fbpx
পশ্চিমবঙ্গব্লগহেডলাইন

বঙ্গ থেকে বেকারত্ব দূর করতে অঙ্গীকারবদ্ধ বিজেপি 

সৌমিত্র খাঁ: পশ্চিমবঙ্গের যে কোনও কোনায়, যে কোনও চায়ের দোকানের আড্ডায় একই গুঞ্জন শোনা যায় তা হল বেকারত্বের হাহাকার। যে রাজ্যে যুবসমাজ দিনের পর দিন শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও চাকরির খোঁজে এক অফিস থেকে অন্য অফিসে দৌড়ে বেড়ায় সেই রাজ্য কি প্রকৃত রূপে নিজের সাফল্যের গর্বে গর্বিত হতে পারে? একসময় যে বাংলা ছিল সারা দেশের কাছে একটি স্বপ্নরাজ্য, যার অলিতে গলিতে শোনা যেত সংস্কৃতির কলকাকলি, যার যুব সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাস করত দেশাত্মবোধের চেতনা,গত ৯ বছরে সেই রাজ্যের সকল গরিমাকে ধুলিস্যাৎ করে দিয়েছে এই স্বৈরাচারী এবং উদ্ধত তৃণমূল সরকার।

বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের যে কোনও রেলওয়ে স্টেশনে নজর দিলে দেখা যায় রোজ ভোর বেলায় স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে হাজার হাজার মানুষ ঠিকে চাকরির আশায় অপেক্ষা করছেন। কোনদিন হয়তো তাদের কোন প্রকার নিকৃষ্ট কাজের ব্যবস্থা হয়, বা কখনও হয়তো দিনের শেষে তাদের খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়। ওনারা জানেন না যে আজকে যদি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না হয় তবে তাদের পরিবারের মুখে অন্নসংস্থান হবে কি করে? এই প্রকার অনিশ্চয়তার ঘন অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে পশ্চিমবঙ্গের বর্ণময় আকাশে, যবে থেকে তৃণমূলের অনাচারের ঘনঘটা ছেয়ে গেছে এই রাজ্যে। অবশ্য এই বেকারত্বের হাহাকারের সূচনা করে গেছিল সেই সিপিএম সরকার, যারা নিয়ম করে কল-কারখানার গেটের সামনে ঝান্ডা বেঁধে দিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মুখোশের আড়ালে হাজার হাজার ফ্যাক্টরি বন্ধ করে দিয়েছিল। যারা প্রাইমারি শিক্ষার ক্ষেত্র থেকে ইংরেজি শেখা ঐচ্ছিক করে দিয়ে একটি গোটা প্রজন্মকে যুগের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার থেকে বিরত রেখেছিল। যারা কেবলমাত্র নিজেদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করার জন্য বিদেশে পড়তে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের লাখ লাখ যুবক-যুবতীর শিক্ষার্ দিকে মনোনিবেশ করেনি যার ফলে বর্তমান প্রজন্মের অধিকাংশই সারা দেশের নিরিখে জীবন যুদ্ধের লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়ছে।

পশ্চিমবঙ্গের দুর্দিনের যে সূচনা বামেরা করে গিয়েছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল সরকার সেই প্রথাই এগিয়ে নিয়ে চলেছে আরও ভয়াবহ লক্ষ্যে। যে রাজ্যের হাজার হাজার স্নাতকোত্তর পাস করা যুবক-যুবতী বনসহায়কের পদের জন্য আবেদন করতে বাধ্য হয় যে পদের জন্য কেবল ক্লাস এইট পাস হওয়ার যোগ্যতা কাম্য, সেই রাজ্যের সরকার প্রকৃতরূপে ব্যর্থ। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের বেকারত্বের হার ১৭.৪। এবং যাদের কোনও প্রকার কর্মসংস্থান হয়েছে বহু ক্ষেত্রে তারাও তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ না পেয়ে নিম্নমানের কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে বাধ্য হয়েছে পেটের দায়ে।  প্রতিবছর কলকাতায় যে সকল চাকরির মেলা সংঘটিত হয়, সেখানকার ভিড়েই পশ্চিমবঙ্গের বেকারত্বের ভয়াবহতার একটি আন্দাজ করা যেতে পারে। একদিকে যখন পরিসংখ্যান বলছে যুবসমাজের মধ্যে আত্মহত্যার একটি প্রধান কারণ হলো বেকারত্ব তখন অপরদিকে আমাদের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী কর্মসংস্থানের নামে পশ্চিমবাংলার যুবসমাজকে চপ-ফুলুরির দোকান খুলতে উৎসাহিত করছেন। গত নভেম্বর মাসেই যখন হাওড়ায় একজন স্নাতকোত্তর পাস করা যুবক বেকারত্বের বিভীষিকা সহ্য করতে না পেরে তার মা বাবাকে নিজের হাতে খুন করে নিজে আত্মহত্যার চেষ্টা করল, সেই খবরটা দেখেও কি মাননীয়ার একবারের জন্য মনে হয়নি যে তাঁর নিজেকে “বাংলার গর্ব” আখ্যা দেওয়া একটি নিন্দনীয় মিথ্যা আস্ফালন?

আরও পড়ুন: শুভেন্দুকে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা, বুলেটপ্রুফ গাড়ি!

৯ বছর আগে যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাংলার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে নির্বাচিত করে মুখ্যমন্ত্রী পদে বসিয়েছিলেন তখন তিনি আশ্বাস দিয়েছিলেন মানুষকে যে তৃণমূল সরকার কেবলমাত্র পরিবর্তন নিয়ে আসবে না, আসবে শিল্প বিনিয়োগের তুফান সঙ্গে নিয়ে। কিন্তু এ সকলই মায়া! মুখ্যমন্ত্রী গত ৯ বছরে পাঁচটি বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিক অধিবেশন করলেও, আজ অবধি কোন রকম শিল্পে বিনিয়োগ পশ্চিমবঙ্গে বাস্তবায়িত হয়নি। উপরন্তু যেসকল বাণিজ্য সংস্থা অতীতে পশ্চিমবঙ্গে ছিল,তারাও এ তৃণমূল রাজের সিন্ডিকেটের কারণে রাজ্য ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। সিঙ্গুর থেকে টাটাকে সরিয়ে দিয়ে যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সিঙ্গুরের লোককে কথা দিয়েছিলেন চাষআবাদের ব্যবস্থা করে সেখানকার যুবসমাজকে চাকরির সুযোগ করে দেবেন সেখানেও আজ অবধি কারোর কর্মসংস্থান হয়নি। বরং সেই দুই ফসলী জমিতে এক মুঠো সরষের বীজ ছড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী চোখে সর্ষেফুল দেখিয়ে দিয়েছেন এখানকার মানুষকে। কর্মসংস্থানের নামে মুখ্যমন্ত্রী যা দিয়েছেন তা হল কেবল মিথ্যা প্রত্যাশা, যুব সমাজের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারেনি এই স্বার্থালোভী তৃণমূল সরকার।

আমাদের বিজেপি পরিবারে আমরা বুঝি যে একটি পরিবার সুষ্ঠুভাবে চালানোর জন্য দরকার যথাযথ কর্মসংস্থান। এবং যে কোনও রাজ্যে শিল্প বিনিয়োগ বাড়াবার জন্য সেই রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা হওয়া দরকার অনুকূল। যেখানে সিন্ডিকেটের বাড়াবাড়ি থাকবে না, থাকবে না কোনো প্রকার কাটমানির প্রথা, যেখানে কোনও প্রকার বাণিজ্যকেন্দ্র খোলার জন্য সরকারকে ঘুষ দিতে হবে না, যেখানে কোম্পানির মালিক করতে হবে না রাজ্য সরকারের পৃষ্ঠপোষকদের, তেমনি এক সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ আমরা।  কিন্তু এই ব্যর্থ তৃণমূল সরকার কেবলমাত্র যে কর্ম নিয়োগে বিফল হয়েছে তা নয়, কর্ম ক্ষেত্রে দুর্নীতি এবং কাটমানি নেওয়ার আত্তীকরণ করে ফেলেছে এই সুবিধাবাদী ব্যানার্জি সরকার। একদিকে যেখানে শিক্ষাগত মানের দিক দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের যুবসমাজ এখনও বাকি রাজ্যের থেকে বহু অংশে এগিয়ে, তখন অন্যদিকে ক্রমান্বয়ে এমন বহু মানুষ বিভিন্ন উচ্চপদস্থ দায়িত্বে নিয়োজিত হয়েছেন যাদের প্রকৃত যোগ্যতা নেই সেই পদ আলোকিত করার। তাঁদের একমাত্র যোগ্যতা হল যে তারা সকল অন্যায়-অবিচারের দিকে মুখ ফিরিয়ে তৃণমূলের দলদাস হয়ে থেকেছেন এবং মাননীয়ার স্নেহধন্য হওয়ার সুবাদে যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও তারা কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন। অপরদিকে এই তৃণমূল সরকার বিরোধী পক্ষের প্রতিবাদের আওয়াজকে দমন করার জন্য বেকার যুবক যুবতীদের অপব্যবহার করে চলেছেন। ক্লাবে ক্লাবে অনুদানের নামে ঘুষ দেওয়া, রাজ্যবাসীকে সুরক্ষা না দিতে পারলেও কুড়ি টাকায় চোলাই মদ সরবরাহ করা, চপ শিল্পের মতোই বোমা শিল্পকেও নির্দ্বিধায় বাড়তে দেওয়া, পুলিশ প্রশাসনকে ব্যবহার করে বিরোধীপক্ষকে মিথ্যা আরোপে দোষী সাব্যস্ত করে কারাদন্ড দেওয়া, মুখ্যমন্ত্রীর নিজের দলের প্রকৃত দোষীদের নিজ দায়িত্বে পুলিশের হেফাজত থেকে ছাড়িয়ে আনা, এই কোনও প্রকার অনাচার করার থেকেই বিরত থাকেননি মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী শ্রীমতী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

সর্বোপরি, যখন এই সকল অবিচারের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছেন আমাদের শ্রদ্ধেয় রাজ্যপাল শ্রী জগদীপ ধনকরজী, এখন সকল সীমা লংঘন করে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁর দলের শীর্ষ নেতৃত্ব আমাদের রাজ্যের সাংবিধানিক প্রধানের বিরুদ্ধে কটুক্তি করতে পিছপা হননি। এই উশৃঙ্খলতাই বর্তমান তৃণমূল সরকারের সত্য পরিচয়। এই সকল স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থায় পদপিষ্ট হয়েই পশ্চিমবঙ্গের মানুষেরা আজ সঙ্গবদ্ধ হয়ে এই উন্নাসিক তৃণমূল সরকারকে রাজ্য থেকে উৎখাত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আর তাই শ্রীমতী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন বুঝতে পেরেছেন যে তার সিংহাসন আজ বাংলার মানুষের অঙ্গীকারের জোরে দোদুল্যমান। তাই ২০২১-এর নির্বাচনের প্রাক্কালে হঠাৎ মুখ্যমন্ত্রীর মনে পড়েছে যে এই যুবসমাজের হাতেই রয়েছে নির্বাচনের ফলকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা। তাই তিনি তড়িঘড়ি ঘোষণা করে দিলেন যে ২০১৪ থেকে এখনও পর্যন্ত যে সকল টেট উত্তীর্ণ প্রার্থীরা নিয়োগপত্র হাতে পাননি তাঁদের মধ্যে ১৬,৫০০ জনকে চাকরি দেবেন তিনি। কিন্তু তিনি এই সকল নিয়োগের যে সময়সীমা দিয়েছিলেন তা এই ডিসেম্বর মাসেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। আপনাদের কাছে আমার প্রশ্ন, আপনাদের মধ্যে কেউ কি এই নিয়োগপত্র হাতে পেয়েছেন?

আরও পড়ুন: ১৮ ডিসেম্বর বিজেপিতে শুভেন্দু! জল্পনা তুঙ্গে 

উপরন্তু, তৃণমূলের শিক্ষামন্ত্রীকে স্বমহিমায় একথাও বলতে শোনা গেছে যে তৃণমূল সরকারের পক্ষে কোন নতুন টিচার নিয়োগ করা সম্ভব নয়। তবে কি মুখ্যমন্ত্রীর চাকরির ঘোষণা কেবলই একটি নির্বাচনী চাল? আবার এই তৃণমূল সরকার আশ্রিত পুলিশ বাহিনী প্রতিবাদরত টেট চাকরিপ্রার্থীদের উপর লাঠিচার্জ করে রাতের অন্ধকারে তাদের প্রতিবাদ দমন করতে তৎপর হয়। কিন্তু, আপনি হয়তো ভুলে গেছেন যে রাতের অন্ধকারে পুলিশের লাঠিচার্জকে ধামাচাপা দেওয়া গেলেও মানুষের কাছে আজ আপনাদের স্বৈরাচারী সরকারের প্রকৃত রূপটা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট।  মুখ্যমন্ত্রী দিনের পর দিন কেবলমাত্র তাঁর সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি করার লক্ষ্যে বাংলার যুব সমাজের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দিয়েছেন। তিনি নিশ্চিত করেছেন যাতে বাংলা যুবসমাজ পেটের দায়ে অন্য রাজ্যে কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজতে বাধ্য হয়। উনি নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক প্রতারণাপূর্ণ কৌশলের সাহায্য নিয়ে ঘোষণা করেছেন যে বাংলার দু’লক্ষ যুবক-যুবতীকে মোটরসাইকেল কেনার জন্য ঋণ দেওয়া হবে যাতে তারা তাদের নিজেদের ছোট কোনও ব্যবসা শুরু করতে পারে। কিন্তু অদ্ভূতভাবে এই ঋণ দেওয়া শুরু করার কোনও রকম তারিখ নির্ণয় করা হয়নি ওনার ঘোষণায়। এ কোন ধরণের রাজনৈতিক খেলা খেলছেন আপনি মাননীয়া?  সময় এসে গিয়েছে যখন বাংলার যুব সমাজ একত্রিত হুংকার ডেকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বলছে, “আর নয় অন্যায়।” কারণ পশ্চিমবাংলার যুবসমাজ চায় যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থান এবং জীবনযাত্রার উন্নততর মান যার ফলে তারা সবাই তাদের জীবনযাপনের গতিবিধি নির্ণয় করতে পারবে এবং সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে বলতে পারবে, “আমি বাঙালি, আমিই বাংলার গর্ব”।

লেখক: বঙ্গ বিজেপি যুব মোর্চা সভাপতি

Related Articles

Back to top button
Close