fbpx
অন্যান্যঅফবিটকলকাতাহেডলাইন

তরঙ্গ কথা

পর্ব-৭

মনীষা ভট্টাচার্য: ‘গোলপোস্টের দিকে দুই দলই এগোচ্ছেন। বিপক্ষদলের খেলোয়াড়ের পায়ে বল। ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন অন্যপক্ষ। গোলরক্ষকও বেশ সতর্ক। কিন্তু না, সব সতর্কতাকে উপেক্ষা করে গো-ও-ও-ও-ল।’ এইভাবেই কলকাতা বেতার শ্রোতাদের মনে তোলপাড় তুলতেন। শ্রোতাদের চোখের সামনে মাঠের প্রতিটা কোণা, প্রতিটা খেলোয়াড়ের অভিব্যক্তি সবকিছুই জ্বল জ্বল করত ঘোষকের ধারাভাষ্যে। শোনা যায়, মাঠের উত্তেজনা অনেক সময়ই ঘরময় ছড়িয়ে পড়ত। হাতাহাতি বেধে যেত ট্রানজিস্টার ভাঙাভাঙি হত। সে যাই হোক, সত্যি একটা সময় ছিল যখন রেডিওতে খেলার ধারাবিবরণীর জনপ্রিয়তা ছিল  শীর্ষে। শ্রোতারা শুধু শুনতেন না, চিঠিও লিখতেন। কেমন ছিল সেই সব দিন? কীভাবে, কবে থেকে শুরু হল রেডিওতে ধারাভাষ্য?

ফুটবল নিয়ে কথা বলতে বসলে অনেককেই সেই ১৯১১ সালে মোহনবাগানের ঐতিহাসিক জয়ের স্মৃতিরোমন্থন করতে শুনেছি। কিন্তু এই কলকাতার বুকে ফুটবল খেলা জন্ম নিল কেমন করে সে কথা প্রবীণেরা জানলেও, অনেক নবীনেরাই হয়তো জানেন না। কলকাতার মাঠে প্রথম ফুটবল খেলা শুরু হয় ১৮৯২ সালে। তার আগে সাহেবরা খেলতেন রাগবি। সেটা ১৮৭৮-৭৯ সাল। একদিন ময়দানের পাশ দিয়ে  যেতে যেতে ক্যালকাটা (বর্তমান মোহনবাগান) মাঠ থেকে একটি বল রাস্তার উপর হঠাৎই এসে পড়ায়, গাড়ি থামিয়ে এক বালক বলে লাথি মেরে ফেরত পাঠিয়েছিল মাঠে। সাহেবরা চিৎকার করে মাঠ থেকে বলেছিলেন, ‘কিক ইট বয়, কিক ইট’। বালকের নাম নগেন্দ্রনাথ সর্বাধিকারী। ইনি বাঙালির মগজে ও মনে ফুটবলকে পরিচিত করার সর্বপ্রথম পুরুষ। তিনি পড়তেন হেয়ার স্কুলে। পরের দিন স্কুলে তাঁর বন্ধুদেরকে এই খেলার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করলে, স্কুলের মাঠেই এই খেলা নিয়মিত শুরু হয়েছিল। তবে যে বল নিয়ে তাঁরা খেলতেন সেটি ছিল রাগবি বল। পরে প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রফেসার স্ট্যাক এই দেখে নিজে একটি ফুটবল কিনে এনে বই থেকে বুঝিয়ে বুঝিয়ে ছেলেদেরকে এই খেলা শিখিয়েছিলেন।

স্বাধীনতার আগে থেকেই কলকাতার মাঠে বিভিন্ন ফুটবল ম্যাচ হত এবং তার ধারাবিবরণী আকাশবাণীতে সম্প্রচারিতও হত। বাঙালির মাতামাতির অন্যতম বিষয় যে ফুটবল এবং এই ফুটবলের সঙ্গে বেতারের সুসম্পর্ক তৈরি হলে যে বেতারেরই জনপ্রিয়তা বাড়বে এ কথা বুঝেছিলেন তৎকালীন স্টেশন ডিরেক্টর স্টেপলটন।  তাই ১৯৩০ সালের মে মাস থেকে মাঠ থেকে সরাসরি ধারাভাষ্য শুরু হয় বেতারে। তবে সে ধারাবিবরণী ছিল ইংরেজিতে। ১৯৩৪ সালে প্রথম শুরু হয় বাংলায় ধারাভাষ্য। এই ভাবনার পিছনে ছিলেন তৎকালীন ভারতীয় প্রোগ্রাম ডিরেক্টর নৃপেন্দ্রনাথ মজুমদার। বাংলায় প্রথম ধারাভাষ্য দেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, সঙ্গে ছিলেন রাইচাঁদ বড়াল।  প্রথম বাংলা ধারাবিবরণীর একটু নমুনা দিই বীরেনবাবুর স্মৃতিকথা থেকে। ‘নমস্কার।  এইবার আমরা কলকাতা ফুটবল খেলার মাঠ থেকে রিলে আরম্ভ করছি। আজ মোহনবাগানের সঙ্গে ক্যালকাটা ক্লাবের রিলে-থুড়ি, খেলা হবে। ও রাই, নামগুলো বল না। রাইচাঁদবাবু তন্ত্রধারকের মতো নাম বলতে শুরু করলেন, বীরেনবাবু পুনরাবৃত্তি করতে লাগলেন …মশাই মাঠে খুব ভিড়, ওই বল চলেছে…হ্যান্ড বল। এ কথায় রাইচাঁদবাবু সহ মাঠের সব সাহেব মেমরা হেসে উঠলেন। রাইবাবু বললেন, গোলকী হাতে ধরলে  হ্যান্ডবল হয়রে গাধা?’ আসলে বীরেনবাবু একেবারেই ফুটবল খেলা বুঝতেন না, তাই সঙ্গে নিয়েছিলেন রাইচাঁদবাবুকে। সব থেকে বড় কথা সেই সময় আকাশবাণীতে বীরেনবাবু ছাড়া ধারাভাষ্যের উপযুক্ত মানুষ আর কেউ ছিলেন না। কর্তৃপক্ষ সেটা জানতেন, তাই ফুটবল বিষয়ে বীরেনবাবুর অজ্ঞতার কথা জানা সত্বেও কর্তৃপক্ষ ওনাকেই পাঠিয়েছিলেন। যাইহোক, প্রথমদিনের বাংলা ধারাবিবরণী এইভাবেই উতরে গেল। ইতিহাস বলছে, সেই ১৯৩৪-এর পর, ১৯৪৮ সালে খেলোয়াড় নির্মল চট্টোপাধ্যায়কে দিয়ে ধারাবিবরণী দেওয়ানো হয়। কিন্তু এই দ্বিতীয় প্রয়াসও তেমন ভাবে সাড়া ফেলেনি। অবশেষে বাংলা ধারাবিবরণী সম্প্রচারের সঠিক চিত্র পাওয়া গেল ১৯৫৭ সালের ১৫ জুলাই, অজয় বসু ও পুষ্পেন সরকারের কণ্ঠে। প্রথম দিনই বাজিমাত। নিজের ভাষায় ধারাভাষ্য পেয়ে শ্রোতারাও খুব খুশি হলেন।

ধারাভাষ্যকার অজয় বসু

এবার আসি ভাষ্যকার অজয় বসুর নানা কথায়। মাঠ থেকে ধারাভাষ্য শুনে তো আমরা উত্তেজিত, কিন্তু কেমন ছিল সেই পরিবেশ? অজয়বাবুর কথা থেকে জানা যাচ্ছে, মাঠের গ্যালারির মাথায় এক কোণে ছোট্ট চিলকুঠুরীতে বসে মাইক্রোফোনে কথা বলতে হত। কুঠুরীটি রীতিমতো হালকা। একটু জোড়ে হাওয়া দিলেই কুঠুরীটি দোলে। শুধু হাওয়া নয়, গোল হলে আনন্দে দর্শকরা যখন উদ্বাহু হয়ে নৃত্য করেন, তখন তো কথাই নেই। বাক্সটি খুবই ছোট, তারই মধ্যে প্রায় ইয়ং ৫-৬জন মানুষ। বাক্সের সামনে ছোট্ট ঘুলঘুলি, তাতেই মাঠের ছবি দেখে বলে যাওয়া। কাঠের পলকা বাক্স, প্রাকৃতিক আর পরিস্থিতি, দুইয়ের হাওয়ায় বাক্সের দুলুনী সবই মানিয়ে নেওয়া সম্ভব, কিন্তু আনন্দের উত্তেজনায় গ্যালারির বেঞ্চে দর্শকেরা দাঁড়িয়ে পড়লেই ভাষ্যকারের চোখে অন্ধকার।  না দেখতে পেলে কী বলবেন।  থামাও সম্ভব নয়।  বানিয়ে বললেও বিপদ। তখন মাঠের দর্শকরাই বলে বসেন ‘কী গুল মারছেন দাদা’। এখানেই শেষ নয়, খেলার হার জিতের পর মাঠের দর্শকদের কুরুচীকর মন্তব্যও বেতারের মাইক্রোফোনে ধরা পড়ে। সেসব বিষয় নিয়ে আকাশবাণীতে চিঠিপত্রও আসতে থাকে। তাছাড়া এর পাশাপাশি দর্শকদের সরাসরি হুমকি তো ছিলই।

অজয় বসুর সঙ্গে সহযোগী কমল ভট্টাচার্য

 

ফুটবলের পাশাপাশি ক্রিকেটের ধারাবিবরণীও বেতারে প্রচারিত হত। চারের দশকে এই সম্প্রচার হত মুম্বই কেন্দ্র থেকে। স্বাধীনতার পর ১৯৪৮ – এ প্রথম ভারতীয় স্তরে টেস্টম্যাচের বেতার বিবরণ সরাসরি মাঠ থেকে প্রচারিত হয়। সে বিবরণী অবশ্যই ইংরেজিতে ছিল। পরবর্তীতে ক্রিকেটের ক্ষেত্রেও ১৯৫৯ সাল থেকে বাংলাতে ধারাভাষ্য শুরু হয়। রাজার খেলা রাজার ভাষাতেই শুনতে ভালো লাগবে, এই চিন্তাধারাকে প্রথমদিনই কলকাতা বেতার ভাঙতে সক্ষম হয়েছিলেন। পরবর্তীর্তে দেখা গেছে গ্রামের মানুষ, যাঁদের নিজস্ব ট্রানজিস্টার নেই, তাঁরা খেলা শোনবার জন্য দোকানের সামনে ইঁট পেতে জায়গা রেখে যেতেন। আজ অবস্থার পরিবর্তন হলেও, সেই সময় এই বাংলা ধারাবিবরণীর মাধ্যমে বাংলা শব্দকোষে যুক্ত হয়েছিল বেশ কিছু নতুন শব্দ। বিশেষ করে ক্রিকেটের ধারাবিবরণী দিতে গিয়ে কিছু শব্দ যেমন ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং, গালি, মিড অফ প্রভৃতি শব্দগুলো ইংরেজিতেই বলা হত। তবে এই ধারাভাষ্যে বেশ কিছু সুন্দর প্রতিশব্দ ব্যবহৃত হতে শুরু করে যা আজও শোনা যায়। যেমন, রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে খেলা (ডিফেন্সিভ), পিছিয়ে এসে মারা (ব্যাকফুট), তালুবন্দি (ক্যাচ ধরা) ইত্যাদি। ফুটবলের ধারাভাষ্যে অজয় বসু ও পুষ্পেন সরকার যেন খুব পরিচিত নাম, তেমনই ক্রিকেটের ধারাভাষ্যে কমল ভট্টাচার্যে নাম উল্লেখযোগ্য।

খেলার এই ধারাভাষ্য এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল যে সেই সময় এই ধারাভাষ্যকে কেন্দ্র করে বহু কৌতুকনক্সা রেকর্ডবন্দী হয়েছে, বিভিন্ন সিনেমায় ব্যবহৃত হয়েছে ধারাভাষ্যের দৃশ্য (‘ধন্যিমেয়ে’, ‘ওরা থাকে ওধারে’), এমনকী নান্দীকার প্রযোজিত নাটক ‘ফুটবল’- এর সূচনাতেও রাখা হয়েছিল ধারাভাষ্যের রেশ। সেই রেশ নিয়েই শেষে বলি, আজকের মতো পরিসর শেষ, পেনাল্টির সুযোগে, রেফারির হুইসেলে, কলেবর বৃদ্ধি আজও সাদা কাগজের জালে বন্দি হল। গো-ও-ও-ও-ল।

(ক্রমশ চলবে…)

 

 

 

 

 

 

 

Related Articles

Back to top button
Close