fbpx
গুরুত্বপূর্ণব্লগহেডলাইন

সুপ্রিম রায়ই ঠিক প্রমাণিত হচ্ছে অযোধ্যায়

অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়: অযোধ্যার বিবদমান জায়গাটি বিগত কয়েক শতক ধরে অসংখ্য সংঘর্ষ প্রত্যক্ষ করেছে। ঊনবিংশ শতকেও ব্রিটিশ কোর্টে ঐ জায়গাটির দখল নিয়ে মামলা চলে।স্বাধীনতার পর থেকেই ভারতবর্ষের বিভিন্ন আদালতে এই নিয়ে মামলা চলেছিল। অবশেষে সুপ্রিমকোর্ট ২০১৯-এর ৯ নভেম্বর তার ১০৪৫ পাতার রায়ে বলে, ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ-এর উৎখনন থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, ‘‘মসজিদটি খালি জমিতে তৈরি হয়নি।

একটি অ-ইসলামিক কাঠামোর অস্তিত্ব মসজিদের তলায় পাওয়া গেছে।’’ সুপ্রিম কোর্ট তার রায়ে ঐ তথাকথিত ‘বিতর্কিত’ ২.৭ একর জমি রামলালার বলে মেনে নেয় এবং বলে কেন্দ্রীয় সরকারকে ৩ মাসের মধ্যে এই বিষয় নিয়ে একটি ট্রাস্ট গঠন করতে হবে।এই ট্রাস্টই রামজন্মভূমিতে রামমন্দির নির্মাণের বিষয়টি দেখভাল করবে।এছাড়া অযোধ্যার মধ্যেই ৫ একর জমি মসজিদ নির্মাণের জন্য দেওয়া হবে সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডকে।

সুপ্রিমকোর্ট এই রায় দেয় ঐতিহাসিক তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে।কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার ভারতবর্ষের কিছু মানুষ এই সুপ্রিম রায়ের বিরোধিতা করতে থাকে।তারা বলতে থাকে ‘‘সুপ্রিমকোর্ট ঐতিহাসিক তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে নয়- আবেগের বশে রায় দিয়েছে’’। আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে এই বক্তব্য গুলিছিল ‘বাম-লিবারেল’ গোষ্ঠীর। এদের যোগ্যসঙ্গত দিতে থাকে একদল বামপন্থী তথাকথিত ‘ইতিহাসবিদ’।

আমরা জানি যে মধ্য যুগে বহিরাগত আক্রমণকারীদের দ্বারা হাজার হাজার হিন্দু-বৌদ্ধ জৈনমন্দির ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং বহু জায়গাতেই পুরনো মন্দিরের ওপরেই মসজিদ নির্মিত হয়। মধ্যযুগের মুসলিম ঐতিহাসিক ও লেখকদের লেখা থেকেই অসংখ্য এই ধরণের প্রমাণ পাওয়া যায়। ভারতবর্ষে মুঘল শাসনের প্রতিষ্ঠাতা বাবরের নির্দেশে তাঁর সেনাপতি মীরবাঁকি রামজন্মভূমি অযোধ্যায় রামচন্দ্র সম্পর্কিত সমস্ত মন্দির ধ্বংস করে ১৫২৮-এ একটি মসজিদ স্থাপন করেন। এই মসজিদটি বাবরি মসজিদ নামে বেশি পরিচিত, কিন্তু১৯৪০-এর দশকের আগে এটি পরিচিত ছিল ‘মসজিদ-এ-জন্মস্থান’ নামে। মসজিদটি একটি ছোট টিলার ওপর অবস্থিত- যার নাম ‘রামকোট’ (রামের দুর্গ)।

ভারত সরকার কর্তৃক পদ্মশ্রী পুরষ্কারে সম্মানীত ভারতীয় পুরাতত্ত্বসর্বেক্ষণ (ASI)-এর প্রাক্তন রিজিওনাল ডিরেক্টর (উত্তর) ও সুপারিন্টেনডেন্ট আর্কিওলজলিস্ট প্রখ্যাতপ্রত্নতত্ত্ববিদ কে. কে. মুহাম্মদ-এর নেতৃত্বে একটি দল অযোধ্যার বিতর্কিত জায়গায় উৎখনন চালিয়ে মসজিদের তলায় পুরনো স্থাপত্যের হদিস পান। মুহাম্মদ ২০১৬ তে মালায়লম ভাষায় প্রকাশিত তাঁর আত্মজীবনীতে (যার বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ‘আমি একজন ভারতীয়’) লেখেন যে,মার্ক্সবাদী ইতিহাসবিদরা কট্টরপন্থী মুসলিমগোষ্ঠীগুলিকে সমর্থন করায় অযোধ্যা বিতর্কের গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছনো কঠিন হয়ে পড়ে। মুহাম্মদ এই বইয়ে দাবি করেছেন, অযোধ্যায় হওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যে মসজিদের তলায় মন্দির থাকার পরিষ্কার প্রমাণ পাওয়া গেছে- কিন্তু বামপন্থী ইতিহাসবিদরা একে অস্বীকার করে এলাহাবাদ হাইকোর্টকে ভুল পথে চালানোর চেষ্টা করে।

২০০৩-এ ‘ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ’ এলাহাবাদ হাইকোর্টে রিপোর্ট জমা দেয় যে, মসজিদের নীচে খ্রীষ্টীয় দশম শতকের একটি স্থাপত্য রয়েছে। এবং ঐ অঞ্চলটিতে অন্তত ৩৩০০ বছর আগে থেকে মানুষ বসবাস করত। এবং অন্তত ১০০০ বছরের পুরনো স্থাপত্যের ওপর এই মসজিদটি খ্রীষ্টীয় ষোড়শ শতকের প্রথম দিকে তৈরি করা হয়।

২০১০-এ তার রায়ে এলাহাবাদ হাইকোর্ট ASI-এর এই সন্ধানকে মান্যতা দিয়ে মেনে নেয় যে, ঐ জায়গাটিতে একটি বৃহদাকার হিন্দুধর্মীয় স্থাপত্য ছিল।

২০২০ সালের ১১ মে থেকে রাম মন্দির নির্মাণের জন্য ধ্বংসস্তূপ সরানো ও ভূমি সমতল করার কাজ শুরু হয়েছে। আর এর পর থেকেই বিভিন্ন ঐতিহাসিক দ্রব্যাদি পাওয়া যাচ্ছে ঐ জায়গাটিতে। ‘টাইমস নাও’ ও ‘জি নিউজ’ ২১-এ মে জানাচ্ছে, জায়গাটিতে উৎখননের সময় একটি ৫ ফুটের শিব লিঙ্গ, ৭টি কাল কষ্টিপাথরের স্তম্ভ, ৬টি লাল বেলেপাথরের স্তম্ভ এবং বিভিন্ন দেবতা ও দেবীদের ভাঙ্গা মূর্তি পাওয়া গেছে।

শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাই জানাচ্ছেন, ‘‘উৎখননের সময় ধ্বংসস্তূপ থেকে বিভিন্ন স্তম্ভ, বেলেপাথরের ওপর বিভিন্ন খোদাই করা কাজ পাওয়া যাচ্ছে। আর ধ্বংসস্তূপে একটি শিবলিঙ্গ ও আরেকটি শিবলিঙ্গ কুবের টিলায় পাওয়া গেছে।’’

বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মুখপাত্র বিনোদ বনসল বলেছেন, ‘‘১১ই মে উৎখনন শুরু হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন ঐতিহাসিক দ্রব্য পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে পাথরে খোদিত ফুল, কলস, আমলক, দরজার পাশের অংশ (Doorjamb) প্রভৃতি প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস পাওয়া যাচ্ছে।’’

কে.কে. মুহাম্মদ ২০১৮-এ বলেন, অযোধ্যায় বিস্তারিত সার্ভে করতে গিয়ে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ-এর দলটি ‘‘ইটের তৈরি ভিতের খোঁজ পায়, যারও পর পূর্বে যে মন্দিরটির অস্তিত্ব ছিল তার স্তম্ভগুলো গড়ে উঠেছিল।’’

‘DNA’-তে একটি প্রবন্ধে মুহাম্মদ লেখেন, ‘‘বাবরি মসজিদের দেওয়ালগুলিতে মন্দিরের স্তম্ভগুলি গাঁথাছিল এবং এই স্তম্ভগুলি কালব্যাসল্ট পাথরের তৈরি ছিল।’’ প্রাচীন ভারতীয় মন্দিরের শিল্পরীতিতে ‘পূর্ণকলস’ ছিল আটটি মঙ্গলজনক সমৃদ্ধির প্রতীকের মধ্যে অন্যতম।
১৯৯২-এ মসজিদটি ধ্বংস করার আগে এই ধরণের ১২টি স্তম্ভের হদিস পাওয়া যায়- যেগুলির তলায় পূর্ণকলস উৎকীর্ণ করা ছিল বলে মুহাম্মদ জানাচ্ছেন।

মুহাম্মদ যিনি ASI-এর দলের অযোধ্যায় চালানো প্রথম উৎখনন কার্যের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি নয়ের দশক থেকেই দাবি করছেন যে তথাকথিত বিতর্কিত জমিটিতে যেপূর্বে একটি মন্দির ছিল তার যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ অযোধ্যায় প্রথম উৎখননের কাজ করে ১৯৭৬-৭৭ সালে।এই দলের সদস্য মুহাম্মদ বলেন যে, প্রখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ বি.বি.লাল-এর নেতৃত্বে এই দল আবিষ্কার করে যে ১২টি স্তম্ভের ওপর মসজিদটি দাঁড়িয়ে আছে,তা মূলত আগের কোন মন্দিরের স্থাপত্যের অংশ।

মুহাম্মদ বলেন যে, পোড়া মাটির তৈরি মানুষও পশুর বিভিন্ন ভাস্কর্য পাওয়া গেছে যা থেকেও এখানে পূর্বে কোন মন্দিরের অস্তিত্বই প্রমাণিত হয়-কারণ, এগুলি ইসলামে নিষিদ্ধ।
মুহাম্মদ আরও বলেছিলেন যে, প্রথম উৎখননে পাওয়া ১২টি স্তম্ভের পাশাপাশি দ্বিতীয় উৎখননে আরও ৫০টি স্তম্ভমূল (Pillar base) পাওয়া যায় ১৭টি সারিতে।আরেকটি স্থাপত্য পাওয়া গেছিল যাতে ‘মকরপ্রণালী’ (কুমিরেরমুখযুক্ত)ছিল।মকর হল মা গঙ্গার বাহন।

মুহাম্মদ বলেন, মকর বা কুমীর হল গঙ্গা-র প্রতীক এই ধরণের কাজ মূলত মন্দিরের গর্ভগৃহ যাওয়ার পথে দেখা যায়।এই ধরণের শিল্পকলার নিদর্শন শুধুমাত্র মন্দিরে পাওয়া যায় বলেও মুহাম্মদ বলেন।


প্রত্নতত্ত্ববিদ কে. কে. মুহাম্মদের দাবি এবং সুপ্রিম কোর্টের রায় যে যথার্থ ছিল তা রাম মন্দির নির্মাণ কার্য শুরু হওয়ার আগে মাত্র ১০ দিনের ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার ও ভূমি সমতল করতে গিয়ে প্রাপ্ত পুরনো মন্দিরের বিভিন্ন ধ্বংসাবশেষ থেকেই বোঝা যাচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের রায় আসার পরও বিভিন্ন বামপন্থী ইতিহাসবিদরা এই রায়ের ঐতিহাসিক সত্যতা মেনে নিতে চাননি।ভারতবর্ষের বামপন্থী মহলে অত্যন্ত জনপ্রিয় দু’জনই ইতিহাসবিদ হলেন ইরফান হাবিব ও রোমিলা থাপার।

ইরফান হাবিব বলেছিলেন যে, বাবরির নীচে কোন রামমন্দিরের অস্তিত্ব নেই। রোমিলা থাপার বলেন, ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দিরের কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না।রায়ের পর বিভিন্ন খ্যাতনামা বামপন্থী ইতিহাসবিদরা সংবাদপত্র সহ নানান জায়গায় কলম ধরে ওখানে মন্দিরের কোনদিনই কোন অস্তিত্ব ছিল না প্রমাণে সচেষ্ট হন। এমন ভাবার কোনও কারণ নেই যে এই বিখ্যাত ইতিহাসবিদরা সত্যিটা জানতেন না। যত খননকার্য চলবে ততই ঐ স্থানে মন্দিরের অস্তিত্বের প্রশ্নাতীত নতুন নতুন প্রমাণ ওঠে আসবে। এখন এটাই দেখার যে বামপন্থী ইতিহাসবিদরা তাঁদের ‘ভুল’-কে মেনে নেন, নাকি তাঁদের মিথ্যার বেসাতি অব্যাহত রাখেন।

(মতামত নিজস্ব) 

Related Articles

Back to top button
Close