fbpx
আন্তর্জাতিকব্লগহেডলাইন

আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাগত বিমান ছিনতাইকারী সন্ত্রাসবাদী

মানস রায়: আরব-ইসলাম-বামপন্থী জোটের রমরমা আমেরিকার বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে, রাজনীতির অঙ্গনেও ডেমোক্রাটিক পার্টির নীতি নির্ধারণে সক্রিয় ও অনেকাংশে সফল এই জোট। যার সঙ্গে অমত সে হয় ফ্যাসিস্ট নয় ইসলামফোবিক। সেই সুবাদে মিডিয়া বা অন্যত্র ইসলামি সন্ত্রাসের বিবরণ থেকে ইসলামকে উধাও করা, সন্ত্রাস বা অত্যাচারকে লঘু করে দেখানো নিয়মে দাঁড়িয়ে গেছে। তিন সপ্তাহ আগে নাইন ইলেভেন বা নয়ই সেপ্টেম্বরের নিউইয়র্ক-ওয়াশিংটন ডিসি তে ইসলামী বিমান ছিনতাইকারীদের ধ্বংসলীলার দুই দশক স্মরণ অনুষ্ঠানে অপরাধীদের নাম, ধাম (কোন দেশের নাগরিক) ও ধর্মীয়-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে নীরবতা পালন করেছে সবার।

মিডিয়ায় অনেকেই এই ঘটনাকে প্রায় একটি বিমান দুর্ঘটনার পর্যায়ে নামিয়ে এনেছেন। যে আক্রমণে তিন হাজার মানুষ নিহত, পঁচিশ হাজার মানুষ আহত। হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি বিনস্ট হয় সেই ঘটনাকে ‘something, something’ বলে তাচ্ছিল্য করেছেন এক ডেমোক্রেটিক কংগ্রেস ওম্যান, ডেমোক্রেটিক পার্টি নিন্দা করেনি তার এই বক্তব্যের ইসলামী সন্ত্রাস বা অত্যাচারকে শুধু লঘু করে দেখানো বা অপরাধীদের হিরো বা হিরোইন বানানোর ঘটনাও ঘটছে আকছার। এই রীতি অনুসারে সান ফ্রান্সিসকো স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় গত ২৩ সেপ্টেম্বর বিমান ছিনতাইকারী লায়লা খালেদকে আমন্ত্রণ জানায় “Whose Narratives? Gender, Justice and Resistance.” শীর্ষক আলোচনা চক্রে. এই চক্রের আয়োজক ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের Arab and Muslim Ethnicities and Diasporas Studies program (AMED).অবশ্য লায়লা সান ফ্রান্সিসকো আসবেন না, আলোচনায় যোগ দেবেন ‘জুম’এর মাধ্যমে.

আলোচনা চক্রটির জুম লাইভ প্রসারণ শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠেনি। কারণ লায়লা খালেদ Popular Front for the Liberation of Palestine (PFLP)এর সদস্য এবং এই সংগঠনটি আমেরিকায় একটি সন্ত্রাবাদী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ. জুম জানিয়েছে আমেরিকায় নিষিদ্ধ সন্ত্রাস সমর্থনকারী সংগঠনের সদস্যের ভাষণ প্রচার করা সম্ভব নয়। ফেসবুক ও পরে এই অনুষ্ঠানের প্রচারপত্র তাদের সাইট থেকে সরিয়ে দেয় কারণ হিংসা ও সন্ত্রাসের সমর্থনকারী সংগঠন বা ব্যক্তির প্রচারের সঙ্গে ফেসবুক যুক্ত থাকতে রাজি নয়।

আরও পড়ুন:হিংসামুক্ত পশ্চিমবঙ্গ গড়াই হবে গান্ধীজীর প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধাজ্ঞাপন

কে এই লায়লা খালেদ? সারা পৃথিবীতে বিমান যাত্রাকে বিপজ্জনক করে তোলার ফিলিস্তিনি সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের প্রথম নায়িকা ইনি। পঞ্চাশ বছর আগে (১৯৬৯) রোম থেকে ইজরায়েলগামী আমেরিকান বিমান ছিনতাই করে নিয়ে যান সিরিয়ায়, বন্ধু মুসলিম রাষ্ট্র সিরিয়া এই অপরাধের জন্য এই দুষ্কৃতকারীকে শাস্তি না দিয়ে সসন্মানে মুক্তি দেয়। প্রথম বারের সাফল্য তাকে উৎসাহিত করে আবার এই অপরাধের পথে। এক বছর বাদে ১৯৭০ সালে লায়লা ও তার সহযোগীরা দ্বিতীয় বার বিমান ছিনতাই করেন। তবে দ্বিতীয়বারের প্রচেষ্টা ভেস্তে যায়, কারণ সেটি ছিল ইজরায়েলি বিমান, পাইলট ও এয়ার মার্শালদের কৌশলে লায়লার সহযোগী বিমানের ভিতরেই নিহত হয় এবং অচৈতন্য লায়লাকে নিয়ে বিমান লন্ডনে অবতরণ করে. লায়লা গ্রেফতার হন। কিন্তু একই দিনে ফিলিস্তানি সন্ত্রাসবাদীরা আরেকটি বিমান ছিনতাই করে জর্দানে নিয়ে যায় এবং ওই বিমানের যাত্রীদের বিনিময়ে লায়লা খালেদ মুক্তি পান। ঠিক যেভাবে ২০০০ সালে ইসলামী মৌলবাদীরা এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান ছিনতাই করে যাত্রীদের প্রাণের বদলে কুখ্যাত সন্ত্রাসবাদী মাসুদ আজহার ও আরও দুজন সন্ত্রাসবাদীর মুক্তি আদায় করে।

শত শত নিরপরাধ যাত্রীর প্রাণ নিয়ে ছিনিমিনি করা এই বিমান ছিনতাইকারী তার এই সমাজবিরোধী কার্যকলাপের জন্য কোনদিন অনুশোচনা করেননি। প্রয়োজনও পড়েনি। স্বাভাবিক ভাবে আরব ও ইসলামী দুনিয়ায় অন্যান্য অনেক সন্ত্রাসবাদীর মতন লায়লা খালেদ এক বিপ্লবী নায়িকার সন্মান পান, বিশেষ করে প্রথম নারী বিমান ছিনতাইকারী বলে কথা।
অসংখ্য সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ সত্ত্বেও ইওরোপে ফিলিস্তানি আন্দোলনের প্রতি সহানুভুতির চিরকালই প্রবল। তাই বিমান ছিনতাইকারী লায়লা সেখানের বাম, সমাজবাদী ও ইসলামী গ্রুপগুলির আইকন, নারী চে গেভারা। তাকে নিয়ে ফিল্ম হয়েছে, বেলফাস্টের বিশাল দেওয়ালে ম্যুরাল ও এদিক ওদিক আমন্ত্রিত ভাষণ। অবশ্যই বিমান ছিনতাইকারীকে বিপ্লবী নায়িকায় পরিবর্তন করতে কিছু উড়ো খবর বা মিথ তৈরি করা হয়েছে। যেমন, বিমান যাত্রীদের ক্ষতি করার উদ্দেশ্য তার ছিল না। তিনি নাকি বিমান যাত্রীদের প্রতি সৌজন্যশীল ছিলেন। যদিও ওই বিমানে তার আগের সিটের যাত্রা করা এক মহিলার বক্তব্য সম্পূর্ণ বিপরীত। দুই হাতে গ্রেনেড নিয়ে ছিনতাইকারীর সৌজন্য? হজম করা সত্যিই কঠিন।

লায়লা খালেদের বিমান ছিনতাই কোন আকস্মিক বিপ্লবী উদ্দীপনার ফসল নয় ১৯৬৮ থেকে ১৯৭৭, দশ বছরে উনত্রিশটি বিমান ছিনতাই বা ছিনতাই এর প্রচেষ্টা চালায় বিভিন্ন ফিলিস্তিনি গ্রুপ, মৃত্যু হয় বহু যাত্রীর। এতগুলি বিমান ছিনতাই ছাড়াও অন্যান্য সন্ত্রাসবাদী অপরাধী কার্য্যক্রম চালায় এরা, যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল ১৯৭২ মিউনিখ অলিম্পিকে অংশগ্রহণকারী নয় জন ইজরায়েলি ক্রীড়াবিদকে হত্যা করা। এই সব ফিলিস্তিনি গ্রুপ ছিলপ্যালেস্তেনিয়ান লিবারেশন অর্গনাইজেশন বা PLOর অঙ্গ। ইয়েসার আরাফত ছিলেন PLOর আমৃত্যু অবিসংবাদিত নেতা। এর পরও এতগুলি ইওরোপীও বিমান ও নাগরিকের হত্যাকান্ডের নায়ক আরাফতকে হিরো বানিয়ে সাদরে গ্রহণ করে ইওরোপ।

কিন্ত ইওরোপের কিছু দেশে এবং আমেরিকায় লায়লা খালেদ এখনও বিমান ছিনতাইকারী অপরাধী এবং প্রবেশ নিষেধ।
সান ফ্রান্সিস্কো স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় অবশ্যই জুম ও ফেসবুকের সিদ্ধান্তে খুশি নয়। তারা বিমান ছিনতাইকারীকে আমন্ত্রণের স্বপক্ষে জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় হল মুক্ত চিন্তার জায়গা. বিশ্ববিদ্যালয় সবারই মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে, সেই মত বিতর্কিত হলেও।

আরও পড়ুন:চিনে ধর্মীয় স্বাধীনতা নেই: মাইক পম্পেও

এখানে উল্লেখযোগ্য হল বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তচিন্তার ঘোষণা বিমান ছিনতাইকারীদের পক্ষে প্রযোজ্য হলেও অধিকাংশ আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষিণপন্থীদের মতামত প্রকাশের ওপর বাধা নিষেধ প্রচুর। আমন্ত্রিত বক্তাদের বর্ণ বিদ্বেষী, হেট স্পিকার, ইসলামফবিক ইত্যাদি তকমা পরিয়ে নিষিদ্ধ করা হয়। কখনও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অনুমতি দিলেও সেটা কার্যকর করা অসম্ভব হয়ে দাড়ায় বাম-ইসলামিক ছাত্র-শিক্ষক সংগঠনের বিক্ষোভে। তবু, এহেন অপরাধীকে সান ফ্রান্সিসকো স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক আমন্ত্রণ অনেককেই ভাবিয়ে তুলেছে। এরপর কি গুয়ানতানামোবে কারাগার থেকে নাইন ইলেভেন আক্রমণে অভিযুক্ত অপরাধীদের আমন্ত্রণ জানানো হবে আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ে? তিন হাজার আমেরিকান হত্যার দায় থেকে মুক্ত করা হবে তাদের? তারা হিরো বনে আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ও ছাত্রদের ইসলামি রাষ্ট্রের গুণবত্বার পাঠ পড়াবেন?

ইসলামি অপরাধীদের হিরো বানানো এক দুনিয়াব্যাপী প্রক্রিয়া। সুতরাং শিগগিরই হয়ত দেখা যাবে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় বা জেএনইউ মুম্বাই সন্ত্রাসের প্রযোজক হাফিজ সঈদ ভাষণ দিচ্ছেন এবং ছাত্র ছাত্রীরা সুবোধ বালক বালিকার মতন ভারতকে দার-উল-ইসলাম বানানোর প্রয়োজনীয়তার শিক্ষা সাদরে গ্রহণ করছেন। যদিও সেখানে বিবেক অগ্নিহোত্রীর ফিল্ম বা বাবুল সুপ্রিয়র ভাষণের কোনও স্থান নেই।

(মতামত নিজস্ব)

Related Articles

Back to top button
Close