fbpx
অন্যান্যঅফবিটবিনোদনহেডলাইন

সতত বিরাজ হৃদয়পুরে…

অরিজিৎ মৈত্র: ‘হেরিয়া শ্যামল ঘন নীল গগনে, সেই সজল কাজল আঁখি পড়িল মনে’। রবীন্দ্রনাথের অল্পশ্রুত এই গানটিতে বৃষ্টিস্নাত প্রকৃতি আর প্রিয়ার ছায়া মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। যাঁর কণ্ঠে এই গানটি শুনেছিলাম, তিনি স্বরলিপি অনুসারে তাঁর সাবলিল গায়নভঙ্গিতে গানের কথা আর সুরকে শ্রোতাদের মর্মে প্রবেশ করিয়েছিলেন। সেই নিবেদনে কোনও রোম্যান্টিকতার লেশমাত্র ছিলনা। সেই গানে কবির বাণীর মাধুর্য এতটুকু ক্ষুণ্ণ হয়নি। যা ছিল, সেটা রবীন্দ্রসংগীতের প্রতি আত্মনিবেদন। এখানেই তাঁর স্বতন্ত্রতা।

শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ও সহপাঠীদের সঙ্গে।

শিল্পী আজীবন প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে অন্য কোনও ধরনের গান গাননি। শুধু রবীন্দ্রসংগীতকেই শ্রোতাদের প্রাণে পৌঁছে দিয়েছেন। অনায়াসেই তাঁকে রবীন্দ্রসংগীতের অন্যতম প্রাণপুরুষ বলা যায়। এতক্ষণে হয়ত পাঠকেরা বুঝতে পেরেছেন কার কথা বলছি। হ্যাঁ, তিনি সুবিনয় রায়। শৈশবে বোকাবাক্সের আবির্ভাব হবার আগে রেডিওর ইথার তরঙ্গে শুক্রবার রাতের অনুরোধের আসরের শিল্পী তালিকায় অবশ্যই থাকতেন সুবিনয় রায়। অবাক হয়ে শুনতাম অতীব সব কঠিন তাল, লয় এবং সুরের গানগুলিকে কী সহজ করে গাইতেন। ইংরেজিতে যাকে বলে এফার্টলেস প্রেজেন্টেসন।

এস্রাজে শিল্পী, কণ্ঠে কণিকা।

শিল্পীর জন্ম ১৯২১ সালের ৮ নভেম্বর উত্তর কলকাতার কর্ণওয়ালিস স্ট্রিটের এক ব্রাহ্ম পরিবারে। একদম প্রথমে নিজের মায়ের কাছে সংগীতশিক্ষার শুরু। এরপর শান্তিনিকেতনে স্নাতক স্তরে কেমিস্ট্রি পড়ার সময়ে রবীন্দ্রসংগীতাচার্য শৈলজারঞ্জন মজুমদারের সান্নিধ্যে আসেন এবং গান শিখতে শুরু করেন। পাশাপাশি গান শেখেন রবীন্দ্রনাথের ভাইজি ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীর কাছে। মার্গ সংগীতের তালিম নেন রমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এবং গিরিজাশঙ্কর চক্রবর্তীর কাছে। একদিন মায়ের গান শেখার সময়ে সেই গানের সুর বাঁশিতে তুলে আপন মনে বাজাচ্ছিলেন। সেই সুর শুনে বাব সুরেন বসু রায় তাঁকে ডেকে পাঠিয়ে নিজে গেয়ে পুত্রকে তুলে দেন।

সংগীতে মগ্ন শিল্পী।

শৈশবে সুবিনয় রায়ের প্রথাগত শিক্ষার শুরু মেট্রপলিটন ইনস্টিটিউশনে। এরপর ম্যাট্রিক পাশ করে সিটি কলেজে ভর্তি হন। শান্তিনিকেতনে পড়তে গিয়ে সুযোগ আরও বেড়ে গেল সংগীতচর্চার। সেখানে শৈলজারঞ্জন মজুমদারের সান্নিধ্যে গান শিখতে শুরু করেন। পাশাপাশি গান শেখেন রবীন্দ্রনাথের ভাইজি ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণীর কাছেও। শান্তিনিকেতনে থাকাকালীন একবার বর্ষামঙ্গলের মহড়া দিতে গিয়ে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের কাছে গান শেখার সুযোগ আসে। সেই সময় কবি তাঁকে বেশ কয়েকটি গান শিখিয়েছিলেন, তার মধে ছিল ‘ওগো সাঁওতালি ছেলে’, ‘সঘন গহন রাত্রি’ ইত্যাদি গান। ১৯৪১ সালে রবীন্দ্রপ্রয়ানের পরে কলকাতার ভবানীপুরে প্রতিষ্ঠিত হয রবীন্দ্রসংগীত শিক্ষায়তন গীতবিতান। অনাদি ঘোষ দস্তিদারের অনুরোধে উত্তর কলকাতা শাখা খোলা হয় সুবিনয় রায়ের নিজের বাড়াবাড়িতে। সেখানকার দায়িত্ব এসে পড়ে সুবিনয় রায়ের ওপর।

রবীন্দ্রজীনীকার ও শিল্পীর মেসোমশাই প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে।

এরপর ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণীর অনুরোধে তিনি বেশ কিছুকাল শান্তিনিকেতনে সংগীতভবনে শিক্ষকতা করতে শুরু করেন। ১৯৪৫ সালে ফিরে আসেন কলকাতায়। যোগ দেন প্রেসিডেন্সি কলেজের স্ট্যাটিস্টিকাল ল্যাবোরেটারিতে। সেই বছরেই তাঁর গানের প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয় কলোম্বিয়া থেকে। রেকর্ডের একদিকে ছিল ‘তুমি ডাক দিয়েছ কোন সকালে’ আর অন্য পিঠে ছিল ‘এই করেছ ভাল’। এরপরের চাকরি জীবন শুরু হয় বরাহনগরের ইন্ডিয়ান স্টাটিস্টিকল ইনস্টিটিউটে অধ্যাপক প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশের বাড়ি আম্রপালি-তে। এই বাড়ির নামকরণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

তিন কিংবদন্তী – হেমন্ত, মান্না ও সুবিনয়।

চারের দশক থেকেই আকাশবাণী কলকাতায় সুবিনয় রায় নিয়মিত অনুষ্ঠান করতে শুরু করেন। জ্যেষ্ঠ পুত্র সুরজিতের মৃত্যুর পরে তাঁর মরদেহের সামনে দাঁড়িয়ে সুবিনয় রায় গেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের গান ‘জানি তুমি মঙ্গলময়’। তিনি শুধুমাত্র একজন গানের শিল্পী ছিলেন না, ছিলেন একজন ভাল সংগীত শিক্ষকও। শিক্ষক হিসেবে ছিলেন অতি নিষ্ঠাবান এবং অত্যন্ত কড়াধাঁচের। পুত্র সুরঞ্জনবাবুর জানালেন, বাবা গান শেখাবার সময় ভীষণ সিরিয়াস হয়ে যেতেন। আমাদের বলতেন, ‘তোমাদের একটা গান ধার দিচ্ছি, সেটা নিখুঁতভাবে শিখে আমাকে ফেরৎ দেবে’। তাঁর সমগ্র জীবন জুড়ে রবীন্দ্রনাথের গানই ছিল প্রধান সাধনার বিষয়। প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে কখনও কবির গান ছাড়া গাইতেন না। ঘরোয়া আসরে হয়ত কখনও শচীনদেব বর্মনের গান গেয়েছেন।

স্ত্রী ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে।

কবির গানে গানেই যে শিল্পী বলতে চেয়েছিলেন ‘এমনি করে ঘুরিব দূরে বাহিরে’। রবীন্দ্রগান কণ্ঠে নিয়ে দেশে এবং দেশের বাইরেও অনুষ্ঠান করেছেন। ২০০৫ সালের ৯ জানুয়রি তাঁর প্রয়ানের সংবাদ পেয়ে ভারাক্রান্ত মনে তাঁরই গাওয়া একটি গানের সুর মনে পড়ে গিয়েছিল! ‘আমার জীর্ণ পাতা যাবার বেলা, বারে বারে ডাক দিয়ে যায় নতুন পাতার দ্বারে দ্বারে’। একজন সংগীতশিক্ষক সব সময় ভাল সংগীতশিল্পী হতে পারেন না, আবার একজন সংগীতশিল্পী সব সময় একজন ভাল সংগীতশিক্ষক হতে পারেন না, কিন্তু সুবিনয় রায়ের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম ঘটেছি। দুই গুণেরই মেলবন্ধন ঘটেছিল তাঁর মধ্যে।

জীর্ণ পাতা গানটির মূল পাণ্ডুলিপি।

কবি শঙ্খ ঘোষ তাঁর গায়কী সম্পর্কে বলেছেন, ‘অন্য অনেক শিল্পীর গলায় অনেক যাদু রয়েছে কিন্তু নিখুঁত স্বরলিপির শুদ্ধ সংগীত শুনতে চাইলে, তা শুনতে হবে সুবিনয় রায়ের গান’। কবির কথার রেশ ধরে বলাই যায় শিল্পী সুবিনয় তাঁর কণ্ঠযাদুতেই শতবছর বিরাজমান শ্রোতার মনে।

Related Articles

Back to top button
Close