fbpx
অফবিটকলকাতাগুরুত্বপূর্ণপশ্চিমবঙ্গবিনোদনহেডলাইন

জীবনবোধের নাম সৌমিত্র…..

অরিজিৎ মৈত্র: সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় একটি নাম, একটি অধ্যায়, একটি সময়, একটি সংস্কৃতি। গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা ছবির জগতে তিনি একাধিপত্য বজায় রেখেছেন। ৬ অক্টোবর, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগে পর্যন্ত কর্মক্ষেত্রে তিনি আগের মতোই ব্যস্ত ছিলেন। তিনি চলচ্চিত্রাভিনেতা, তিনি নাট্যকার, তিনি কবি, তিনি বাচিক শিল্পী। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না নিয়েও তিনি নিজেকে একজন চিত্রকর হিসাবে তৈরি করেছেন। পরিচয় দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়। এক সময়ে বাঙালিদের মধ্যে তর্ক হয়েছে উত্তমকুমার না সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কে অভিনয়ে শ্রেষ্ঠ? কে বেশি জনপ্রিয়। এই রচনায় বহু আলোচিত জীর্ণ বিষয়টিকে পুনরায় আলোর সামনে নিয়ে এসে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করতে মন চাইছে না। অভিনয় জীবনে বিশেষ করে নাটকে নাট্যাচার্য শিশিরকুমার ভাদুড়ী তাঁর আদর্শ। পরবর্তীকালে চলচ্চিত্র জগতে সত্যজিৎ রায়, সৌমিত্র চট্টোপাধায়ের পথ প্রদশর্ক। আর তাঁর সমগ্র জীবন জুড়ে রবীন্দ্রনাথ তো আছেনই।

জীবনের দীর্ঘ পথে কখনও এসেছে জয় আবার কখনও পরাজয়। নাটক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চলেছেন। জন অরণ্যের মধ্যে দিয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেও তিনি ক্লান্ত এবং শ্রান্ত হননি। প্রকৃত আনন্দ ও তৃপ্তি তাঁকে এনে দেন দশর্কেরা। সৌমিত্র বলেন, এতগুলো বছর ধরে দশর্করাই তাঁকে সহ্য করে এসেছেন, তাঁকে প্রশ্রয় দিয়েছেন এবং শেষ পর্যন্তও তাঁর অভিনয় মানুষ ভালোবাসছেন, ওটাই তাঁর কাছে সব থেকে বড় প্রাপ্তি।

সত্যজিৎ রায় থেকে মৃণাল সেন, তপন সিংহ থেকে অজয় কর, তরুণ মজুমদার থেকে অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়, অসিত সেন থেকে রাজা মিত্র, ঋতুপর্ণ ঘোষ থেকে গৌতম ঘোষ, সবার ছবিতেই কাজ করেছেন। সাম্প্রতিক কালের চিত্রনির্মাতাদের ছবিতেও কাজ করছেন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে। এ হেন মানুষটির সঙ্গে প্রথম পরিচয় আর পাঁচজন বাঙালির মতো ছবির পর্দায়, পরবর্তী সময়ে পারিবারিক বৃত্তে আরও পরে আমার ক্ষুদ্র কর্মক্ষেত্রে। আমার তৈরি দু’টো তথ্যচিত্রে ভাষ্যপাঠ করতে সম্মত হন। প্রথমটি ‘তপন সিংহ-এক বর্ণময় স্রষ্টা’ (এই নামটি তাঁরই দেওয়া)। অন্যটি বাংলা চলচ্চিত্রের দীর্ঘ ইতিহাস নিয়ে তৈরি ‘চলচ্চিত্রে চালচিত্র’। সেই দু’টির চিত্রনাট্য পড়ে আমায় জিজ্ঞেস করে প্রয়োজনীয় কিছু সংযোজন করে দেন।

ছবি: প্রতাপ দাশগুপ্ত

‘ছায়াচিত্রে রবীন্দ্ররচনা’ শিরোনামের এক অনুষ্ঠানের রিহার্সালের সময়ে বারে বারে জানতে চেয়েছেন তাঁর পড়াটা ঠিক হচ্ছে কিনা। কী অসম্ভব নিষ্ঠা আর পেশাদারি মনোভাব, যা এখনকার অভিনেতাদের কাছে শিক্ষনীয়। গত পাঁচ বছর আগে ওঁর ৮০তম জন্মদিনের অনুষ্ঠানে থাকার জন্যে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়কে আমন্ত্রণ জানানোর কারণে কলকাতা রাজভবনে যাওয়ার পথে কত পারিবারিক কথা আলোচিত হয়েছিল, তা এখন ভাবলে মনে হয় সেদিন দেখেছিলাম এক পারিবারিক মানুষকে। আশিতম জন্মদিনকে কেন্দ্র করে আয়োজনের কথা জানতে সেই দিনগুলিতে প্রায় দু’বেলাই ফোনে কথা হত। প্রয়োজনীয় নির্দেশও দিতেন। মজা করে একদিন বলেছিলেন, ‘তোমার দেশ কোথায়’? শান্তিপুর বলাতে গম্ভীরমুখে আমার দিকে তাকিয়ে মুখে স্মিত হাসি নিয়ে বললেন, ‘এবার থেকে আমাকে মেনে চলবে’। কারণ তিনি তো কৃষ্ণনাগরিক। সেই কারণেই কৌতুকপূর্ণ এই নির্দেশ। জন্মদিনের সন্ধেবেলার পার্টিতে তনুদি সহ সৌমিত্রকাকু এলেন, আমাদের প্রিয় শ্রেনিক শেঠের বাড়িতে। সেখানে শুরু হল গান, ‘জীবনে কী পাব না, ভুলেছি সে ভাবনা।’ গানের সঙ্গে নাচে পা মেলালেন ‘তিন ভুবনের পারে’-র নায়ক ও নায়িকা।

নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হলাম উপস্থিত আমন্ত্রিতরা। তপন সিংহর এক জন্মদিনের সন্ধ্যায় তপনদার নিউ আলিপুরের বাড়িতে শুধুমাত্র আমরা তিনজন। সেদিন সারাটা সন্ধে কেটে গিয়েছিল তপনদাকে উপহার দেওয়া সৌমিত্রকাকুর নিজের কবিতার বই থেকে পাঠ শুনে। ওঁর নিজের স্বরচিত কবিতাপাঠে আমরা দু’জন নীরব শ্রোতা। আরেকবার শুনলাম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে নিম্নমানের রেডিও সম্প্রচারে বিটোভিনের সিম্ফনি শুনে সত্যজিৎ রায় কিভাবে বহু বছর পরে তার নোটেশন লিখে দিয়েছিলেন।

 

এসব গল্প বলতে গিয়ে সৌমিত্রকাকু বলেছিলেন, সময় পেলে ফোন করে আমার কাছে এলে এরকম আরও অনেক গল্প শোনাব। অনেক সান্নিধ্যের অনেক স্মৃতি। সব বলতে গেলে লেখা কলেবরে বৃদ্ধি পাবে আর কিছুটা হয়তো আত্মপ্রচারও হয়ে যাবে। তাঁকে নিয়ে চর্চা করলে তাঁর কী এসে যায় জানিনা, তবে আমরা সমৃদ্ধ হতাম নতুন করে। তাঁর কাছে যখন আমরা থাকি বা তিনি যখন আমাদের কাছে থাকেন, তখন সেই বিরল মুহূর্তে লক্ষ করেছি, সকলের মাঝখানে থেকেও সকলের চেয়েও কত দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন শিল্পী সৌমিত্র। সে দূরত্ব অহমিকার নয়-জীবনবোধের ভিন্নতায়। আজ রিক্ত হয়ে মনে হচ্ছে কবির লাইন – ‘মোর লাগি করিও না শোক, আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক। মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই। শূণ্যেরে করিব পূর্ণ, এই ব্রত বহিব সদাই। ’

 

Related Articles

Back to top button
Close