fbpx
অন্যান্যঅফবিটহেডলাইন

‘পরিযায়ী’ প্রসঙ্গে প্রকৃষ্ট পরিস্ফুটন

ভাস্করব্রত পতি, তমলুক : ‘হতে যদি তুমি কোনো / পরিযায়ী পাখি / করতে হোতোনা তোমায় / এমন ডাকাডাকি / এক শীতের বিরহের পরে / আসতে তুমি আবার ফিরে / পুরোনো সেই ঠিকানায় / আমার হৃদয়ের বাসায়’ — এ কবিতা কবি কবি বলরাম সরকারের। তাঁর ‘হতে যদি পরিযায়ী পাখি’তে তিনি লিখেছেন এই প্রেমমাখা আর্তি। প্রেমিকা যদি পরিযায়ী হোতো, তবে হৃদয়ের প্রকোষ্ঠটা ফাঁকা পড়ে থাকতোনা।

আজ সারা ভারত জুড়ে এই ‘পরিযায়ী’ শব্দ নিয়েই তোলপাড়। রাজনীতির আবর্তে মাখামাখি এই শব্দটির উৎস সন্ধানে গেলে মিলবে অনেক কিছুই। শুধু মানুষ নয়, এই পরিযায়ীর দলে পাখি, মাছ, কচ্ছপ থেকে নানা স্তন্যপায়ীও পড়বে। পাখি এবং মাছের ক্ষেত্রে ঋতু পরিবর্তন অনুযায়ী আসা যাওয়া করা বা নিয়মিত এখানে ওখানে বেড়ানোর জন্য তারাও পরিযায়ী। আর মানুষের ক্ষেত্রে কাজের প্রয়োজনে বসত ঢিপা ছেড়ে দূরদূরান্তে গিয়ে বসবাস করলে বসত এলাকার মানুষের চোখে তাঁরা পরিযায়ী।

‘পরিযায়ী’ হলো বিশেষণ শব্দ। ‘পরিযায়ী’ অর্থে ক্রমাগত যাতায়াতকারী বোঝায়। অর্থাৎ ভ্রমনশীল মানুষ। অর্থাৎ যিনি বসবাসের জন্য ভিনদেশে গমন করেন। ইংরেজিতে বলে Migratory। অর্থাৎ বসবাসের উদ্দেশ্যে দেশান্তরী হওয়া। ‘প্রব্রজনকারী’, ‘অভিপ্রয়াণীয়’ বা ‘প্রচরণকারী’ অর্থেও ‘পরিযায়ী’ বোঝায়। ‘প্রচর’ অর্থে গমন বা প্রয়াণ বোঝায়। অর্থাৎ সম্পৃক্ত হয়ে যাওয়া বোঝায়। কাশিদাসী মহাভারতে পাই ‘পাপের প্রসঙ্গ নাহি ধর্ম্মে প্রচরিল’।

‘পরি’ একটি উপসর্গবিশেষ। যার অর্থ চতুর্দিক,  সমন্তাৎ বা ব্যাপ্তী। আর ‘যায়ি’ বা ‘যায়ী’ হোলো বিশেষণ শব্দ (√যা + ইন্ )। স্ত্রীলিঙ্গতে ‘য়িনী’। ‘যায়ী’ অর্থে গামী। মহাভারতে আছে ‘বীরেণ পৃষ্ঠতো যায়িনা’। রামায়ণে আছে ‘যায়িন্যা ধ্বজিন্যা’। সমাসে উত্তরপদ হিসেবে ‘যায়ী’ অর্থে চলিষ্ণু বা চলনশীল বোঝায়। যায়ী + ইন্ ( ভবিষ্যদর্থে) হয় ‘গামী’। রঘুবংশে পাই ‘ভর্ত্তুঃসংগ্রামযায়িনঃ’। এবার ‘পরি’ এবং ‘যায়ী’ যুক্ত হয়ে হয়েছে ‘পরিযায়ী’। অর্থাৎ চতুর্দিকে গমনকারী। এই ‘পরি’ উপসর্গ যোগে এসেছে পরিক্রমা , পরিব্রজ্যা ইত্যাদি।

‘যা’ অর্থে গতি বোঝায়। রামায়ণে পাই ‘যাবদস্তং ন যাত্যেষ কৃতকর্ম্মা দিবাকরঃ’। সংস্কৃত ‘যা’ থেকে এসেছে শব্দটি। গমন করা। কৃত্তিবাসী রামায়ণে আছে ‘আজ্ঞা কর মাতা আজি আমি যাই বন’। এছাড়া এই ‘যা’ অর্থে হাঁটা, চলা, যাত্রা করা, অগ্রসর হওয়া, ঢোকা, প্রবেশ করাও বোঝায়। রামায়ণে আছে ‘কোন পথে যাই বল শ্রীরাম লক্ষ্মণ’। এই ‘যা’ এবং ‘যায়ী’ দুটিই প্রায় একই অর্থ বহন করে। শুধু অর্থের বিস্তার ঘটেছে। ‘যা’ থেকে এসেছে যাওন বা যাওয়া। সেই একই অর্থ। গমন বা যাত্রা বা প্রস্থান। রামপ্রসাদ সেন তাঁর ‘বিদ্যাসুন্দর’ এ লিখেছেন ‘না যাওন ভালো নহে কাজ’।

আর একটি শব্দ ‘পরিযান’ এর অর্থ বুঝলে বিষয়টা অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে যাবে। ‘পরিযাণ’ একটি বিশেষ্য শব্দ। মাল বা যাত্রীর যাতায়াতকে বলা হয়। Traffic শব্দও ব্যবহার করা যায়। অর্থাৎ বসবাসের জন্য ভিন্ন দেশে গমন বা Migration। ‘যান’ অর্থে গমন বা চলন বা পাদচার বোঝায়। এখান থেকে এসেছে ‘যানবাহন’ কথাটি। রামায়ণে আছে ‘যানৈশ্চ শকটৈশ্চ’। ‘পরিযানব্যবস্থাপক’ হলেন তিনি, যিনি পরিযানের বন্দোবস্ত করার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক। অর্থাৎ Traffic Manager। সংস্কৃত পরি + √যা + অন ( ভাববাচ্যে , কৃদন্ত শব্দ )।

আজ কারা ‘পরিযায়ী’, তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। পরিযায়ী পাখিতেই সীমাবদ্ধ ছিলো আমাদের জ্ঞানের দৌড়। কোরোনা এনে দিয়েছে পরিযায়ীদের প্রকৃষ্ট পরিস্ফুটন। সেইসাথে সমোচ্চারিত হচ্ছে ‘মাইগ্র্যান্ট লেবার’, ‘রিভার্স মাইগ্রেশন’, ‘উইপোকা’, ‘রিফিউজি’ শব্দগুলোও। সবই একই অর্থ। আজ দেশজুড়ে পরিযায়ীদের কঙ্কালসার দেহরূপ প্রকাশিত। তাঁরা ফিরে এসেছে নীড়ে। যেখানে তাঁদের দুবেলা দুমুঠো খাওয়ার ক্ষমতা নেই। স্রেফ পেটের জন্য তাঁরা হয়েছিল পরিযায়ী। নিজের কার্যভূমির পাশাপাশি জন্মভূমিতেও আজ তাঁরা অপাংক্তেয়। কবি তাপস মাইতির কবিতায় ‘আলোবেলা ডুবেছে / জ্বলেনা প্রদীপ / মরে যায় একাকী / পরিযায়ী শ্রমিক’।

Related Articles

Back to top button
Close