fbpx
কলকাতাগুরুত্বপূর্ণদেশপশ্চিমবঙ্গলাইফস্টাইলহেডলাইন

করোনা সংক্রমণ থেকে বাঁচতে মেনে চলতে হবে নির্দিষ্ট গাইডলাইন: ডা. সুব্রত চক্রবর্ত্তী

বিপাশা চক্রবর্তী, কলকাতা: করোনা! আজ সকলের মুখে মুখে শুধু এই একটাই নাম। আর করোনার সঙ্গে জুড়ে রয়েছে এক অজানা আতঙ্ক বা প্যানিক। এই প্যানিক থেকেই আমরা বেশি মাত্রায় সংবেদনশীল হয়ে উঠছি, বা বুঝেও বুঝতে পারছি না আমাদের কি করা উচিৎ। আর এর কারণে মাঝে মধ্যে কিছু হঠকারিতার ঘটনা সামনে আসছে। যেমন স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে বিরূপ আচরণ, যা কোনওভাবে সুস্থ সমাজে অঙ্গ হতে পারে না।
আসলে করোনা নামক অদৃশ্য শক্তির বিরুদ্ধে আমাদের লড়াইটা ঠিক কীভাবে করা প্রয়োজন সেটাই প্রথমে জানা প্রয়োজন।

একদিকে সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচতে চলেছে লকডাউন। আর অন্যদিকে মানুষ এই মারণ ভাইরাসের হাত থেকে নিজেদের বাঁচাতে মাস্ক আর গাল্ভসকে নিজের অঙ্গে জড়িয়ে ফেলেছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে আমরা কীভাবে এই অজানা শক্তির সঙ্গে মোকাবিলা করে নিজেদের ভালো রাখতে পারব।

এই ব্যাপারে আমাদের গাইডলাইন দিলেন বিশিষ্ট চিকিৎসক শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সুব্রত চক্রবর্ত্তী।

প্রশ্ন: করোনা ভাইরাস ঠিক কতটা সাংঘাতিক?

ডা. সুব্রত চক্রবর্ত্তী: অবশ্যই সাংঘাতিক। তবে করোনা ভাইরাস ঠিক কিরকম মানুষকে সেটা আগে বুঝতে হবে। অনেকে কিছু না জেনে অজানা আতঙ্ককে প্রশ্রয় দিচ্ছে। অনেক জায়গায় স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর আক্রমণ হচ্ছে। এগুলো ঠিক নয়।

এই ভাইরাসের গতিপ্রকৃতি বা রূপ সম্পর্কে আমাদের ধারণা স্পষ্ট থাকলে মোকাবিলা করা সহজ হবে। কীভাবে ইনফেকশন ছড়াতে পারে, সেটা আমাদের জানা উচিৎ।
আমি যদি ফ্লু-এর সঙ্গে এই ভাইরাসে তুলনা করি তাহলে ফ্লু তে যদি ১% মর্টালিটি থাকে তাহলে এই ভাইরাসে রয়েছে ১০% মর্টালিটি।

ঠিক সময়ে লকডাউনের সিদ্ধান্ত আমাদের করোনার হাত থেকে বাঁচাতে অনেক সাহায্য করেছে। সেটা না হলে এটা মারাত্মক হারে ছড়িয়ে পড়ত। তাই ঠিক সময়ে লকডাউন সঠিক সিদ্ধান্ত বলতেই হবে।

এই ভাইরাসটা কিন্তু কখনই নিজে থেকে হাওয়াতে উড়ে বেড়াতে পারে না। এর কোনও ডানা নেই। ভাইরাসটা কি সেটা ভালোভাবে জানতে হবে। যেমন ব্যাকটেরিয়া একটা সেল(cell)। Virus part of the cell. আমাদের প্রত্যেকের শরীরে প্রত্যেক সেল-এ একটা পাওয়ার হাউস থাকে। যেখান থেকে পাওয়ার মানে মেটাবলিক অ্যাক্টিভিটিকে পাওয়ার সাপ্লাই করে। গাড়ি চালানোর জন্য পেট্রোল দরকার, তেমনি সেলকে চালাবার জন্য পাওয়ার দরকার। ব্যাকটেরিয়ার এই শক্তিটা আছে। কিন্ত ভাইরাসের এই শক্তি নেই। কিন্তু তাহলে ভাইরাসটা বেঁচে থাকছে কি করে এটাই প্রশ্ন?
এই ভাইরাসটা যখন মানুষের শরীরে যাচ্ছে তখন ভাইরাসটা মানুষের ম্যাটাবলিক অ্যাক্টিভিটিকে ব্যবহার করছে। কিন্তু আমাদের হাঁচি, কাশি থেকে আমাদের যে থুথুকণা বের হচ্ছে, তখন ওটার মধ্যে চড়ে ও(করোনা ভাইরাস)হাওয়াতে যেতে পারে। যাকে আমরা বলি ‘ড্রপলেট স্প্রেড’। মানুষ যখন কথা বলছে, তখন ১০ হাজার পর্যন্ত থুথুকণা বের হতে পারে, আর হাঁচি বা কাশিতে ৪০ হাজার পর্যন্ত থুথুকণা বের হতে পারে। তাই দুটো মানুষের মধ্যে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখতে বলা হচ্ছে, তাহলে ভাইরাসটা ছড়াতে পারবে না। তাই এই ক্ষেত্রে সোশ্যাল ডিস্টেন্স একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

কিন্তু এই ড্রপলেটগুলোকে কিন্তু গ্র্যাভিটির কারণে একটা দূরত্বে গিয়ে মাটিতে পড়তেই হবে। এটা স্প্রেড করে ৬ ফিট দূরত্ব পর্যন্ত যেতে পারে। আর এই মারণ ভাইরাসটি যদি মানুষের শরীর না পায়, তাহলে ও(করোনা ভাইরাস) জীবিত থাকতে পারবে না।

কিন্তু আরও একটা বিষয় যদি এই ভাইরাসটি কোনও টেবিল, মোবাইল, পেন, বাস্কেটের ওপর যদি গিয়ে পড়ে তাহলে সেখানে কিন্তু আবার ৩/৪ দিন বেঁচে থাকতে পারে। এখানে সমস্যা হচ্ছে, যে টেবিলে বসে হয়তো আমি কাজ করছি, সেই হাত মুখে, চোখে দিচ্ছি সেখান থেকে ভাইরাসটি আমার শরীরে প্রবেশ করছে। সেই কারণে সব সময় হাত, রুম স্যানিটাইজ করা ও মুখে মাস্ক পরে থাকতে বলা হচ্ছে।

প্রশ্ন: ঠান্ডা যেখানে বেশি সেখানে এই ভাইরাস বেশিক্ষণ বেঁচে থাকতে পারে?

ডা. সুব্রত চক্রবর্ত্তী: এই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা চলছে। এখনও এই ব্যাপারে কিছু প্রমাণিত নয়।

প্রশ্ন: আমরা কি ধরনের মাস্ক ব্যবহার করব? সকলের পক্ষে N-95 সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। তাহলে কি উপায়?

ডা. সুব্রত চক্রবর্ত্তী: মাস্ক খুব গুরুত্বপূর্ণ। সংক্রমণকে ৫০ শতাংশ কমিয়ে দিতে সাহায্য করে। তবে N-95 মাস্ক-পরতেই হবে এমন কোনও যৌক্তিকতা নেই। এই মাস্ক বেশ দামি। সকলের পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে। ডবল লেয়ার দেওয়া সার্জিক্যাল মাস্ক ব্যবহার করা ভালো। কাপড় ডবল লেয়ার বা ট্রিপল লেয়ার করে নিয়েও পরা যেতে পারে। এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, রাস্তায় যখন মানুষ বের হবে, তখন কখনও মাস্কের সামনের অংশতে আমরা হাত দেব না। কারণ ওখানে ভাইরাস বসে থাকতে পারে। তারপর হয়তো ওই ব্যক্তি ওই হাত দিয়ে চোখ, নাক কচলালো, সেখান থেকে তখন ভাইরাস সংক্রমণ হতে পারে। বাড়িতে আসার পর ডিস ইনফেকটেড স্প্রে করে মাস্ককে জীবাণু মুক্ত করে নেওয়া খুব ভালো।

প্রশ্ন: ঘরোয়া পদ্ধতি যেগুলো বলা হচ্ছে যেমন গরম জল তার মধ্যে আদাকুচি দিয়ে খাওয়া, এইগুলোর কি কোনও যৌক্তিকতা আছে?

ডা. সুব্রত চক্রবর্তী: কিছুটা হলেও আছে। আমরা অন্যান্য ভাইরাল ইনফেকশনে সময়েও গরম জল খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকি। আদা, হলুদ এগুলো অ্যান্টি অক্সিডেন্ট। তাই এগুলো উড়িয়ে দেওয়ার মতো কোনও বিষয় নয়।
তবে এই সময় হালকা খাবার খাওয়া, অল্প ফ্রি হ্যান্ড এক্সাসাইজ, পরিমাণমতো জল খাওয়া এইগুলো ঠিকমতো মেনে চললে আমাদের BMR Rate ঠিক থাকবে। BMR কমে গেলে আমাদের শরীরে সংক্রমণের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

প্রশ্ন: লকডাউন উঠে গেলে আমাদের স্বাভাবিক জনজীবন শুরু হবে। তখন সেখানে আমাদের করণীয় কি?

ডা. সুব্রত চক্রবর্ত্তী: পশ্চিমবঙ্গে জনসংখ্যা ঘনত্বের নিরিখে এটি একটি চিন্তার মতো বিষয়। যেখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব কম সেখানে সংক্রমণের হারও কম। সোশ্যাল ডিস্টেন্স বজায় রাখতে হবে। জমায়েতগুলোকে এড়িয়ে চলতে হবে। যতটা সম্ভব নিজেকে সুরক্ষিত রাখা যায় তার জন্য চিকিৎসকেরা যে বিধিনিষেধগুলি জানিয়েছেন সেগুলি মেনে চলতে হবে।

Related Articles

Back to top button
Close