fbpx
পশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

দেওয়ালির নানা লোকাপচারে মহার্ঘ্য হয়ে ওঠে শাপলা,শালুক

ভাস্করব্রত পতি, তমলুক: দেওয়ালির আলোর সংসারে প্রদীপ, মোমবাতির সঙ্গে আজও সমান চাহিদা গ্রামবাংলার অতি সাধারণ ফুল শাপলা শালুকের। দেওয়ালি কেন্দ্রীক লোকাপচারের একটি দরকারী উপকরণ এই শালুক। শারদ সংসারে পদ্মফুলের কৌলিন্য থাকলেও শালুক কিন্তু ফেলনা নয়। পদ্মের মতো বড় নয়। তবে পদ্ম যদি ‘শতরূপা’ হয়, শালুক কিন্তু ‘অপরূপা’।

ভাইফোঁটার ভোরে দক্ষিনবঙ্গে গরুপুজো এবং বাঁধনা পরব আয়োজিত হয়। গৃহপালিত গরুর গলায় ঝোলানো হয় শালুকের মালা। এ সময় ‘চাঁদ বাঁধানি’, ‘ধা রে মশা ধা’, ‘শুক বাঁধানি’ আয়োজিত হয়। সব ক্ষেত্রেই গরুপুজোর মুখ্য উপলক্ষ্য। গেরস্থের লোকজন ভোররাতে হলুদ, তেল গরুর শিঙে মাখানোর পাশাপাশি গলায় পরায় শালুক ফুল। অপরদিকে জঙ্গলমহলে বাঁধনা পরবের দ্বিতীয় দিন তথা ‘গরয়া’তে অমাবস্যা শেষ হলেই প্রতিটি বাড়ির একজন করে মদ্দ জোয়ান চাষের কাজে ব্যবহৃত মই, লাঙল, জোয়াল পুজো করেন। এই কৃষিযন্ত্র গুলোতে আড়াআড়িভাবে সিঁদুরের টিপ পরিয়ে শালুক ফুল দিয়ে সুন্দর করে সাজানো হয়।

ফলে এসময় শালুকের চাহিদা হয় খুবই। সব জায়গায় এখন আর শালুক ফোটেনা তেমন। যেসব জমিতে শালুক হতো, সেখানে এখন মাছের ভেড়ি হয়েছে। ফলে এক টাকা পিস হিসেবে কিনতে হচ্ছে অনেককেই। পশ্চিম মেদিনীপুরের তুলনায় পূর্ব মেদিনীপুরে বেশি শালুক হয়। এক শ্রেনীর মানুষ এই সময় তাই শালুক তুলে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে কিছু পয়সা আয় করেন। ইদানিং তাই এই অপাংক্তেয় শালুকও ক্রমশঃ মহার্ঘ্য হয়ে উঠছে। কিন্তু বেশি দামে হলেও ধর্মভীরু বাঙালির কাছে শালুক এখন মারাত্মক নষ্টালজিক উপকরণ।

শালুকের গুরুত্ব কিন্তু অপরিসীম। ‘শালুক চেনে গোপাল ভাঁড়’ প্রবাদটিতো লোকসমাজে আজও বেশ জনপ্রিয়। একসময় মিশরের দেবী ‘ইশতারে’র পুজোয় নীল শালুকের প্রচলন ছিল। ভূমধ্যসাগরীয় দেবী রণরঙ্গিনী ‘ভারগো’ পূজিতা হতেন পদ্মের পাশাপাশি শালুকেও। মাইসেনী সভ্যতার সিংহবাহিনী শক্তির প্রতিক দেবী ‘সিবিলি’র আশীর্বাদী ফুলও এই নীল শালুক। গ্রীক দেবী ‘রিয়া’ও তুষ্ট হতেন পদ্ম এবং শালুকে। রোমান দেবী ‘ওপস’, আফ্রিকার রুদ্রের দেবী ‘তানিতে’র পুজোতেও শালুক লাগতো। কথিত আছে, সর্পদেবী মনসার পুজোতেও এই শাপলা ফুল দেওয়া হয়।

উদ্ভিদবিদ্যার পরিভাষায় শালুকের বিজ্ঞানসম্মত নাম Nymphea lotus। ইংরেজিতে বলে Water Lily। ‘নিমফিয়েসী’ গোত্রের এই ফুল বাংলায় শুঁদিফুল, কুমুদ, মালয়লামে  নিরাম্বল, কন্নড়ে কান্নাইদিলি, অসমীয়াতে নাল, মনিপুরীতে থারো আংগৌবা এবং তামিলে ভেলাম্বাল নামে পরিচিত। গ্রামবাংলায় সাধারণত তিন ধরনের শালুক জন্মায়। সু্ঁদিফুল পরিচিত বানিপুষ্প, হিমাব্জ, নিশাফুল্ব, উৎপল এবং অনুষ্ণ নামে। সাদা শালুককে বলে ইন্দু, কমল, কহ্লার, কৈরব, ধবলোৎপল এবং চন্দ্রাব্জ। এছাড়া নীল শালুক পরিচিত নীলোৎপল, অসিতোৎপল, ইন্দীবর, কুবলয়, উৎপলক নামে। ছোট শালুক পরিচিত নীলোৎপলিনী, কুবলয়িনী, কৈরবিনী, ইন্দিবর, উৎপলিনী, কুমুদ্বতী, চন্দ্রেষ্ঠা নামেও। চট্টগ্রামে বলে অঁলাফুল। প্রাচীন সংস্কৃত, সিংহলী ও পালি ভাষার সাহিত্যে প্রাচীনকাল থেকে কুভালয়া, ইন্ধিয়ারা, নীলুপ্পালা, নীলথপালা, নীলুফুল নামে পাওয়া গেছে যা পবিত্রতা, শ্রেষ্ঠতা, শৃঙ্খলার প্রতীক।

সাদা শাপলা বাংলাদেশের এবং নীল শাপলা শ্রীলঙ্কার ‘জাতীয় ফুল’ হলেও এই শালুক কখনও কৌলিন্য পায়নি সভ্য সমাজে। কিন্তু নানা ধর্মের মানুষের লোকাচারে নানাভাবে জড়িয়ে আছে এই শালুক। সিংহলী বৌদ্ধদের দৃঢ় বিশ্বাস যে, গৌতম বুদ্ধের পায়ের ছাপে পাওয়া ১০৮ টি শুভ চিহ্নের মাঝে একটি ফুল ছিল এই শালুক। গ্রীক দার্শনিক অ্যারিস্টটল ও প্লেটোর এক শিষ্য থিউফ্রাস্টাস বলেছেন, এই উদ্ভিদ প্রায় ৩০০ খৃস্টপূর্বাব্দের প্রাচীন। লোকগানেও পাওয়া যায় শালুকের অস্তিত্ব “শালুক ফুলের লাজ নাই /  রাইতে শালুক ফুটে লো, রাইতে শালুক ফুটে / যাঁর সনে যাঁর ভালোবাসা, সেই তো মজা লুটে লো / বকুল ফুল বকুল ফুল / সোনা দিয়া হাত কেন বান্ধাইলি!”

Related Articles

Back to top button
Close