fbpx
অন্যান্যপশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

নিয়নের আলোয় হারিয়ে যাচ্ছে ‘আকাশপ্রদীপ’

ভাস্করব্রত পতি, তমলুক : আজ আর তেমন চোখে পড়ে না আকাশপ্রদীপ দেওয়ার রেওয়াজ। নিয়ন আলো আর রঙ-বেরঙের এল ই ডি আলোর চোখ ধাঁধানো রোশনাইতে হারিয়ে গিয়েছে প্রাচীন এইসব রীতিনীতিগুলো। গ্রামবাংলায় কার্তিক মাস জুড়ে আকাশপ্রদীপ বা আকাশদীপ বা স্বর্গবাতি দেওয়ার রীতি চলে আসছে প্রাচীনকাল থেকেই। সৌর কার্তিক মাস হোলো এই আলো জ্বেলে রাখার মাস।

আশ্বিনের সংক্রান্তি থেকে কার্তিকের সংক্রান্তি পর্যন্ত একমাস ধরে প্রতি সন্ধ্যায় এই আকাশপ্রদীপ দেওয়ার রীতি এখনও দেখা যায়। পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত সাহড়দা গ্রামে আজও গোপাল মেট্যা, প্রশান্ত ত্রিপাঠিদের মতো কিছু মানুষ টিমটিম করে বাঁচিয়ে রেখেছেন এই লুপ্তপ্রায় প্রথাটিকে। মানুষের বিশ্বাস, এই আকাশবাতি অমঙ্গল এবং অতিপ্রাকৃত দুষ্ট শক্তিকে প্রতিহত করে থাকে।

                        আরও পড়ুন: নিরীহ মহিলার মুণ্ডুছেদ করে কি ইসলাম বাঁচবে ?

সন্ধ্যের মুখে একটি লম্বা বাঁশের আগায় রাতভর একটি প্রদীপ বা লন্ঠন জ্বেলে রাখা হয়। মূলতঃ কেরোসিন বা রেঢ়ির তেলে জ্বালানো হয় এই প্রদীপ। কোথাও কোথাও নতুন কেনা মাটির হাঁড়ির মধ্যে প্রদীপ জ্বেলে দড়ি বেঁধে তা বাঁশের উপরে তুলে দেওয়া হয়। ঐ হাঁড়িটি বিশেষভাবে তৈরি করতে হয় কুমোরকে দিয়ে। হাঁড়ির ওপরের দিকে গায়ে বায়ু চলাচলের জন্য অনেক ছিদ্র রাখা হয়। আর একটা নতুন মাটির সরা চাপা দেওয়া হয় হাঁড়ির মুখে। মুখ খোলাও রাখেন অনেকেই।

     আরও পড়ুন: ভয়াবহ আগুন লাগল সল্টলেক সেক্টর ৫-এ, ঘটনাস্থলে দমকলের তিনটি ইঞ্জিন 

কেউ কেউ অবশ্য চৌপল জ্বালিয়েও বাঁশের ডোগায় ঝুলিয়ে দেয়। অনেকটা ঠিক পতাকা তোলার মতো করে ঐ দীপদানকে বাঁশের আগায় ওঠানো এবং নামানো হয়। বাঁশের মাথায় গোল রিং করা থাকে। তার মধ্যে দড়ি ঢুকিয়ে দীপাধার ঝোলানো হয়। দড়ির অন্য প্রান্ত থাকে বাঁশের নিচ পর্যন্ত। সেখানে গৃহস্থ দড়ি টেনে ফের তা নিচে নামায় সকালে। আর যে বাঁশটি নেওয়া হয়, তা যেন ২৫ টি পাব বা গাঁটযুক্ত হয়। বাঁশঝাড় থেকে নতুন কেটে আনা ঐ বাঁশের আগার যতটা সম্ভব রাখা হয়।

বাড়ির মেয়ে বৌরা মাথায় ঘোমটা দিয়ে বাড়িতে সন্ধ্যা দেখানোর সময় ঐ আকাশপ্রদীপ জ্বালায় এবং সে সময় তাঁরা মন্ত্রোচ্চারণ করে বলে, “দামোদরায় নভসি তুলায়াবে লোলয়া সহ প্রদীপন্তে / প্রযচ্ছামি নম অনন্তায় বেধসে”। অর্থাৎ কার্তিকমাসে লক্ষ্মীর সঙ্গে নারায়নকে আমি আকাশে প্রদীপ দিতেছি। বেধা বা বিধিকর্তাকে নমস্কার। এখানে ‘দামোদর’ হলেন নারায়ণ এবং ‘লোলয়া’ হলেন লক্ষ্মী। অর্থাৎ লক্ষ্মীনারায়ণের উদ্দেশ্যে দীপদান করার রীতি অনুরণিত হয়।

এই উপচারের পেছনে আরও অনেক মতবাদ রয়েছে। প্রথমতঃ কার্তিক মাস সূর্যের দক্ষিনায়ণের সময় আসে। এ সময় দিন ছোট আর রাত বড় হয়। ফলে আলোর অভাব মেটাতে গেরস্থালির লোকজন এভাবে আলোর ব্যবস্থা করে। তাছাড়া ক’দিন পরেই ধানকাটার মরসুম এসে যাবে। গ্রামবাসীরা মনে করেন, ধান হোলো লক্ষ্মী। আর সেই গ্রামবাসীরা আরাধ্য দেবতা লক্ষ্মীনারায়ণের উদ্দেশ্যে আকাশপ্রদীপ জ্বালে তাঁদের গেরস্থালির ঘরটিকে আলোকিত করতে। যাতে লক্ষ্মীনারায়ণ তাঁদের ঘরবাড়িটিকে স্বর্গ থেকেই চিনে নিতে পারে সহজেই। এরফলে গেরস্থের ঘর লক্ষ্মীনারায়ণের কৃপায় সুখ স্বাচ্ছ্যন্দ এবং মহাসম্পদে পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে। শ্রীবৃদ্ধি ঘটবে অচিরেই।

আমরা প্রবাদের আঙিনায় প্রায়শই বলে থাকি, ‘নাতি স্বর্গে দেবে বাতি’। অর্থাৎ দাদু বা দিদিমার মৃত্যুর পরে তাঁদের অবিনশ্বর আত্মার উদ্দেশ্যে আলো দেখাবে তাঁর নাতি নাতনিরা। আসলে যে কোনও পূর্বপুরুষের আত্মার আশীর্বাদ কামনায় বাড়ির ভিটে থেকে একটু উঁচু করে কোনো স্থানে দীপদর্শন করানোর চল বা রীতিই হোলো আকাশপ্রদীপ জ্বালানো। সেইজন্য আকাশকে স্বর্গ ভেবে স্বর্গারোহনের পথে বাঁশের আগায় রাতভর জ্বালানো হয় আকাশপ্রদীপ।

একসময় এই বাতিদানের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ আলাদা নিয়ম ছিল। সেসব এখন পরিবর্তিত। গবেষক চিন্ময় দাশ জানান, আগে বাড়ির কাছাকাছি যেকোনও যজ্ঞীয় কাঠে মানুষের মাপের একটি খুঁটি পুঁতে তাতে যবাঙ্গুলের মাপের একটি ছিদ্র বানানো হয়। সেই ছিদ্রতে লাগাতে হয় দুহাত মাপের একটি পটি। সেই পটিতে চারকোনা অষ্টদলাকৃতির একটি কর্ণিকা ঝুলিয়ে তার ভেতরে আলো জ্বেলে দিতে হয়। আর প্রদীপে দেওয়া হবে ঘি অথবা তিলের তেল। এখন এই রীতি বিলুপ্ত। লম্বা বাঁশে দড়ি দিয়ে ঝোলানো হয় আকাশপ্রদীপ।

এছাড়াও এই কার্তিকমাসে ফসল নির্বিঘ্নে তোলার জন্য গৃহস্থের লোকজন শরণাপন্ন হন দেবসেনাপতি কার্তিকের। তাই কার্তিকের মনোরঞ্জনের জন্য ঘরের চালে, উঠোনে এবং আকাশের পানে দীপ জ্বালিয়ে রাখা হয়। সেই আলোতে দেবসেনাপতি ফসল পাহারা দেন গৃহকর্তার।

বিজ্ঞানসম্মত একটি কারণেরও খোঁজ মেলে। এই কার্তিক মাস জুড়ে চলে ফসল পাকা এবং কাটার মরসুম। তখন অসংখ্য কীটপতঙ্গ বেরিয়ে আসে প্রকৃতিতে। এছাড়া এসময়টায় ঋতু পরিবর্তন ঘটে। নানা রোগজীবাণু ঘুরে বেড়ায় সর্বত্র। সেইসময় সর্ষে, কেরোসিন বা রেঢ়ির তেলে কিছু জ্বাললে তার ঝাঁঝে পালায় পোকামাকড়ের দল। বিশেষ করে এসময় শ্যামাপোকার প্রাদুর্ভাব বেশি। শ্যামাপূজার সময় দেখা যায় বলে এহেন নাম। আকাশপ্রদীপের মোলায়েম শিখায় আকর্ষিত হয়ে শ্যামাপোকার দল ছুটে আসে এবং মৃত্যুমুখে পড়ে।

অনেক আগে দীপাবলীতে উল্কাদানের প্রথা প্রচলিত ছিল। এই উল্কাদান আসলে তাই আকাশপ্রদীপ দানেরই অন্যরূপ। কারো কারো মতে, মহালয়াতে মর্ত্যে যেসব পিতৃপুরুষ আসতেন, তাঁরা এই উল্কাদানের আলোকে পথ দেখে যমলোকে ফিরে যেতেন। আর যাঁদের অপঘাতে মৃত্যু হয়ে সদগতি হয়নি, তাঁরা এই দীপের তাপে দগ্ধ হয়ে উদ্ধার হন। এই উল্কাদানের সময় উচ্চারিত হয়, “অগ্নিদগ্ধাশ্চ যে জীবা যেহপাদগ্ধা কুলে মম / উজ্জ্বল জ্যোতি যাদগ্ধাস্তে যান্তু পরমাং গতিম্”।

Related Articles

Back to top button
Close