fbpx
অন্যান্যঅফবিটগুরুত্বপূর্ণদেশহেডলাইন

একক মাতৃত্ব ও গণপতি

মনীষা ভট্টাচার্য: আচ্ছা মাসের কোনও লিঙ্গ আছে? না মানে ঋতুর যখন পুংলিঙ্গ- স্ত্রীলিঙ্গ আছে তখন নিশ্চয়ই মাসেরও আছে, থাকা উচিত।  বিতর্কে না গিয়ে বরং আছে ধরে নিয়েই এগোনও যাক। শ্রাবণ মাস আমার কাছে নারী। ‘এই শ্রাবণের বুকের ভিতর আগুন আছে, সেই আগুনের কালোরূপ যে আমার চোখের ’পরে নাচে…’।  আজ সকাল থেকে এই গানটা গুনগুন করছে মন। তাই প্রশ্নটা মাথায় এল।  দূরে মন্দিরে বাজছে ‘বক্রতুণ্ড মহাকায়া’-গণেশ বন্দনা।  গতকাল গেছে গণেশ চতুর্থী। কেউ দেড়দিন, কেউ তিনদিন, কেউ দশদিন, আবার কেউ কেউ একুশ দিন ধরেও গণেশ পুজো করেন।  মা পার্বতীর একক সন্তান গণেশ। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে দুটি রায়ের কথা। একটা তো এই মাসেই দেওয়া হয়েছে, আরেকটি বেশ কয়েক বছর আগের।

মা পার্বতী ও গণেশ

মেয়েদের সব কিছুই লড়াই করে জিতে নিতে হয়, সহজে কিছু তারা পায় না। তাই তাদের সকল জয়ই ঐতিহাসিক হয়ে যায়। সম্প্রতি দেশের শীর্ষ আদালত রায় দিয়েছে বাবার সম্পত্তিতে মেয়ের অধিকার আছে। সুপ্রিম কোর্টের তিন বিচারপতির বেঞ্চ জানিয়েছে, ২০০৫ সালে হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের ৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী পৈতৃক সম্পত্তিতে মেয়েদের সমানাধিকার আছে। বিচারপতি অরুণ মিশ্র বলেন,  মেয়ে সারাজীবন বাবা -মায়ের আদরের মেয়ে হয়েই থাকেন। কিন্তু সম্পত্তির মালিক বেঁচে থাকুক আর নাই  থাকুক, সেই সম্পত্তির উপর মেয়ের সারাজীবন অধিকার থাকবেই। এই রায় শোনার পর যে প্রশ্ন জেগেছিল তা হল এবার কি তাহলে কন্যাপণ বন্ধ হবে? উত্তরে কে যেন বলল, এতদিনের অভ্যেস কার্যকরী হতে সময় লাগবে…। ঠিক। সময় লাগবে। আশায় বাঁচুক চাষা।

স্মৃতি যদি অসহযোগিতা না করে তাহলে একক মাতৃত্বের রায় বেরিয়েছিল ২০১৫ সালের রথযাত্রার আশে-পাশে। মনে আছে সর্বোচ্চ আদালতে বিক্রমজিৎ সেনের এই রায়ের পর অনেকেই সাধুবাদ জানিয়েছিলেন, অনেকেই আবার হায় হায় করেছিলেন। এই পাঁচ বছরে একক মাতৃত্ব নিয়ে অনেক খবরই শোনা গেছে। পাশাপাশি একক পিতৃত্বের কিছু নজির উঠে এসেছে। আজ এই গণেশ চতুর্থীর পরের দিন একক মাতৃত্ব নিয়ে দু’লাইন লেখার আগে জানাতে চাই গণেশের জন্মবৃত্তান্ত।

সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়

পুরাণ মতে, মা পার্বতীর একান্ত ইচ্ছে থেকে জন্ম নিয়েছিল এক পুত্র। আসলে পার্বতী চেয়েছিলেন তাঁর নিজস্ব এক সন্তান। তাই নিজের গায়ের ময়লা দিয়ে তিনি তৈরি করলেন গণেশকে। শোনা যায়, গণেশের জন্মের পর তাকে দেখতে শনিদেব গিয়েছিলেন। অর্থাৎ শনির দৃষ্টি পড়েছিল গণেশের ওপর। এরপর একদিন পার্বতী গণেশকে দ্বাররক্ষী করে স্নান করতে গেলেন। সেই সময় শিব এলেন। গণেশ বাধা দিলেন। অনেক তর্ক-বিতর্ক-যুদ্ধের পরে শিবের চণ্ডাল রাগে গণেশের মাথা ত্রিশূলের দ্বারা ধরাশায়ী হল। পার্বতী এসে সেই কাণ্ড দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। এখানে প্রশ্ন আসে শিব কি জানতেন না গণেশ পার্বতীর সন্তান? তিনি তো অন্তরযামী! নাকি পিতৃতান্ত্রিকতার আগ্রাসী ক্ষমতার আস্ফালন? একক মাতৃত্বকে অস্বীকার করতে চাওয়া? এতই বিরোধ যে সন্তানকে মেরে ফেলতে হাত কাঁপে না। যাইহোক, এরপর বিষ্ণুর আদেশে উত্তর দিকে শুয়ে থাকা হাতির মাথা এনে গণেশকে পুনর্জীবন দেওয়া হয় এবং সেই থেকে পার্বতীর চাওয়াকে মান্যতা দিতে, বিষ্ণুর আদেশে সকল পুজোর আগে গণেশপুজোর বিধিও শুরু হয়। সেই পুরাণকাল থেকে নিজের সন্তানের জন্য মা পার্বতীর এই যে লড়াই, তা আজও বর্তমান।

একক মাতৃত্ব এখন আইনত স্বীকৃত

শুধু পার্বতী নয়, প্রসঙ্গত মনে পড়ছে মহাভারতের একক মায়েদের কথা। মহাভারতে কানীন সন্তান ছিল, তাদেরকেও সামাজিক নিপীড়ন সহ্য করতে হয়েছে, কিন্তু সমাজ তাদের ব্রাত্য করতে পারেনি। কুমারী মা কুন্তির পুত্র কর্ণ সমাজের অন্যতম বীর শ্রেষ্ঠ বলেই পরিচিত আজও।  হঠাৎ হাওয়ায় ভেসে আসা ধন চিত্রাঙ্গদার জীবনে অর্জুন দিয়েছিলেন বভ্রুবাহনকে। রামায়ণে সীতাও একক মাতৃ্ত্বই যাপন করেছেন।  লব-কুশ বাল্মিকীর আশ্রমেই বড় হয়েছেন। এমনকী শকুন্তলার ভরত তিনিও একক মাতৃ আদরেই বড় হয়েছেন। তবু আজও সমাজ একক মাতৃত্বের এই রায়ের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারল না। কিন্তু…। এই কিন্তুর উল্টোপিঠে রয়েছে আশার আলো।

তিব্বত সীমান্তের কাছে, চিনের ইয়ুনান ও সিচুয়ান প্রদেশে এক প্রাচীন জাতিগোষ্ঠী বসবাস করে যারা শত শত বছর ধরে এইএকক মাতৃত্বের অধিকারকেই প্রাধান্য দিয়ে আসছে। বলা ভালো, একক মাতৃত্বই এই জাতিগোষ্ঠীর অন্যতম সামাজিক রীতি। মোসুও উপজাতি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৭০০ কিলোমিটার উচ্চতায় লুগুর হ্রদের পাড়েই প্রায় ৪০ হাজার মোসুও উপজাতি মানুষ বসবাস করেন। এরা সম্ভবত মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার অন্যতম সেরা দৃষ্টান্ত। চিনে সরকারিভাবে এই জাতিটিকে ‘নাক্সি’ বা ‘নাখি’ সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসাবে ঘোষণা করা হয়। প্রতিটি পরিবার এখানে নিজস্ব পৃথক পৃথক বাড়িতে বসবাস করে এবং প্রত্যেকটি পরিবারের প্রধান এখানে একজন মহিলা।  বংশানুক্রমিকভাবে এই মহিলারাই পরিবারের প্রধান হওয়ার দাবিদার হন এবং সম্পত্তির অধিকারী হয়ে থাকেন। এই মহিলারা পরিবার, ব্যবসা এবং গোষ্ঠীর প্রশাসনিক দায়িত্ব, সব সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। এই সম্প্রদায়ের শিশুরা মায়ের কাছে মায়ের পরিচয়েই বড় হয়।

মোসুও উপজাতির আগামী প্রজন্ম বড় হচ্ছে মাতৃ পরিচয়ে

মোসুও উপজাতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, এদের বিবাহরীতি। মোসুও মেয়েরা যখন তেরো বছর বয়সী হয়, তখন তারা নিজেরাই নিজেদের পছন্দের পুরুষ সঙ্গী নির্বাচন করতে পারেন। পুরুষ সঙ্গীটি মেয়ের ইচ্ছানুযায়ী, মেয়ের বাড়িতেই এক বা একাধিকবার রাত্রিযাপন করেন। আর সকাল হলেই যে যার নিজের বাড়িতে ফিরে যান। যে ঘরে পাত্র-পাত্রী রাত্রিযাপন করেন, মিলিত হন, সেই ঘরটিকে ‘ফ্লাওয়ার রুম’ বলা হয়। মোসুও উপজাতিদের মধ্যে এমন ভাবেই চলে দু’জনের সম্পর্ক, যত দিন পর্যন্ত ওই নির্বাচিত পুরুষ সঙ্গীটিকে ওই নারীটির পছন্দ। কেউই কারও উপর কোনও জোর খাটান না। একজন মোসুও মহিলা তাঁর সম্পূর্ণ জীবনকালে এভাবেই একাধিক পুরুষ সঙ্গী নির্বাচন করে থাকেন বা করতে পারেন। কোনও  মোসুও মহিলা গর্ভবতী হলে, তার সন্তানের পিতৃ পরিচয়ের কোনও প্রয়োজন হয় না। শিশুটি বেড়ে ওঠে তার মায়ের কাছেই, মায়ের বাড়িতেই। একবার ভাবুন তো, এই উপজাতি কতটা এগিয়ে! আমরা এইসব তথ্য জানতে চাই না, জানলেও জানাতে চাই না। বর্তমান পরিস্থিতিতে জানলে ও জানালে করোনা হওয়ায় সম্ভাবনা নেই এইটুকু বলতে পারি।

যাই হোক। Feudalism-র বিরুদ্ধে এই আইন খুবই কার্যকরী আঘাত এনেছে তা অনস্বীকার্য। নারী পুরুষের লড়াইটা চিরকালীন। একক মানুষ হিসেবে সম্মান নেই বলেই লড়াইটা চলবে পৃথিবী যতদিন থাকবে। হাতে হাত রেখে, পায়ে পা মিলিয়ে চলতে পারতাম আমরা, কিন্তু হল না। সত্যি কি হল না? একটা উপজাতি যদি পারে তাহলে বাকি আমরা পারি না কেন? উত্তর কোন ধাঁধাঁর অন্তরালে জানা নেই। তবে শ্রাবণের বুকের ওই আগুন বলছে যদিদং হৃদয়ং মম-র মাঝে যারা সুখী এবং খুশি তাদের জন্য অনাদি অতীত থাক, কিন্তু যারা তথাকথিত স্রোতের বিপরীতে, তারা চলুক তাদের মতে। পৃথিবীর সব কানীন সন্তানের জন্য তার মায়েরা লড়েছেন,ভবিষ্যতেও লড়বেন। এই আইন যদি সেই লড়াইয়ে সহযোগী হয় তবে ক্ষতি কি?

 

 

 

 

 

 

 

Related Articles

Back to top button
Close