fbpx
কলকাতাগুরুত্বপূর্ণপশ্চিমবঙ্গবিনোদনহেডলাইন

বিশ্বজয়ী বহুমাত্রিক প্রজ্ঞা সৌমিত্র……

                                                                 সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও যোগেন চৌধুরী

অপুর চরিত্রে অভিনয় করা এক যুবক

যোগেন চৌধুরী: আমি প্রথম কবে, কীভাবে এবং কোথা থেকে ও কার কাছে থেকে সৌমিত্রদার নন্দনের জগৎ সম্পর্কে জানতে পারি, ঠিক বলতে পারব না। তবে একজন চিত্রশিল্পী হিসেবে বেশ উত্তেজনাবোধ করলাম যখন দেখলাম যে অন্য পেশার সঙ্গে যুক্ত একজন মানুষ ছবি আঁকার কাজে নিজেকে যুক্ত করেছেন।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বিষয় ভাবলেই আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে অপুর চরিত্রে অভিনয় করা এক যুবকের কথা।  তারপরে ‘চারুলতা’, ‘অভিযান’, এবং অন্য অনেক ছবিতে তাঁর বলিষ্ঠ অভিনয়ের ছবিও চোখের সামনে ভাসতে থাকে।  শৈশব থেকেই তাঁর ছবি ও থিয়েটার দেখে বড় হয়েছি, তাই যখন জানলাম তিনি ছবি আঁকছেন, তখন তাঁর সেই সব কাজ দেখার জন্য বেশ আগ্রহী হয়ে উঠলাম।

আইসিসিআর-এ প্রথম সৌমিত্রদার আঁকা ছবির প্রথম প্রদর্শনী হয়েছিল।  তখন ওঁর বহু কাজ দেখেছিলাম। জীবনের অনেকটা পথ পেরিয়ে এসে তিনি একদম নতুন এক সৃষ্টিশীল মাধ্যমে নিজেকে যুক্ত করলেন। তাঁর ছবির মধ্যে ফুটে ওঠে অনেক ধরনের মুখ। সেই সব মুখের সঙ্গে তিনি পূর্ব পরিচিত। মুখগুলি তাঁর অনেক দিনের চেনা-জানা।  তাঁর নিজস্ব কাজের জগতে সেই মানুষগুলোর সান্নিধ্য তিনি পেয়েছেন বহুবার।  বৈচিত্রময় বহু কাজের ফাঁকে তাঁর অবসর সময়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে হাতে তুলে নিয়েছিলেন তুলি-কলম। পরিচিত চেনা মুখের ভিড় ছাড়াও তাঁর ছবিতে জায়গা পেয়েছে নিজের শিল্পী মনের বিভিন্ন চিন্তা।  ড্রইং বুকের সাদা পাতা ভরে উঠেছে সেই সব চিন্তায়। শুধু ড্রইং বুকের পাতা নয়, তাঁর কাছে আসা অগণিত আমন্ত্রণপত্রকেও তিনি ব্যবহার করেছেন ছবি আঁকার কাজে। বিভিন্ন আকৃতির আমন্ত্রণপত্র দিয়ে তৈরি করেছেন পেজমার্ক। সেগুলিও সমান আকর্ষণীয়।

                                                              আজীবনের বন্ধুত্ব – সৌমিত্র – তনুজা

আমার এক ভালো বন্ধুর চলে যাওয়া

তনুজা: পুলুর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব অনেক দিনের।  আমরা একসঙ্গে অনেকগুলো ছবিতে কাজ করেছি। তার মধ্যে বেশ কিছু ছবিই ভীষণ হিট করেছিল। অভিনেতা হিসেবে ও একজন অসাধারণ শিল্পী। আর মানুষ হিসেবেও সৌমিত্র ছিল অসাধারণ। নিজের পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা ওর কাছে শেখার মত। প্রতিটি সময়ে পরিবারে নিজের কর্তব্য ঠিক মত করে গেছে। বাড়ির সদস্যদের সময়ও দিয়েছে।

অন্যদিকে প্রফেশনাল ওয়ালর্ডের কাজও করে গেছে নিষ্ঠার সঙ্গে। কয়েক বছর আগে তপন সিংহ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত ওর আশিতম জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে কলকাতায় যাই।  তখন সৌমিত্রর সঙ্গে অনেক গল্প হয়েছিল। একটা পার্টিতে আমরা ‘জীবনে কী পাব না’ গানটার সঙ্গে নেচেওছিলাম।  সেই সময় অনেক পুরোনও কথাও মনে পড়ে যাচ্ছিল। দারুণ সময় কেটেছিল।

                                                                            মমতাশঙ্করের সঙ্গে শিল্পী

প্রেম মুদিত মন সে

মমতাশঙ্কর: সৌমিত্রদার সঙ্গে অনেকগুলো ছবিতে অভিনয় করেছি। মজার ব্যাপার হল বিভিন্নরকম ছবিতে ওঁর বিপরীতে কাজ করতে বেশ ভালো লাগত। ‘গণশত্রু-তে উনি আমার বাবার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, ‘শাখা-প্রশাখা-তে ভাসুর আর ‘বালিগঞ্জ কোর্ট-এ স্বামী।  আবার ‘সোপান’ ছবিটায ভিলেনের চরিত্রে অভিনয় করেন।  অভিনয়ের সময়ে দেখতাম প্রতিটি শটের শেষে সব সময় আমাকে জিজ্ঞেস করতেন তাঁর কাজটা ঠিক হয়েছে কিনা? মনে আছে ‘বালিগঞ্জ কোর্ট’-এর সেটে কাজের অবসরে একদিন সৌমিত্রদার গান শুনেছিলাম। সেদিন গাইছিলেন ‘প্রেম মুদিত মনসে কহো’ গানটি। এই বিশেষ গানটি আমি সত্য সাই বাবার মুখে অনেকবার শুনেছি তাই আমার খুব ভালো লাগছিল।

বিয়ের পর থেকে আমার স্বামীর খুব ইচ্ছে ছিল আমি কখনও ‘শেষের কবিতা’-তে অভিনয় করি। কিন্তু সেই সুযোগ কিছুতেই আসছিল না। ‘শেষের কবিতা’ বলতে আমরা তো অমিত রায়ের চরিত্রে সৌমিত্রদাকেই সব সময় ভাবি।  মনে একটা সুপ্ত ইচ্ছা ছিল যে কোনওদিনও যদি ওঁর বিপরীতে আমি লাবণ্যর ভূমিকায় অভিনয়ের সুযোগ পাই।  ঈশ্বর বোধহয় আমার কথা শুনেছিলেন।  কয়েক বছর আগে ‘শেষের কবিতা’ অবলম্বনে যখন ‘শেষের গল্প’ ছবি হল, তখন সেই ছবিতে কাজ করার সুযোগ পেলাম। আমার বিপরীতে সৌমিত্রদাই ছিলেন। অনেক বছরের অপূর্ণ ইচ্ছেটা পূরণ হতে আমি সত্যিই খুব খুশি হয়েছিলাম। তাঁর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা অন্যরকম। অনেক কিছু শেখা যায়। তাঁর অন্যান্য গুণের কথা তো সবাই জানেনই।

                                                       সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের নিজের আঁকা ছবি

সত্যজিতের সৃষ্টিতে তিনি চিরন্তন

শুভাপ্রসন্ন: রবীন্দ্রস্নিগ্ধ, রবীন্দ্রসংসংস্কৃতিতে যে সমস্ত শিল্পী সংস্কৃতি জগতে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় তাঁদের মধ্যে অন্যতম। সত্যজিৎ রায়ের আবিষ্কার তিনি। সৌমিত্রদার অভিনয় প্রতিভাকে সত্যজিতবাবু উপযুক্তভাবে কাজে লাগিয়েছেন। বলা যায় সত্যজিতের সৃষ্টিতে তিনি চিরন্তন। নাটকে এবং সিনেমায় এক অনবদ্য ঘরানার প্রতিষ্ঠা  করেছেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে এক আশ্চর্যজনক প্রতিভা নিয়ে মঞ্চে ও সিনেমায় কাজ করে চলেছেন। এমন উদাহরণ ভারতীয় সংস্কৃতি জগতে খুব কমই আছে। তিনি তো শুধু চলচ্চিত্রের অভিনেতা নন, একই সঙ্গে বিচরণ করেছেন সাহিত্যজগতেও। লিখেছেন নাটক এবং কবিতা। আর কবিতাপাঠের পাশাপাশি চিত্রশিল্পের চর্চাও করছেন। তাঁর সমগ্র কাজ রবীন্দ্রঅনুসারি এবং রবীন্দ্রচ্ছটায় যতদিন গেছে উজ্জ্বলতর হয়েছে। তাঁকে নিয়ে, তাঁর কাজ নিয়ে সংস্কৃতি মনোভাবাপন্ন বাঙালি জাতি গর্বের সঙ্গে বেঁচে আছেন।

                                                       বাঙালির প্রিয় অপু আর অপর্ণা – সৌমিত্র ও শর্মিলা

ও একজন কমপ্লিট অ্যাক্টর

শর্মিলা ঠাকুর: সৌমিত্র সম্পর্কে বলতে গিয়ে যেটা মনে হয় সেটা হল হি ওয়াজ আ লেজেন্ড, আ ক্রিয়েটিভ পার্সন। জীবনে অভিনয় ছাড়াও অনেক কাজ করেছে। কবিতে লিখেছে, কবিতা পাঠ করেছে। গান গেয়েছে, নাটক লিখেছে। স্টেজেও ভীষণ সাকসেসফুলি অভিনয় করেছে। ওঁকে বলা যায় মাল্টি ফেসেটেড জিনিয়াস। কোনওদিনও শুধুমাত্র অর্থ উপার্জনের জন্য ও কাজ করেনি। যা করেছে সেটা ভালোবেসে। ওঁর কাজটাকে বলা যায় আর্ট ফর দ্য সেক অব আর্ট। মানিকদার ছবিতে যেমন অভিনয় করেছে, তেমনই অন্যান্য ছবিতেও কাজ করেছে। সেসব কাজ অত্যন্ত উন্নতমানের। ‘অপুর সংসার’, ‘চারুলতা’-র পাশাপাশি ওঁর অনবদ্য অভিনয় দেখেছি ‘কোনি’ ছবিতে। সেখানে সুইমারের কোচের ভূমিকায় সৌমিত্র অসাধারণ।

ওঁর সঙ্গে আড্ডা মারতে গেলেও বোঝা যেত কত বিষয়ে ওর জ্ঞান এবং ইন্টারেস্ট। থিয়েটারের  ব্যপারে ওর অগাধ পড়াশোনা ছিল।  অহীন্দ্রবাবু, গিরিশবাবু, শিশির ভাদুড়ী সম্পর্কেও কত অজানা কথা এবং কাজ সম্পর্কে জানা যায়।  সৌমিত্রের সঙ্গে আলোচনা করলে বোঝা যেত অ্যাভেলিউশন অব থিয়েটারের বিষয়ে। দাদামণি মানে অশোককুমার, বলরাজ সাহানের সঙ্গে কথা বললে যেরকম আনন্দ পাওয়া যেত আর সমৃদ্ধ হতাম,  সৌমিত্রের সঙ্গে কথা বললেও সেই একই অভিজ্ঞতা হত। মনে আছে ‘আবার অরণ্যে’-র সেটে কাজ করতে গিয়ে শুভেন্দু আর সৌমিত্রের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার কথা।  কত গল্প হয়েছিল।  শুভেন্দু যেখানে শেষ করছে, সৌমিত্র সেখান থেকেই শুরু করছে। এখন আফশোষ হয় সেদিনের কথাগুলো টেপ করে রাখা হয়নি বলে। সৌমিত্রের একটা অদ্ভুত প্যাশন ছিল স্পোর্টসের বিষয়ে সেটা নিয়েও অনেকক্ষণ ওঁর সঙ্গে কথা বলা যায়। ও একজন কমপ্লিট অ্যাক্টর। ওকে কর্মবীরও বলা যায়। মানিকদার পর সৌমিত্রই যিনি ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সম্মান পেয়েছে। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।

                                                                   দীর্ঘদিনের পরিচয় – সৌমিত্র – সন্দীপ

সিধুজ্যাঠার চরিত্রে অভিনয় করতে রাজি হননি

সন্দীপ রায়: ‘অপুর সংসার’ বা ‘দেবী’ যখন তৈরি হয়েছিল তখন আমি ভীষণ ছোট ছিলাম। তাই সেইসব দিনের কাজের কথা আমার প্রায় কিছুই মনে নেই। কিন্তু পরে সৌমিত্রকাকু যখন বাবার অন্যান্য ছবিতে কাজ করেছেন, তখন দেখতাম ওনার জন্য নির্ধারিত চরিত্রগুলিকে ফুটিয়ে তুলতে কী সাংঘাতিক ডেডিকেশন নিয়ে নিজের রোলে ফোকাস করতেন। বাবার ছবিতে যখন কাজ করেছেন, তখন দেখেছি চিত্রনাট্যের ওপর অসাধারণ হোমওয়ার্ক করে আসতেন। কোনও ছবিতে যদি চা খাওয়ার দৃশ্য থাকত, সেখানে সংলাপ বলার মাঝখানে তখন চায়ের কাপটা মুখে তুলবেন সেটাও হোমওযার্ক করা থাকত। ‘ঘরে বাইরে’ ছবির শুটিং চলাকালীন বাবা তিনদিন যেতে পারেনননি।  সেই তিনদিন আমি বাবার সহকারী হিসাবে পরিচালনার কিছু কাজ করেছিলাম। মনে আছে বেশ নার্ভাস লাগছিল, কিন্তু সৌমিত্রকাকু তাঁর স্নেহ দিয়ে এত সুন্দরভাবে আমাকে কো-অপারেট করেছিলেন, যে আমার পক্ষে কাজটা করা সহজ হয়ে যায়।

পরবর্তীকালে যখন আমি ‘উত্তরণ’ এবং ‘নিশিযাপন’ তৈরি করি, তখন ‘ঘরে বাইরে’-র সেই অভিজ্ঞতাটা কাজে লেগেছিল। এছাড়াও ফেলুদার টেলিফিল্মে সৌমিত্রকাকুকে পেয়েছিলাম। আমি যখন ‘ফেলুদা’ তৈরি করতে শুরু করি, তখন ‘ফেলুদা’-র চরিত্র অনুযায়ী ওনার অনেকটা বয়স হয়ে গিয়েছিল। তাই ‘ফেলুদা’ হিসাবে ওনাকে আমি নিতে পারিনি। ‘বোম্বাইয়ের বোম্বেটে’ যখন করি, তখন উনি ছবিটা দেখতে এসেছিলেন এবং সেই ছবিতে ‘ফেলুদা’-র কাজ দেখে খুশি হয়েছিলেন।  অনেক পরে ‘কৈলাসে কেলেঙ্কারি’-র সময় আমি ওনাকে সিধুজ্যাঠার চরিত্রে কাজ করার জন্য অনুরোধ করি কিন্তু উনি বলেছিলেন ‘ফেলুদা’-র ছবিতে উনি অন্য কোনও রোলে অভিনয় করতে রাজি নন।  আমি ওনার সেই সিদ্ধান্ত  মাথা পেতে নিয়েছিলাম। আর এছাড়া সৌমিত্রকাকুর প্রফেশনালিজম নিয়ে নতুন করে কী বলব? সবাই সেটা জানেন। শুটিং-এর সময় যেমন সিরিয়াসনেস নিয়ে কাজ করতেন, আবার একই সঙ্গে তাঁর সহজ ব্যবহারে পরিবেশটাকে হালকাও করে তুলতেন। আমাদের সঙ্গে যে অ্যাটিটিউড দেখাতেন, ঠিক সেইরকমই ব্যবহার করতেন প্রোডাকশন বয়দের সঙ্গেও।

 

 

 

Related Articles

Back to top button
Close