fbpx
অফবিটহেডলাইন

বাবু সংস্কৃতিতে দুর্গাপুজোর কিছু বিশেষ ঘটনা…

দোয়েল দত্ত:  বনেদি কলকাতা মানেই তার পরতে পরতে ইতিহাসের আলিঙ্গন৷ আর তা যদি দুর্গাপুজো নিয়ে হয়, তাহলে তো কত জানা-অজানা গল্প লুকিয়ে আছে সেখানে৷ বনেদি কলকাতা বা বাবু সংস্কৃতির প্ৰথম দুর্গাপুজো কলকাতার বুকে হয়েছিল (তৎকালীন গোবিন্দপুর পরগণা) ১৬১০ সালে বেহালার বড়িশায় লক্ষ্মীকান্ত মজুমদারের আটচালায়৷ তবে শোনা যায় ১৬০৬ সালে নদিয়ার জনপ্রিয় মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের পূৰ্বপুরুষ জনৈক ভবানন্দ মজুমদার দুর্গাপুজো করেছিলেন৷ কিন্তু এ পুজো সম্পৰ্কে ইতিহাসের সমৰ্থিত তথ্য খুব বেশি নেই বলেই বনেদি পুজোর প্ৰবৰ্তক হিসাবে লক্ষ্মীকান্ত মজুমদারের নাম উঠে আসে, যেখান থেকে পরে সাবৰ্ণ রায়চৌধুরীদের পুজোর প্ৰবৰ্তন৷

তৎকালীন কলকাতার বনেদি পুজো সম্পৰ্কে বলা হতো তখন মা দুর্গা নাকি গয়না পরতে আসতেন দাঁ বাড়িতে, খাবার খান চোরাবাগানের মিত্ৰ বাড়িতে আর গান-বাজনা শোনেন শোভাবাজার রাজবাড়িতে৷ মায়ের পুজোয় এই তিনটি বিষয়ই প্ৰধান হয়ে উঠেছিল৷ কীভাবে দেখা যাক, আর সে সঙ্গে প্ৰাচীন কলকাতার সেই পুরনো কাহিনির অন্দরে-অন্তরে জড়িয়ে আছে কত না চমক৷

পলাশির যুদ্ধের সময়ে নায়েব নবকৃষ্ণ হয়ে উঠলেন রাজা নবকৃষ্ণ দেব ও যুদ্ধজয়ে ইংরেজদের বিজয়োৎসব পালনের জন্যই বেছে নেওয়া হল শোভাবাজারের রাজা নবকৃষ্ণর উৎসবপ্ৰাঙ্গণ৷ বিজয়োৎসবের জন্যই ১৭৫৭ তে দুর্গাদালান তৈরি হয় রাজবাড়িতে৷ এই পুজোয় স্বয়ং লৰ্ড ক্লাইভ ঝুড়িভৰ্তি ফল, টাকা ও বলির পাঁঠা উপহারস্বরূপ দেন৷ শোনা যায় শোভাবাজার রাজাবড়িতে দুর্গাপুজোয় ১০০১টি পশুবলি হতো আর কামান দেগে সূচনা করা হতো সন্ধিপুজোর সন্ধিক্ষণের৷ এইসব ‘নব্য’ বাবুদের পুজোর এক-একটা জাঁকজমক ছিল দেখার মতো৷ যেমন শোভাবাজারে সাহেবসুবোদের মনোরঞ্জনের জন্য বিরাট চৌবাচ্চা করে তাতে গ্যালন গ্যালন বিলেতি মদ ঢালা হতো৷ তার মাঝে ফেলে দেওয়া হতো একটি পদ্মফুল৷ সাহেবরা তার চারধারে বসে স্ট্ৰ দিয়ে ওই মদ টানত৷ যার স্ট্ৰয়ে পদ্মফুলটি লাগত তিনিই হতেন সেদিনের বিজেতা৷

পুজোর দিনগুলিতে সন্ধের পর ঠাকুরদালান সংলগ্ন প্ৰাঙ্গন ভরে উঠত বাঈ নাচের আসরে৷ রাজা নবকৃষ্ণ দেব যেভাবে বাঈনাচে সমৃদ্ধ করেছিলেন তাঁর নাচঘর, তেমনটা আর কেউ করতে পারেননি৷ সেসময়ে বাইজি নিক্কির কথা খুব শোনা যেত৷ নবকৃষ্ণ থেকে রামমোহন রায়, রামচন্দ্ৰ রায়ের বাড়ির দুর্গাপুজো মানেই নিক্কির ডাক পড়বে৷ সুর আর সুরার যুগলবন্দিতে রঙিন হয়ে উঠত রাতগুলা৷ শোভাবাজারে একবার বাঈজির পায়ের নীচে রংবেরংয়ের আবির রাখা হল, আর নাচতে নাচতেই সেই আবির পায়ে উড়িয়ে সামনে বসা ইংরেজ রাজপুষের হুবহু নকশা এঁকে ফেললেন বাঈজি৷ উপস্থিত সকলেই হতবাক৷ খোদ সাহেবের গলার মুক্তোর হারটি পুরস্কারস্বরূপ জুটেছিল বাঈজির৷ এছাড়া খেমটা, কবিগান, কীৰ্তন, যাত্ৰাপালা সবই হতো৷ রাজা নবকৃষ্ণ দেবেব ১৯৭৯ সালে মৃত্যুর পরে ছেলে গোপীমোহনও এইসব ঠাটবাট বজায় রেখেছিলেন৷


দুর্গাপুজো ঘিরে বাবুদের মধ্যে প্ৰতিযোগিতার অন্ত ছিল না৷ ভূস্বামী গোবিন্দরাম মিত্ৰ উত্তর কলকাতার কুমোরটুলিতে যে দুর্গাপুজো করতেন তা শুরু হতো মূল পুজোর দিনপনেরো আগে থেকে৷ এখানে সন্তান-সন্ততি নিয়ে মা রূপোর সিংহাসনে দাঁড়িয়ে থাকতেন৷ ওদিকে কম যেতেন না জোড়াসাঁকোর কয়লা ও লোহার ব্যবসায়ী শিবকৃষ্ণ দাঁ৷ তিনি প্ৰতিমাকে সোনায় মুড়িয়ে দিতেন৷ এমনকী গয়নার মুক্তো ও পান্না আসত প্যারিস থেকে বিশেষ অর্ডার দিয়ে৷ ১৭৮৪ সালে ঠাকুরবাড়িতে পুজো শু করেন নীলমণি ঠাকুর৷ কিন্তু শিবকৃষ্ণ দাঁ-এর দেবী দুর্গার গয়নার পাশে ঠাকুরবাড়ির গয়নার জৌলুষ ম্লান হয়ে গেল৷ দুই বাড়ির রেষারেষি যখন চরম তখন ঠাকুরবাড়ি ঠিক করল গয়না সমেত মা-কে বিসৰ্জন দেওয়া হবে৷ সাধে কী আর ‘বাবু

সংস্কৃতির খামখেয়ালিপনা’ কথাটির উদ্ভব হয়েছিল৷ এইসব বাবুদের বাড়িতে সাহেবদের জন্য ইউরোপীয় খানা আর সঙ্গে অবশ্যই ‘পিনা’-র বন্দোবস্ত থাকত৷ বরফ, বিলেতি মদ, সুস্বাদু নোনতা-মিঠাইয়ের গন্ধে ম-ম করত চারপাশ৷ পুজোর কদিন জমিদারবাড়ির সামনে সাধারণ মানুষদের ভিড় উপচে পড়ত৷

সবশেষে তৎকালীন কলকাতার দুর্গাপুজোর বাবুসংস্কৃতির যে কথাটি বলে লেখায় ইতি টানব, তা হল পুজোর সময়ে ঋণের দায়ে আটক কয়েদিদের মুক্ত করে মহত্ব দেখাতে অনেক বাবুই ভালোবাসতেন৷ বিশেষ করে ইংরেজ কয়েদিদের৷ কোৰ্ট ঠাসা থাকত অধমৰ্ণদের ভিড়ে৷ তারা জেলে যেতে চায় পুজোর আগে কারণ তাতে দ্ৰুতই মুক্তির আশা৷ কালের নিয়মে বাবু সংস্কৃতি ফিকে হয়ে গেলেও পুজোর জৌলুস কিন্তু তার পরিবৰ্তিত রূপ নিয়ে আছে বৰ্তমানের স্পনসরশিপ আর কপৰ্পারেট সংস্কৃতির ঘেরাটোপে৷

Related Articles

Back to top button
Close