিক্ষাকেন্দ্র সহ অনেক ধরনের প্রতিষ্ঠান তাঁর নির্দেশে চলত এবং তাঁর শরীর ছাড়ার পরেও চলেছে। সেবাকর্মেও তিনি ছিলেন অগ্রণী। তাঁর সত্য সাই সেবা সংস্থা দুঃস্থ নিপীড়িতদের পাশে সদা সর্বদা থাকে। বাবা দেশের বিভিন্ন শহরে পরিশ্রুত জল সরবরাহের ব্যবস্থা করেছেন।

তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তি বাল্যকাল থেকেই প্রকাশ পেত। অনেকে সেগুলিকে ম্যাজিক বলে ব্যঙ্গ করে থাকেন। কিন্তু ভক্তদের মত ভিন্ন ধরনের। আমি নিজে তাঁর হাতে বিভূতি আসতে দেখেছি। অলৌকিক শক্তিবলে মানুষের উপকার হলেই হল, অযথা বিরূপ সমালোচনায় লাভ কি?’ ‘সকল দ্বন্দ্ব বিরোধ মাঝে জাগ্রত যে ভালো/ সেই তো তোমার ভালো’। বিজ্ঞানি থেকে শুরু করে আস্তিক, নাস্তিক শিল্প-সংস্কৃতি জগতের মানুষ তাঁর কাছে গেছেন এবং তাঁর ভক্ত হয়ে পড়েছেন। তাঁর অসংখ্য গুণগ্রাহীদের মধ্যে আছেন ড. ভি.কে. গোকক, দেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ড. এ. পি. জে.আবদুল কালাম, ড. শঙ্কর দয়াল শর্মা, প্রণব মুখোপাধ্যায়, আর ভেঙ্কটরমণ, প্রতিভা দেবী সিং পাটিল, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, পণ্ডিত রবিশঙ্কর, অমলাশঙ্কর, ওস্তাদ আমজাদ আলি খান, পণ্ডিত শিবকুমার শর্মা, বেগম পরভীন সুলতানা, সুনীল গাভাসকার, ভি. ভি. এস লক্ষণ, ড. প্রতাপ চন্দ্র চন্দ্র, রতন টাটা, শচীন তেন্ডুলকর, মমতাশঙ্কর, পূর্ণচন্দ্র দাস বাউল প্রমুখ।

তাঁর কাজ সম্পর্কে আলোচনা করলে উপকৃত হবেন দরিদ্র থেকে দরিদ্রতম মানুষ, কারণ তাঁরা সত্য সাই বাবার প্রতিষ্ঠা করা হাসপাতালগুলিতে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা পেয়ে থাকেন। এই বিষয়গুলির সঠিক মুল্যায়ন হওয়া উচিৎ বলে মনে হয়। সত্য সাই বাবাকে নিয়ে কিছু লেখার উদ্দেশ্য তাঁর মহিমা প্রচার করা নয়। কিন্তু সঠিক তথ্য এবং উপলব্ধ সত্যকে মানুষের সামনে প্রকাশ করাটাও একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য বলেই বিশ্বাস করি। সমগ্র পৃথিবীর মানবজাতির কল্যাণে কাজ করার জন্য সত্য সাই বাবা শুধুমাত্র আহ্বান জানিয়ে বা উপদেশ দিয়েই থেমে থাকেন নি। ভক্তদের তিনি রীতিমত নির্দেশ দিতেন কোথায় কীভাবে কী কাজ করতে হবে। প্রতিনিয়ত তিনি নিজের সদিচ্ছা কার্জে রূপান্তরিত করেছেন এবং আমাদের সামনে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন। তাঁর এই আগ্রহ সম্পর্কে দেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ড. এ. পি. জে. আবদুল কালাম বলেছিলেন, ‘২০০০ সালের জানুয়ারি মাসে ব্যাঙ্গালোরের উপকণ্ঠে ‘হোয়াইটফিল্ড’-এ চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বিষয়ে এক সম্মেলনের আয়োজন করেছিল শ্রী সত্য সাই সেবা সংস্থা। আমি অবাক হয়ে লক্ষ করছিলাম ওই সম্মেলনের প্রতি সত্য সাই বাবার আগ্রহ। সম্মেলন সকাল ৯টায় শুরু হয়ে রাত ৮টায় শেষ হত। ওই পুরো সময়টাই বাবা সম্মেলনে উপস্থিত থেকে সমস্ত বক্তাদের ভাষণ মন দিয়ে শুনছিলেন। আমার সামনেই তাঁকে জানানো হয় মাদ্রাজ শহরের পানীয় জলের সমস্যার কথা। সেইদিন ওই সম্মেলনেই সত্য সাই বাবা ঘোষণা করেন যে মাদ্রাজ শহরের পানীয় জলের অভাব দূর করতে তিনি এক বিশেষ জলপ্রকল্পের সূচনা করবেন শীঘ্রই। যেমন কথা তেমন কাজ।’ নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ওই প্রকল্পের কাজ শুরু এবং শেষ হয়, যথারীতি মাদ্রাজ শহরের জলের অভাবও দূর হয়।

আমি আগেই এক জায়গায় বলেছি সত্য সাই বাবার কাজের পরিধি এতই বিশাল যার পরিমাপ করা আমাদের পক্ষে কোনওভাবেই সম্ভব নয়। মানবজাতির স্বার্থে ও কল্যাণে তাঁর বিরাট কর্মকাণ্ডের কয়েকটা নমুনা ও সঠিক তথ্য তুলে ধরব। অন্ধ্রপ্রদেশের অনন্তপুর জেলা খরা কবলিত রায়েলসীমার অন্তর্গত, যেখানে কয়েক দশক আগে পর্যন্ত জলের প্রবল অভাব ছিল। কিন্তু সত্য সাই ওয়াটার সাপ্লাই প্রোজেক্টের মাধ্যমে সেই জলাভাব দুর হয়েছে। যা জনসাধারণকে জানানোর প্রয়োজন আছে বলে মনে করি। সমাজে কাজ করার জন্য ১৯৫৭ সালের আগস্ট মাসে সাইবাবা ‘শ্রী সত্য সাই সেবা সংস্থা’-র প্রতিষ্ঠা করেন। ৬৩ বছর ধরে এই সংস্থা মানুষের স্বার্থে ও কল্যাণে সমগ্র বিশ্ব জুড়ে আজও কাজ করে যাচ্ছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ এই সংস্থার কাজের সুফল লাভ করছেন এবং সমসংখ্যক মানুষ সত্য সাই সেবা সংস্থার মাধ্যমে সেবা কাজে যুক্ত হতে পেরে নিজেদের ধন্য বলে মনে করছেন। সত্য সাই সেবা সংস্থায় চারটি নিয়ম খুব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা হয় ,(১) পরিচালক মণ্ডলীর জন্য কোনও নির্বাচন হবে না, (২) সাই সমিতি কোনও টাকা তুলে পারবেনা (৩) সাই সমিতির সদস্যদের কোনওপ্রকার চাঁদা থাকবেনা, (৪) স্ত্রী ও পুরুষদের সম্পূর্ণ আলাদাভাবে কাজ করতে হবে। প্রতিষ্ঠা হওয়ার এক বছরের পরে অর্থাৎ ১৯৫৮ সালে সংস্থার প্রথম বিশ্ব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তারপর থেকে এই সংস্থার অগ্রগতি চোখে পড়ার মত।

সারা বিশ্বে একশোরও বেশি দেশে এবং ভারতের প্রত্যন্ত এলাকাতেও সংস্থার একাধিক শাখা রযেছে। শ্রী সত্য সাই সেবা সংস্থার কাজকে মোট তিনটি বিভাগে ভাগ করা হয়েছে। আধ্যাত্মিক, শিক্ষামূলক এবং সেবা। আধ্যাত্মিক বিভাগে যে সমস্ত কাজ হয়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ভজন সহযোগে সম্মিলিতভাবে প্রার্থনা, দিনের শুরুতে নগরসংকীর্তন, আধ্যাত্মিক বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য পাঠচক্ত্র, ভক্তদের নিয়ে সম্মেলন করা, ধ্যানের অনুশীলন করা। শিক্ষামূলক বিভাগের প্রধান কাজ হল শিশুদের মানসিক ও চরিত্রগঠনে নৈতিক শিক্ষাপ্রদানের জন্য সত্য সাই বালবিকাশ ক্লাসের আয়োজন করা। প্রত্যেকটি এলাকাতেই মহিলারা বালবিকাশ ক্লাস শুরু করতে পারেবেন এবং জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে সব শিশুরাই এই ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে পারবে। সঠিকভাবে বালবিকাশ ক্লাস  পরিচালনা করার জন্য মহিলাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেবার ব্যবস্থা সংস্থায় রয়েছে। সেবা বিভাগের মধ্যে পড়ে চিকিৎসা শিবিরের আয়োজন করা, প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে গ্রামোন্নয়নের কাজ করা, প্রাকৃতিক দুযোর্গের সময় দুদর্শাগ্রস্ত এলাকায় সাহায্য পৌঁছে দেওয়া এবং অস্থায়ী চিকিৎসা শিবির খোলা, হাসপাতাল, বৃদ্ধাবাস ও কুষ্ঠাশ্রমে সেবাকাজ এবং সেই সব জায়গায় প্রয়োজন মত সাহায্য দেওয়া। গ্রামের মহিলাদের হাতে কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং পশুদের জন্য চিকিৎসা শিবিরের আয়োজন করা, বিনামূল্যে কোচিং ক্লাস পরিচালনা এবং নারায়ণ সেবার আয়োজন করা। সংস্থায় টাকা তোলার বা সদস্য ও সদস্যাদের মাসিক চাঁদা দেওয়ার ব্যবস্থা না থাকলেও সমিতির কোনও কাজ বা প্রকল্প সম্পর্কে অবিহিত হয়ে যদি কোনও সাই ভক্ত সেচ্ছায় কোনওরকম আর্থিক সাহায্য করতে চান, তবে সেটা গ্রহণ করা হয়ে থাকে। কাজের শেষে সঠিক ও পরিস্কার আর্থিক হিসেব সদস্যদের সামনে তুলে ধরা হয়। মানব কল্যাণে সত্য সাই বাবার ভালোবাসার আরও একটি সুন্দর নিদর্শন হচ্ছে ‘শ্রী সত্য সাই ইনস্টিটিউট অব হায়ার মেডিক্যাল সাইন্স’।

 

১৯৯০ সালের নভেম্বর মাসে এই হাসপাতাল ভবন নির্মাণের জন্য ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। তার ঠিক এক বছর পরেই অর্থাৎ ১৯৯১ সালের নভেম্বর মাসে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পি.ভি. নরসিমহা রাও হাসপাতালটির উদ্বোধন করেন। ওই দিনই হাসপাতালে ওপেন হার্ট সার্জারি করা হয়। সব থেকে আশ্চর্যের বিষয় হল নির্মাণকার্য শুরু হওয়ার মাত্র ৬ মাসের মধ্যে সব কাজ শেষ হয় এবং হাসপাতাল সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। এই হাসপাতালে কপর্দকশূণ্য মানুষ থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত শ্রেণির মানুষ জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশিষে সমস্ত মানুষের চিকিৎসা এবং জটিল অস্ত্রপচার করা হয় সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। সেখানে সমাজের নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষের জন্য ৫০ শতাংশ শয্যা সংরক্ষণ করা আছে। এই ৫০ শতাংশের মধ্যে ১০ শতাংশ শয্যা সংরক্ষণ করা আছে যাঁদের বার্ষিক আয় ৫০০০ টাকারও কম। যে বিভাগগুলো এই হাসপাতালে নিয়মিতভাবে চলছে সেগুলো হচ্ছে কার্ডিওলজি, কার্ডিওথোরাসিক এবং ভাসকুলার সার্জারি বিভাগ, ইউরোলজি, প্ল্যাসটিক সার্জারি ও অপথ্যার্মোলজি বিভাগ।

শ্রী সত্য সাই ইনস্টিটিউট অব হায়ার মেডিকেল সায়েন্সেস, প্রশান্তিগ্রাম ও হোয়াইট ফিল্ড (ব্যাঙ্গালোর)

 

১৯৯১ সালে হাসপাতালের প্রথম দ্বারোদঘাটনের পর থেকে ২০০৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত ১৪,০০৭টি কার্ডিয়াক সার্জারি করা হয়। ১৪,২৪৫টি কার্ডিয়াক ক্যাথ প্রসিডিওরস করা হয়। ২৩,৬১৩টি ইউরোলজিক এবং প্ল্যাসটিক সার্জারি হয়েছে আর ২৩,৫৯০টি অপথ্যালমিক সার্জারি হয়েছে। ২০০৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত ১০ লক্ষ ৩২ হাজার ৪৭ জন রোগী হাসপাতালের বর্হিবিভাগে চিকিৎসা এবং পরীক্ষা করিয়েছেন। তাঁর অলৌকিক কাজের সঙ্গে অনেকে পরিচিত কিন্তু তাঁর বৃহৎ কর্মকাণ্ডের বিষয় যদি আরও বিশদভাবে আলোচনা করা হয় তবে দেশের সাধারণ মানুষ অবশ্যই উপকৃত হবেন। তাঁর স্কুল ও কলেজগুলিতেও নামমাত্র অর্থের বিনিময় শিক্ষা দেওয়া হয়। সম্প্রতি ইউনেস্কো অর্থাৎ রাষ্ট্রসংঘ শ্রী সত্য সাই কেন্দ্রীয় অছি পরিষদের তত্ত্বাবধানে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা মানব কল্যাণের কাজকে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের অনুরোধ করেছে রাষ্ট্রসংঘের উপদেষ্টা হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করতে।

শ্রী সত্য সাই ইনস্টিটিউট অব হায়ার লার্নিং, পুট্টাপর্তী

সত্য সাই বাবার ৯৫ তম জন্মদিনে তাঁর বাণীগুলোর বাস্তবায়নের ভীষণই প্রয়োজন। আর প্রয়োজন সত্য সাই সেবা সংস্থার শুদ্ধিকরণ। কারণ বাবার বলা ‘লাভ অল সার্ভ অল’ কি সত্যিই সংস্থার মধ্যে প্রতিফলিত হয়? তাঁর আরও একটি বাণী ‘হেল্প এভার হার্ট নেভার’ যদি নিজেদের জীবনে পালন করা যায় তবে তো কথাই নেই। তবে কেন এ হিংসা দ্বেষ, কেন এ ছদ্মবেশ, কেন এ মান অভিমান। যতটা সময় অন্যের বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়, ততটা সময় যদি নামস্মরণে ব্যায় করা হয় তাহলে আত্মজ্ঞান এমনিই লাভ হবে। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল কান্তকবির একটি গানের কিছু লাইন, ‘আমি সকল কাজের পাই হে সময়, তোমারে ডাকিতে পাইনে। আমি চহি দ্বারা, সুত সুখ সম্মিলন, তব সঙ্গ সুখ চাইনে।’ বাহ্যিক কিছু নিয়ম অনুসরণ করলেই সব হবে না, সত্য সাই বাবার স্বরূপ জানতে হলে ভালোবাসার আদান-প্রদানের খুব প্রয়োজন। আর পালন করতে হবে ৯ দফা আচরণবিধি।

সত্য সাই মন্দির সত্যম, শিবম, সুন্দরম (মুম্বই, হায়দরাবাদ ও চেন্নাই)

সংস্থার সদস্য-সদস্যাদের জন্য তিনি ৯ দফা আচরণবিধি ঠিক করে দিয়েছিলেন। সংস্থার পশ্চিমবঙ্গ শাখার রাজ্য সভাপতি নীতিন্দ্রনাথ মজুমদারের কাছে একবার শুনেছিলাম যে পরম সাধক মহামোহপাধ্যায় গোপীনাথ কবিরাজ তাঁকে জিজ্ঞেসা করেছিলেন যে আপনাদের সংস্থার সদস্যরা এই ৯ দফা আচরণবিধি ঠিক মত মানেন কিনা? তার উত্তরে তৎকালীন রাজ্য সভাপতি কী বলেছিলেন, সেটা আমার জানা নেই কিন্তু গোপীনাথ কবিরাজ বলেছিলেন যে এই আচরণবিধির সবকটি মানলে হিমালয়ে গিয়েও কোনও সাধনা করার প্রয়োজন নেই কারণ এই ৯ দফার আচরণবিধি অতি উচ্চস্তরের এক আধ্যাত্মিক অনুশাসন।এই ৯ দফা আচরণবিধির মধ্যে রয়েছে কারুর অসাক্ষাতে তাঁর নিন্দা না করা, নিজের বাড়ি ও তার আশপাশ পরিস্কার রাখা, পরিবারের সকল সদস্যদের একত্র করে সপ্তাহে একদিন ভজন করা। নিয়মিত ধর্মগ্রন্থ পাঠ ইত্যাদি। মহামোহপাধ্যায় গোপীনাথ কবিরাজের প্রসঙ্গ যখন উঠল, তখন আরও একটি ঘটনার কথা না বলে পারছিনা।

সত্য সাই মন্দির হাঢসি, পুনা ও আনন্দভিলা, শিমলা

একবার বিশিষ্ট লেখক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় বেনারসে আনন্দময়ী মায়ের আশ্রমে গোপীনাথ কবিরাজের দর্শনে গিয়েছিলেন। সঙ্গে ছিলেন তাঁর এক বন্ধু। সেই সময় গোপীনাথজি ক্যানসার রোগে আক্রান্ত। কিন্তু উচ্চমার্গের সেই সাধক শরীর এবং রোগ-ব্যাধি সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন। কাশীতে তখন ভীষণ গরম। তাঁদের ঘরে সেই সময় পাখাও চলছেনা। ঘরে উপস্থিত ছিলেন আরও একটি তরুণী। সেই মেয়েটি তখন শৈব সাধনার উপর একটি থিসিস লিখছিল আর কবিরাজমশাই তাকে সেই বিষয় গাইড করছিলেন| সেই সব বিষয় কথা হচ্ছিল আর গোপীনাথজি গরমের ফলে বেশি ঘেমে উঠলে সেই তরুণী মাতৃস্নেহে একটা তোয়ালে দিয়ে তাঁর পিঠের ঘাম মুছিয়ে দিচ্ছিল। মাটিতে বসে সঞ্জীববাবু আর তাঁর বন্ধু। সকলেই প্রায় নীরব। এরই মধ্যে শোনা গেল একটা খস খস শব্দ আর আলোর ঝলকানি। মুহূর্তে দেখা গেল একটা লাল আলখাল্লা পরীহিত একজন ঘরে প্রবেশ করলেন। তাঁর মাথায় একরাশ চুলের বলয়। তিনি এসে গোপীনাথ কবিরাজের কপালে একটি চুম্বন করে তাঁর দুই হাঁটুতে চাপড় মারলেন। এরপর যেমন এসেছিলেন, তেমনই চলে গেলেন।

ভারতীয় ডাক বিভাগ থেকে প্রকাশিত ডাকটিকিট ও প্রথমদিবসীয় খাম

সঞ্জীববাবু অবাক হয়ে পুরো ঘটনাটা প্রত্যক্ষ করে গোপীনাথজিকে জিজ্ঞেসা করেছিলেন, ‘যিনি এসেছিলেন, তিনি কে?’ কবিরাজমশাই বলেছিলেন, ‘চিনতে পারলেন না? উনি সাইবাবা’| সঞ্জীববাবু তাঁর উত্তরে বলেছিলেন, ‘উনি তো পুট্টাপর্ত্তিতে থাকেন। তাহলে উনি কি এখন কাশিতে এসেছেন? সেই কথার উত্তরে আবার গোপীনাথজি বলেছিলেন, ‘আমার ধারণা তুমি যাঁকে দেখলে, তিনি এখন লৌকিক শরীর নিয়ে দক্ষিণ ভারতেই বিরাজ করছেন। অলৌকিক শরীরে আমাকে দেখে গেলেন।’ সঞ্জীববাবু জিজ্ঞেসা করেছিলেন, ‘এই যে পোশাকের শব্দ, সুন্দর গন্ধ, পরিস্কার একজন মানুষ, তাহলে কী দেখলুম, কিছুই না।’ গোপীনাথজি বললেন, ‘তুমি কি তাঁর পায়ের দিকে তাকিয়েছিলে?’ সঞ্জীববাবু না বলাতে উনি বলেছিলেন, ‘তাকালেই দেখতে পেতে ওঁর পা দু’টি ভূমি স্পর্শ করছিল না। বলেছিলেন, তাঁর কৃপা হলে সবই সম্ভব।’ কিন্তু সেই কৃপা পেতে হলে সর্ব জীবে ঈশ্বর দর্শন করতে হবে এবং সম মনোভাব নিয়ে সকলকে ভালোবাসতে হবে।

মহামহোপাধ্যায় গোপীনাথ কবিরাজ

সত্য সাই সেবা সংস্থা কোনও সামরিক সংস্থা নয়। আধ্যাত্মিক সংস্থা। আর বাবা স্বয়ং হচ্ছেন ভালোবাসার প্রতিমূর্তি যা শাশ্বত,যার ক্ষয় নেই। সুতরাং সংস্থায় অনুশাসন এবং নিয়ম রক্ষা করতে হবে মনে ভালোবাসা নিয়ে। পদাধিকার বলে ফতোয়া জারি করে নয়। তাঁর ৯৫ তম জন্মদিনে এই হোক সকল সাইভক্তের অঙ্গিকার।

শ্রী সত্য সাই বাবার মহাসমাধি, সাই কুলবন্ত হল, প্রশান্তিনিলয়ম

 

মনে রাখতে হবে ভগবান বাবা তাঁর দিব্যবাণীর শেষে যে কটি গান গাইতেন, তার মধ্যে অন্যতম ছিল ‘প্রেম মুদিত মন সে কাহো রাম, রাম, রাম’| সুতরাং পরবর্তী অবতারের অপেক্ষায় না থেকে ভালোবাসার চর্চা করলে নিজের মধ্যেই দিব্যত্ব প্রকাশ পাবে। তাঁরই বাণী, তাঁরই কথা, কিছুটা একত্র করার চেষ্টা করেছি। এ তো গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজো। সার্থকতা তখনই, যখন যাঁরা পড়বে তাঁরাও মনন ও চিন্তনের দ্বারা জীবন পরিক্রমায় কর্মের মাধ্যমে সুখ-শান্তি লাভ করে অপরকে সুখ-শান্তিতে সমৃদ্ধ করতে পারবে, মূল সূত্র সেই ভালোবাসা। ‘সবারে বাসরে ভালো, নইলে মনের কালো ঘুচবে না রে।’

 

 

 

 

 

 

Related Articles

Back to top button
Close