fbpx
অসমগুরুত্বপূর্ণহেডলাইন

নিজস্ব গরিমায় ঐতিহ্য বহন করে চলেছে শিলচরের টাউন ক্লাব

তাজ উদ্দিন, শিলচর: আমাদের বরাক উপত্যকা আজও গ্রাম প্রধান। ৬৫ বছর আগে গ্রামের মানচিত্রে আরও বেশি অংশ ছিল। গ্রামীণ প্রতিভাগুলিকে তুলে আনার জন্য সেই সময় অবিভক্ত কাছাড় জেলায় ২১২ টি দলকে নিয়ে ফুটবল প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল শিলচরের টাউন ক্লাব। যে সময় উপত্যকার যোগাযোগ ব্যবস্থা একেবারে শোচনীয় ছিল, সেই সময় এমন একটা আয়োজন স্বাভাবিকভাবে দারুণ সাড়া ফেলে। ওই আসর থেকে পরবর্তী কালের জন্য অনেক ফুটবলার উঠে আসেন।

টাউন ক্লাবের জন্ম কথা জানার জন্য অনেকের আগ্রহ রয়েছে। এই ক্লাবটির স্থপতি হিসেবে পরিচিত রয়েছেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় জিতেন্দ্র চন্দ্র দাসগুপ্ত ওরফে বাটুদা। ১৯৪০ সালে শহরের সেন্ট্রাল রোডে দাশগুপ্ত ব্রাদার্সের কাঠের দোতলায় অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে টাউন ক্লাবের জন্ম হয়। ক্লাবটির প্রথম সভাপতি ছিলেন রংপুরের জমিদার শ্রীস চন্দ্র দেব। সচিবের দায়িত্ব নেন বাটুদা স্বয়ং। এছাড়া রমেশ ভট্টাচার্য নলিনী কুমার পাল, ঋষিকেশ মিত্র, বিনয় কুমার গাঙ্গুলি প্রমুখ ক্লাব গঠনে অগ্রণী ভূমিকা নেন।

১৯৪১ সালে আগরতলায় পদ্মজং ট্রফি ফুটবলে রানার্স হয়ে ফেরে নবাগত টাউন ক্লাব। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে ওঠায় ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত ক্লাবের কর্মকাণ্ড একেবারে সীমিত ছিল। সেই সময় তারা সেনাদের সঙ্গে বেশ কিছু প্রীতি ম্যাচ খেলেছে। ১৯৪৪-৪৫ মরশুমে রমন মেমোরিয়াল লিগ এবং সুশীলা সুন্দরী বক্সী চ্যালেঞ্জ শিল্ডে চ্যাম্পিয়ন হয় টাউন ক্লাব।

১৯৪৬ সালে আসে ঘরে-বাইরে সাফল্য। রমন মেমোরিয়ালের পাশাপাশি পদ্মজং ট্রফিতেও খেলতে যায় তারা। সাফল্যে থাকার সুবাদে ১৯৪৭-৪৮-এ সরকারের তরফ থেকে টাউন ক্লাবকে বর্তমান মাঠটি বরাদ্দ করা হয়। এতে তাদের তৎপরতা আরও বাড়ে। ১৯৪৯ সালে কলকাতায় আইএফএ শিল্ডে অংশ নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলে টাউন ক্লাব। শিলচরে ফুটবলে রমন মেমোরিয়াল এবং ক্রিকেটে ডায়মন্ড জুবিলি শিল্ডে সেবার তারা চ্যাম্পিয়ন হয়। একই বছর (১৯৪৯) বরিষ্ঠ কর্মকর্তা টুকু ব্যানার্জির উদ্যোগে প্রথমবার অ্যাথলেটিক্স মিট আয়োজন করে টাউন ক্লাব।

সম্পাদক বাটুবাবু এবং যুগ্ম সম্পাদক বি কে গাঙ্গুলির পরিশ্রমের সুবাদে ক্লাব হাউসের বর্তমান জায়গাটি সেই সময় বরাদ্দ হয়। ১৯৫৪ সালে এই ক্লাব ভবন চালু হয়।

শিলচর ডি এস এ-র প্রতিষ্ঠালগ্নে (১৯৫৭ সালে) টাউন ক্লাবও এর সদস্য হয়। পরের বছর একসঙ্গে ডি এস এ-র তিনটি লিগ ও শিল্ড জিতে নেয় তারা। ১৯৬০-এ টাউন ক্লাবের পক্ষ থেকে আয়োজন করা হয় স্পোর্টস অ্যান্ড কালচারাল মিট। ইন্ডোর, আউটডোর, ফিজিক্যাল ফেস্ট এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান– এমন পাঁচমেশালি আয়োজন অসমে এটাই ছিল সম্ভবত প্রথম। ৫১টি বিভাগে মোট ৬১৫ জন প্রতিযোগী সেবার অংশগ্রহণ করেছিলেন। আর, ‘৫৫-র গ্রামীণ ফুটবলের কথা তো আগেই উল্লেখ করেছি।

১৯৭০ সালে দ্বিতল ভবনের শিলান্যাস করা হয়। কিন্তু এর প্রথম তলার কাজ শেষ করতেই লেগে যায় দীর্ঘ আট বছর। ১৯৭৮ এবং ১৯৮০ সালে টাউন ক্লাব মোটরসাইকেল এবং সাইকেল রেলি ও রেসের আয়োজন করে। ১৯৮১-তে সামসুল হক বড়ভুঁইয়ার তত্ত্বাবধানে সোনাইয়ে তারা ভলিবল কোচিং শিবিরের আয়োজন করে।

১৯৮৮-তে শিলচরে প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগে চ্যাম্পিয়ন হয় টাউন ক্লাব। করিমগঞ্জে রাধাকিষেণ জৈন ট্রফি ফুটবল এবং বদরপুরে অতীন দত্ত ট্রফি ফুটবলেও দুরন্ত পারফরম্যান্স করে তারা। ১৯৮৯ সালে বরাক উপত্যকায় প্রথমবারের মতো পেয়ার কনটেস্টের গর্বিত আয়োজকও টাউন ক্লাব। পরের বছর ক্লাবটি তাদের সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করে। সেবার তারা বরাক উপত্যকা ভিত্তিক দাবা প্রতিযোগিতা আয়োজন করেছিল।

বলতে গেলে বরাকের দাবা ও ব্রিজ দীর্ঘদিন ক্লাবের হাত ধরেই টিকেছিল। সুবর্ণ জয়ন্তী বর্ষে বরাক উপত্যকায় প্রথমবারের মতো স্পোর্টস ক্যুইজ আয়োজনের কৃতিত্বও নিজেদের নামে করে নেয় টাউন ক্লাব।

২৯৯৮ এবং ১৯৯৯ সালে শিলচর ডিএসএ-র ভলিবল টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয় টাউন ক্লাব। এছাড়া ২০০০ সালে তারা ইন্ডিয়া ক্লাবের শতবার্ষিকী উৎসবের ফাইভ এ সাইড ফুটবলের খেতাব জেতে।

২০০০ সালে ডায়মন্ড জুবিলি এবং ২০১৭-তে প্ল্যাটিনাম জুবিলি পালন করে ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটি। সাফল্য ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে তারা। প্রতিবছর নিয়ম করে ২৩ ডিসেম্বর বার্ষিক ক্রীড়া শুরু হয় ক্লাবে। সেদিন ভোরে থাকে প্রবীণদের হাঁটা প্রতিযোগিতা। এছাড়া নিয়মিত গ্রীষ্মকালীন আয়োজন করে থাকে ক্লাবটি। খেলাধুলার আয়োজনে ধারাবাহিকতার দিক থেকে এগিয়ে থাকা ক্লাবটিকে আরও বেশি বেশি দায়িত্ব নিতে হবে। কারণ, তাদের দিকেই তাকিয়ে থাকে শিলচরের ক্রীড়ামহল।

ক্লাবটি অবশ্য দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করে যাচ্ছে। স্থানীয় ফুটবলার তুলে আনার জন্য ২০১৯ সালে তারা কাছাড়ের বিভিন্ন জায়গায় শিবিরের আয়োজন করে। সেখান থেকে বাসায় করা ফুটবলারদের নিয়ে শিলচরে চূড়ান্ত শিবির হয়। এর ফলে কয়েকজন নতুন খেলোয়াড় স্থানীয় লিগে বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে খেলার সুযোগ পান।

শিলচরের ডার্বি ম্যাচের একটি দল টাউন ক্লাব। তাদের সঙ্গে ইন্ডিয়া ক্লাবের ম্যাচ দেখতে এক সময় মাঠে উপচে পড়া ভিড় দেখা যেত। যদিও টেলিভিশনের জমানায় স্থানীয় ম্যাচগুলি দর্শকদের আর আকর্ষিত করে না।

টাউন ক্লাবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল সোনাই এলাকার প্রাক্তন খেলোয়াড় প্রয়াত সামসুল হক বড়ভুঁইয়া ওরফে ময়না মিঁয়ার। এই ময়না মিয়ার পাস থেকে ১৯৭৪ সালে আন্তঃজেলা সিনিয়র ফুটবলের ফাইনালে গোলাঘাটের বিরুদ্ধে একমাত্র গোলটি করেছিলেন কৃষ্ণ বাহাদুর ছেত্রী। সেই একবারই চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল শিলচর। ময়না মিঁয়ার আরেকটি রেকর্ড হল ১৯৯৪ সালে তিনি জাকার্তায় ভেটরন এশিয়ান অ্যাথলেটিক্সে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৯৫ সালে একই ক্লাবের বিকাশ দাস সন্তোষ ট্রফিতে অসম দলে ছিলেন।

টাউন ক্লাবের প্রবাদ পুরুষ বাটুদা ১৯৯৮ সালের ১৫ মার্চ পরলোক গমন করেন। তবে তাঁকে আদর্শ করে তাঁর উত্তরসূরিরা এখনও ক্লাবের পতাকা উঁচুতে ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

Related Articles

Back to top button
Close