fbpx
অন্যান্যঅফবিটকলকাতাপশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

শরৎস্মৃতি মন্দির…..

বাংলার সাহিত্যে আজও তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি। তাঁর কলম সর্বসাধারণের মনে জায়গা করে নিয়েছিল। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামেও ছিল তাঁর ভূমিকা। চাকরি সূত্রে রেঙ্গুনে থেকেছেন বহু বছর। ছোটবেলা কেটেছে ভাগলপুরে। কিন্তু কলকাতার সঙ্গে ছিল নিবিড় যোগাযোগ। রূপনারায়ণর কূলে বসে রচনা করেছেন অনেক চরিত্র। বাঙালির হৃদয়কে তিনি কখনও করেছেন দেবদাস, কখনও চরিত্রহীন। কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অনেক কাহিনিই বন্দি হয়েছে সেলুলয়েডে। কলকাতা ছেড়ে ঘণ্টা আড়াই গেলেই রূপনারায়ণের কূলে সান্তাবেড়েতে তাঁর বাড়ি। ১৫ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্মদিন পেরিয়ে এসে আজ সেই বাড়ির খোঁজে।

শরৎচন্দ্রের বাড়ির সদরদরজা।

মনীষা ভট্টাচার্য: আগেকার দিনের কড়ি বরগার ছাদ। বাইরে থেকে দেখলে একটা বেশ জমিদারি আঙ্গিক রয়েছে দোতলা বাড়িটিতে। বর্তমানে বাড়িটিতে ঢুকলেই মনে হবে বাগানবাড়ি। শোনা যায়, ১৯৭৮ সালে বন্যায় ওই অঞ্চলের অনেক বাড়ি পড়ে গেলেও, শরৎচন্দ্রের এই বাড়িটি পড়েনি। বাড়িটির সামনে পৌঁছতেই বাঁদিকে পড়বে ঘাট বাঁধানো পুকুর এবং ডান দিকে পড়বে সবুজে ঢাকা বাড়িটি। বাড়িটিকে ডানদিকে রেখে একটু এগোলে চোখে পড়বে রূপনারায়ণ নদী। বর্তমানে সেই নদীর পাড়ে পিকনিক স্পট তৈরি হয়েছে। তবে নদী তাঁর বিশালতা নিয়ে আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই নদীই এক সময় শরৎচন্দ্রের বাড়ির পাশ দিয়ে বইত। আজ পাড় ভাঙতে ভাঙতে অনেকটাই দূরে চলে গেছে।

শরৎচন্দ্রের লেখার টেবিল।

‘সংসারে যারা শুধু দিলে, কিন্তু পেলে না কিছুই, যারা দূর্বল, উৎপীড়িত, মানুষ হয়েও মানুষ যাদের চোখের জলের কখনও হিসাব নিলনা, নিরুপায় দূঃখময় জীবনে যারা কোনদিন ভেবেই পেলেনা সমস্ত থেকেও কেন তাদের কিছুতেই অধিকার নেই, তাদের বেদনাই দিল আমার মুখ খুলে, তারাই পাঠাল আমাকে মানুষের কাছে মানুষের নালিশ জানাতে।’— বাড়িতে ঢোকার আগে গেটের বাঁদিকের পিলারে রয়েছে শরৎচন্দ্রের এই লেখা। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলে বাঁদিকে রয়েছে কথাসাহিত্যিকের আবক্ষ মূর্তি। সোজা এগিয়ে গেলে কড়ি বরগা চুন সুড়কির টালির ছাদের দোতলা বাড়ি। লাল সিমেন্টের মেঝের নানা মাপের নানা ঘর। লেখার ঘর, শোবার ঘর, বসার ঘর, ঠাকুর ঘর। খুব যত্ন করে তাঁর ব্যবহৃত সব কিছুই সাজিয়ে রাখা আছে এই বাড়িত। কথা হল বংশপরম্পরায় এই বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা দুলাল মান্না ও টুবাই পতির সঙ্গে।

এই সেই বসার ঘর যেখানে বসত গুপ্ত সমিতির মিটিং।

আরও পড়ুন:‘কোটি কোটি ভারতবাসী আজ আপনার দীর্ঘায়ু কামনা করছে’, নমোকে বললেন কঙ্গনা

প্রবীণ দুলাল মান্না বললেন, রেঙ্গুন থেকে ফিরে পৈতৃক এই ভিটেতে শরৎচন্দ্র এসে থাকেন। রূপনারায়ণের সরলতা তাঁকে অনেক কল্পনা দিয়েছে। লেখার টেবিলের সামনে জানলা দিয়ে তখন দেখা যেত এই নদী। তাই হয়তো ‘অভাগীর স্বর্গ’, ‘মহেশ’-এর মতো দারিদ্রে ভরা করুণ গ্রামবাংলার ছবি ফুটে উঠেছিল তাঁর কলমে। দুলালবাবু বললেন, ‘শ্রীকান্ত’ (চতুর্থ পর্ব), ‘বিপ্রদাস’, ‘বামুনের মেয়ে’ সহ আরও বেশ কয়েকটি উপন্যাস শরৎচন্দ্র এই বাড়িতে বসে লিখেছেন। লেখার ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা তাকালে জাল দি্য়ে ঘেরা একটা ঘর দেখতে পাওয়া যায়।

দোতলায় লাল লম্বা বারান্দা।

জানা গেল, ওইখানে ময়ূর পুষতেন কথাসাহিত্যিক। তবে বর্তমানে সেটি ফাঁকা। সরকারি নির্দেশে ময়ূর পোষা এখন বারণ। লেখার ঘরের পাশের ঘরটি বসার ঘর। সেই বসার ঘরে অনেক গুপ্ত সমিতির মিটিং হয়েছে। সান্তাবেড়ের এই বাড়িতে এসেছেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, রাসবিহারী বসু, বিপিনবিহারী গাঙ্গুলী, চিত্তরঞ্জন দাস প্রমুখ। যে লণ্ঠন জ্বেলে হাওড়া জেলা কংগ্রেস কমিটির সভাপতি শরৎচন্দ্র, গুপ্ত সমিতির মিটিং করতেন সেই লণ্ঠনটি সযত্নে রাখা আছে আজও।

১০০ বছরের পুরনো ঘড়ি।

বসার ঘরে আজও গেলে দেখতে পাওয়া যাবে ভাল্ব লাগানো রেডিও, ১০০ বছরের পুরোনো ঘড়ি যা আজও চলে, রয়েছে একটি বুকসেলফ যাতে বই রাখলে সব দিক দিয়েই বইগুলি দেখা যাবে এবং নেওয়াও যাবে। রয়েছে তাঁর ব্যবহৃত বহু বইও। বসার ঘরের পরের ঘরে গেলে দেখা যাবে একটি ছোট চড়কা আর রাধা-কৃষ্ণের মূর্তি যার নিত্য পুজো হয়। ঠাকুরঘরটি ভগ্নপ্রায় বলে এই ঘরে এনে রাখা হয়েছে।

সদর দরজা দিয়ে ঢুকে বাঁ-হাতে সাহিত্যিকের আবক্ষমূর্তি।

আজও বাড়িতে ধানের গোলার ঘরটি আছে। সিড়ি দিয়ে দোতলায় উঠলে রয়েছে শোবার ঘর এবং শরৎচন্দ্রের দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী হিরণ্ময়ী দেবীর ঘর যা তালা বন্ধই থাকে বাইরের অতিথিদের জন্য। টুবাই পতি জানালেন, শরৎচন্দ্র মারা যাওয়ার পর ২৩ বছর বেঁচে ছিলেন তিনি এবং এই বাড়িতেই মারা যান। রেঙ্গুনে থাকতেই তিনি এই দ্বিতীয় বিয়ে করেন।

বাড়ির পিছনের দিকে রয়েছে স্মৃতিসৌধ। লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ১৯৩৮ সালে শরৎচন্দ্রের মৃত্যু হয়। তাঁকে দাহ করা হয় কলকাতার কেওড়াতলায়। সেখান থেকেই কিছু চিতাভস্ম নিয়ে এসে সান্তাবেড়ের বাড়ির পিছনে তৈরি হয়েছে স্মৃতিসৌধ। শুধু তাঁর নয়, সেখানে আছে হিরণ্ময়ী দেবী ও শরৎচন্দ্রের দ্বিতীয় ভাই (বেলুড়মঠের দীক্ষিত সন্ন্যাসী) স্বামী বেদানন্দের সৌধও। কথায় কথায় জানা গেল শরৎচন্দ্রের ছোটভাই প্রকাশচন্দ্রের পৌত্র জয় চট্টোপাধ্যায় বর্তমানে এই বাড়ির দেখাশোনা করেন। সরকারি সাহায্য তেমন নেই। সব চেয়ে আশ্চর্য বিষয় প্রতিটি ঘর থেকেই অন্য ঘরে যাওয়ার রাস্তা রয়েছে। বাড়িটির চারদিকে বারান্দা, আর মাঝখানে ঘর। বাইরে রয়েছে নানা সবুজের আহ্বান। রয়েছে খিড়কির দরজাও।

স্মৃতিসৌধ।

আরও পড়ুন: ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের

এই বাড়ি ঘুরতে ঘুরতে নানা শরৎচরিত্র আপনার চোখের সামনে ভেসে উঠতে পারে আর কী জানি মন বলে উঠতেও পারে গ্রামবাংলার মানুষের জীবন এত কাছ থেকে দেখেছেন বলেই হয়তো তাঁর কলম অত সজীব। তাঁর প্রেম, তাঁর কষ্ট, তাঁর কুসংস্কার, তাঁর মানসিকতা কোথাও এতটুকু বানিয়ে তোলা নয়। সবটাই সত্যি।

চারিদিক খোলা বুক শেলফ

বাড়ির প্রতিটি ঘর দেখে গেট দিয়ে বেরিয়ে বাঁদিকে তাকালে পিলারের ফলকে চোখে পড়বে ‘আল্লা, আমাকে যত খুশি সাজা দিয়ো, কিন্তু মহেশ আমার তেষ্টা নিয়ে মরেছে, তার চরে খাবার এতটুকু জমি কেউ রাখেনি, যে তোমার দেওয়া মাঠের ঘাস, তোমার দেওয়া তেষ্টার জল তাকে খেতে দেয়নি, তার কসুর তুমি যে কখনও মাপ করোনা। মহেশ।’

আদিগন্ত বিস্তৃত রূপনারায়ণ।

পুনরায় গেটের সামনে দাঁড়ালাম। দুটির পিলারের দুটি ফলকই পুনরায় পড়লাম। পড়তে মনে হল, প্রতিটি ছত্র আজও কী ভয়ঙ্কর প্রাসঙ্গিক। ফিরে আসতে আসতে মনে হল, কেমন করে লিখতেন এমন সত্য কথা যা যুগান্তরেও ভীষণভাবে সত্য হয়ে থাকে?

Related Articles

Back to top button
Close