fbpx
পশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

দুর্ঘটনায় মৃত্যু মেদিনীপুরের ‘স্যাটলিঙ্ক’ নিউজ চ্যানেলের প্রতিষ্ঠাতা সুবীর সামন্তের

তারক হরি, পশ্চিম মেদিনীপুর: প্রয়াত মেদিনীপুরের পরিচিত নিউজ চ্যানেল ‘স্যাটলিঙ্ক’ স্রষ্টা সুবীর সামন্ত। বৃহস্পতিবার সকালে এক পথ দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় তাঁর। মেদিনীপুর শহরের জন্য একটা নিজস্ব নিউজ চ্যানেলের জন্ম দিয়েছিলেন সুবীর বাবু। বন্ধু প্রতিম দাদা অরুণ চৌধুরীকে সঙ্গে নিয়ে নয়ের দশকে কেবল লাইনের ব্যবসার পাশাপাশি মেদিনীপুর শহরের অলি গলির খবর বাড়িতে বাড়িতে পৌঁছে দিত ‘স্যাটলিঙ্ক’।
নিজের বাড়িতে বসে নিজের টিভিতে নিজেরই শহরের খবর কিংবা নিজেরই ছেলে মেয়েদের খেলার মাঠে অথবা কোনও জলসায় অনুষ্ঠান করতে দেখে আপ্লুত হতেন মেদিনীপুরবাসী, সৌজন্যে সুবীর সামন্ত। রাজনৈতিক সভা থেকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিদ্যালয়ের বার্ষিকী অনুষ্ঠান, শহরের চুরি, ছিনতাই সন্ধ্যে কিংবা সকালে মধ্যবিত্তের সাদা কালো টিভিতে ফুটে উঠত স্যাট লিঙ্কের চ্যানেলে। এই নতুন কিছু করার তাড়নায় বেশির ভাগ সময়ই ব্যাপক লোকসানও গুণেছেন সুবীর। শহরে টিকিট বিক্রি না হওয়া জলসাতে ক্যামেরা বসিয়ে স্ত্রীর গহনাগাটি অবধি বিক্রি করছেন সুবীর, কিন্তু তাতে মেদিনীপুরবাসীর বিনোদনে বাধা পড়েনি।

 

বুধবার রাতে নিজেদের একটি সংগঠনের মিটিং করে ফিরছিলেন সুবীরবাবু। ৬নম্বর হাওড়া-মুম্বই জাতীয় সড়কের উলুবেড়িয়ার কাছাকছি সামনের থাকা একটি গাড়িকে পেছন থেকে ধাক্কা মারে সুবীরদের গাড়ি। বুকে এবং মাথায় আঘাত লাগে। জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সেই জ্ঞান আর ফেরানো যায়নি। মধ্য রাতেই মারা যান ৫৫বছরের সুবীরবাবু। আ্যনালগ থেকে ডিজিটাল ব্যবসায় চলে এসেছিলেন তিনি।

শহরের এমনকী শহরের বাইরেও ছোট অনুষ্ঠান থেকে ভিভিআইপিদের অনুষ্ঠানের সম্প্রচার, জায়েন্ট স্ক্রিন সুবীর সামন্ত ছাড়া ভাবাই যেত না। মেদিনীপুরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কিংবা আইআইটি খড়গপুর য়ে রাষ্ট্রপতির সমাবর্তন ভাষণ, চন্দ্রকোনা রোডে প্রয়াগ ফিল্ম সিটিতে শাহরুখ খানের অনুষ্ঠান! তাঁর হাত ধরেই অবিভক্ত মেদিনীপুর দেখেছিল ট্রলি ক্যামেরার কারসাজি। খড়গপুর, হলদিয়া, ঝাড়গ্রাম সুবীর সামন্ত ছাড়া কেউ বড় অনুষ্ঠান সম্প্রচারের ঝুঁকি নিত না। কলকাতার টালিউড ক্যামেরা মেদিনীপুরের এঁদো মাটিতে সুবীর ছাড়া বসানোর স্পর্ধা কে দেখাবে? শুধু তাই নয়। মেদিনীপুর শহরের বহু সাংবাদিক, ক্যামেরা ম্যান, ভিডিও গ্রাফারের জন্ম হয়েছে স্যাটলিঙ্কের হাত ধরেই যাঁদের কেউ কেউ আজ বিখ্যাত, আজ প্রতিষ্ঠিত তারা।

প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির অনুষ্ঠান করতে গিয়ে ব্যাপক লোকসানও গুনতে হয় ওঁনাকে। মেদিনীপুর শহরের কলেজ মাঠে প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠান চলাকালীন ভেঙে পড়ে প্যান্ডেলের একাংশ। গোটা ঘটনাই চলে যায় রাজ্য পুলিশ এবং প্রধানমন্ত্রীর কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে। প্রায় ১ মাস ঘটনাস্থল থেকে নিজের সরঞ্জাম সরাতে পারেননি তদন্তের জন্য। কলকাতা থেকে ভাড়া করে আনা বহুমূল্য সরঞ্জামের ভাড়া দিনের পর দিন গুনতে হয় তাঁকে। আইটিআইখড়গপুর য়ে রাষ্ট্রপতির অনুষ্ঠানে আরেক বিপর্যয়। প্রবল বজ্রপাতে পুড়ে যায় সম্প্রচারের জন্য ব্যবহৃত বহু দুর্মূল্য মেশিন। এই দুই ধাক্কা সর্বস্বান্ত করে দেয় তাঁকে। তাই ডিজিটাল থেকে সরে ডিজিটাল প্রিন্ট ব্যবসায় সরে আসছিলেন ধিরে ধিরে। কিন্তু ভালো করে সেই ব্যবসা জমিয়ে ওঠার আগেই চলে গেলেন সুবীর।

মেদিনীপুর কলেজের গা ঘেঁষে তৈরি করা বাবার একটা ছোট্ট ছবি তোলার স্টুডিওতে কলেজের ছেলে মেয়েদের জন্য আইডেন্টি কার্ডের সাদা কালো ছবি তুলে হাত পাকিয়ে ছিলেন সুবীর। ‘উর্জ্জনা’ স্টুডিওর গলায় ঝোলানো সেই আগফা ক্যামেরা ওয়ালা বছর উনিশ কুড়ির সেই ছেলেটার মায়া ভরা হাসি এই ৫৫ বছরেও যা অমলিন ছিল। কোনও বেদনা কোনও লোকসানই সেই হাসি কেড়ে নিতে পারেনি। সেই হাসি নিয়েই চলে গেলেন সুবীর সামন্ত। রেখে গেলেন স্ত্রী এবং একমাত্র ছেলে আর অগণিত ভালবাসার মানুষকে। সুবীরবাবু চলে গেলেন কিন্তু হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়া পুরানো দিনের আধুনিক গানের মত বারবার ফিরে আসবেন তিনি, ফিরে আসবেন প্রিয় মেদিনীপুরবাসীর হৃদয়ে।

Related Articles

Back to top button
Close