fbpx
আন্তর্জাতিকদেশব্লগহেডলাইন

করোনার সঙ্গে ‘টাগ অফ ওয়ার’ সারা বিশ্ববাসীর

ভাস্করব্রত পতি, তমলুক : হ্যাঁ, দড়ি টানাটানি খেলাই শুরু হয়েছে করোনা ভাইরাস বনাম মানবজাতির মধ্যে। এ তো ‘গ্রেটেস্ট শো অফ দি আর্থ’ হতে চলেছে এই মুহূর্তে। বিশ্বজুড়ে মহাসংকট রূপে একটা মারণ খেলা দানা বেঁধেছে রাশিয়া থেকে ইটালি, ভারত থেকে জার্মানি। এ যেন একটা সুপার বিশ্বকাপে মেতে উঠেছে করোনা। আর বিশ্বকে কাঁপিয়ে প্রতিপক্ষের দু’লক্ষের বেশি প্রতিযোগীর প্রাণ কেড়ে নিয়ে মহোল্লাসে করোনার যেন চিল চিৎকার “মোগাম্বো খুশ হুয়া’!
প্রাচীন গ্রিস, চিন ও মিশরে বহুল প্রচলিত ছিল “দড়ি টানাটানি” খেলা। রাজস্থানের পুস্কর মেলাতেও আয়োজিত হত এটি। একসময় অলিম্পিক খেলায় এ খেলা ছিল। অবাক হ’লেন? ১৯০০ থেকে ১৯২০ পর্যন্ত অন্যান্য খেলার সঙ্গে সমোচ্চারিত হত “দড়ি টানাটানি’’। আমরা কেউ বলি “কাছি টানাটানি”। আর বিশ্ববাসী চেনে “রোপ ওয়্যার”, “টাগ অফ ওয়্যার”, “টাগ ওয়্যার” বা “আফ্রিকান্স” নামেও।

১৯০৮ সালে অলিম্পিকে সোনা জেতে আমেরিকা। এই টিমে সবাই ছিল পুলিশ।
সেদিন সোনা জিতলেও আজ করোনা ভাইরাসের সঙ্গে ‘টাগ অফ ওয়ার’-এ হেরে ভূত বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ আমেরিকা। মৃত্যু সংখ্যা প্রায় ষাট হাজার! বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। অসুস্থ হয়েছে লক্ষাধিক। রোগের সঙ্গে লড়াইতে তাঁরা গোহারান হেরেছে আজ। এত উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও আমেরিকার মতো দেশে এখন মৃত্যুর মিছিল। কান্নার লোক নেই!

আমাদের দেশ ভারতেও এখন তুঙ্গে দড়ি টানাটানি খেলা। কে জিতবে, কে হারবে! এখানে সরকার রেফারি। কিন্তু করোনার প্রতিপক্ষ দেশের জনগণ। অথচ রেফারি চায় জনগণ জিতুক। এই প্রতিযোগিতায় জেতার একটাই স্ট্র্যাটেজি, তা হল তুমুলভাবে লকডাউন মানতে হবে। কিন্তু মনে হয়, ভারতের কিছু জনগণ খেলার দান ছেড়ে দিতে চাইছে। রেফারির ছিল চিৎকার ‘লক ডাউন মানুন, লক ডাউন মানুন’। কে শোনে কার কথা!

গ্রাম বাংলায় এই লৌকিক ক্রীড়াটি এখন সব হারানোর দলে। কিছু কিছু গ্রামে এখনও টিকে আছে টিমটিম করে। পেশীশক্তির চূড়ান্ত প্রয়োগ দেখা যায় এই লোকক্রীড়াতে। আসলে এর মাধ্যমে সেটাই প্রমাণিত হয় যে, দলবদ্ধভাবে থাকলে কেউ কোনওভাবেই আটকাতে পারবে না।
পূর্ব মেদিনীপুর জেলার হাউর অঞ্চলের জগন্নাথচক গ্রামে আয়োজিত হয় কেবলমাত্র মেয়েদের দড়ি টানাটানি খেলা।

দিঘার রামনগরেও হয়। বাংলাদেশের চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার হোগলডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে হোগলডাঙ্গা যুব সংঘের উদ্যোগে গত বছরের ডিসেম্বরে আয়োজিত হয়েছিল এই কাছি টানাটানি। মোট ৩২ টি দল অংশ নেয়। প্রথম পুরস্কার ছিল একটি এঁড়ে গরু !! আর দ্বিতীয় পুরস্কার ছিল বড়সড় ছাগল। পশ্চিমবঙ্গের বসিরহাট মহকুমাতেও আয়োজিত হয় এই খেলা।

একসময় স্কুলগুলোতে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতাতে ছিলো দড়ি টানাটানি। আজ আর হয় না। এখন কেবল বাংলা প্রবাদেই সীমাবদ্ধ ‘দড়ি টানাটানি’।

ফের দড়ি টানাটানি খেলা শুরু হয়েছে সারা বিশ্বজুড়ে। আমরা সবাই অংশ নিয়েছি। কোভিড -১৯ যেন রীতিমত প্র্যাকটিস সেরে এসে আমাদের চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। তাঁর লক্ষ্য ট্রফি জেতা নয়। আমাদের শেষ শ্বাসবায়ুটুকু তাঁর চাইই চাই। আর আমরা বোকার মতো মাথা নত করে ‘টাগ অফ ওয়ারে’র দড়ি ছেড়ে দিচ্ছি নিজেদের অবিবেচকতার পরিচয় দিয়ে।

বাজারে যাওয়া, সামাজিক দূরত্ব বজায় না রাখা, নিয়মিত হাত না ধোওয়া ইত্যাদিগুলো বজায় রাখছি এই কঠিন পরিস্থিতিতেও। অথচ রেফারির নির্দেশ, এইসব নিয়ম মানতেই হবে করোনার সঙ্গে দড়ি টানাটানি খেলায় জিততে হলে। পাখি পড়ার মতো পড়ানো হচ্ছে নানাভাবে। অথচ মগজে ঢুকছে না এক শ্রেণীর বেহুদ্দা লোকজনের। আসলে দড়ির এই প্রান্তে আমরা যাঁরা ধরে আছি প্রত্যেককেই সমান টান দিতে হবে। তবেই জয় নিশ্চিত।

আমরা যদি জিতি, তবে বাঁচবে আমাদের ভবিষ্যৎ। সুরক্ষিত থাকবে আমাদের জীবনের রূপ রস গন্ধ আর ছন্দ। আমরা এগিয়ে যাব সামনের দিকে। আর যদি হেরে যাই, তবে পিছিয়ে পড়ব কয়েক দশক আগে যেমন ছিলাম, সেখানে। ভেঙে পড়বে অর্থনীতি। কাজ হারাবে মানুষ। স্বজন বিয়োগের যন্ত্রণা নিয়ে গুটি কয়েক মানুষ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শোনাবে দু’ হাজার বিশ সালের কুখ্যাত দড়ি টানাটানি খেলার চরম বিয়োগান্তক কাহিনি।

জানাবে, আমাদের অপরিণামদর্শিতার জন্য আমরা হেরে গিয়েছি এই লড়াইতে। সেয়ানে সেয়ানে লড়াইতে জয় আমরা ছিনিয়ে আনতে পারিনি আমাদের অশিক্ষা, অহঙ্কার, তাচ্ছিল্যতাবোধ আর লোভ লালসাকে বশ করতে না পারার জন্য। আমরা নষ্ট করেছি আমাদের সুন্দর পৃথিবীটাকে নিজের হাতে তুলে।

Related Articles

Back to top button
Close