fbpx
অন্যান্যপশ্চিমবঙ্গহেডলাইন

পুকুরে মাছের পরিচর্যার খুঁটিনাটি

নিজস্ব প্রতিনিধি: মাছচাষিদের হাত ধরে মাছ চাষে আমাদের রাজ্য অনেক এগিয়ে। এ রাজ্যে অনেকেই আছেন যাঁরা বিভিন্ন পর্যাযে মাছ চাষ করে থাকেন। কেউ ডিমপোনার চাষ করেন তো কেউ ডিমপোনা থেকে চারাপোনা, আবার কেউ চারাপোনা মজুত পুকুরে রেখে বড়পোনার চাষ করেন। যেভাবেই চাষ করা হোক না কেন সকল পদ্ধতিই হতে হবে বিজ্ঞানসম্মত। তবেই আসবে সাফল্য, চাষিরা দেখবেন লাভের মুখ। অনেকেই আছেন যাঁরা উন্নত ফিশারি থেকে ডিমপোনা কিনে আনেন। এতে খরচ বেশি। তবে ডিমপোনা কিন্তু চাষিরা বাড়িতেও তৈরি করতে পারেন। কেমন করে?

একটি বড় পাত্রে পরিষ্কার জল নিযে ডিম আছে এমন একটি স্ত্রী মাছের পায়ুছিদ্র সামান্য কেটে পেট থেকে সকল ডিম বার করে এই জলে রাখতে হবে| এরপর একটি পুরুষ মাছের পায়ুছিদ্র থেকে ওই একই পদ্ধতিতে শুক্রাণু বার করে ওই জলে রেখে ভালো ভাবে মেশাতে হবে| এই পাত্রে ডিম্বানু ও শুক্রাণু মিশিয়ে পাঁচ ঘণ্টা মতন রেখে দিতে হবে| এই সময় মাঝে মাঝে পাত্রের জল নাড়ালে ভালো হয়| ঘণ্টা পাঁচেক পর পরিষ্কার ট্যাঙ্গে জলে ওই মিশ্রণ ঢেলে দিতে হবে এবং বেশ কয়েকদিনের মধ্যেই ওই ট্যাঙ্কে তৈরি হয়ে যাবে ডিমপোনা| মনে রাখতে হবে এইভাবে বহির্নিষেক পদ্ধতিতে রুই, মৃগেল, কাতলা এই মাছের ডিমপোনাই তৈরি করা সম্ভব, কারণ এরা পুকুরের জলে ডিম ছাড়ে না|

    আরও পড়ুন: নদিয়ায় কাজলি জাতের পটল চাষ

এবার বলা যাক বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে মাছের পরিচর্যা কিভাবে সম্ভব| মজুত পুকুরে বা সঞ্চয়ী পুকুরে মাছেদের যে সমস্ত পরিচর্যার প্রয়োজন হয় তাকে প্রধানত দুভাগে ভাগ করা যায়| ১) মাসিক পরিচর্যা ও ২) দৈনন্দিন পরিচর্যা| পুকুরে প্রাণীখাদ্যের উপযুক্ত যোগান বজায় রাখতে প্রতিমাসে প্রায় ১৩৫ কেজি গোবর প্রয়োগ করতে হবে| তাতেও যদি খাদ্যকণার অভাব দেখা যায় তাহলে গোবরের পরিমান বাড়াতে হবে| পুকুরে উদ্ভিদকণার বৃদ্ধিতে বিঘা প্রতি ৪ কেজি সিংগিল সুপার ফসফেট দেওয়া যেতে পারে| প্রতি মাসে অন্তত একবার বিঘা প্রতি ৩-৫ কেজি চুন জলে মিশিয়ে পাতলা করে পুকুরে ছড়িয়ে দিতে হবে| পুকুরের জলের পি এইচ মাত্রা পরীক্ষা করে দেখতে হবে যেন তা ৬.৮-৮.০ – এর মধ্যে থাকে| এছাড়া জলের তাপমাত্রা ২৫-৩২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড হতে হবে এবং জলে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ ৪-৫ পিপিএম থাকলে ভালো|

প্রতি মাসে একবার কিংবা দুবার জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা জরুরি| পুকুরে জাল টানলে জলের তলায় জমে থাকা দূষিত গ্যাস নির্গত হয়| এর ফলে পুকুরের পরিবেশ উন্নত হয়| মাছের যদি কোনও রোগ দেখা দেয় তাহলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে| এপিজুটিক আলসারেটিভ সিনড্রোম দেখা দিলে ১০ লিটার জলে ৫০ মি.গ্রা. পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট মিশিয়ে সেই মিশ্রণে মাছকে ডুবিয়ে রাখতে হবে| এরপর ১০ লিটার জলে ৩০০ গ্রাম লবণ মিশিয়ে সেই মিশ্রণে মাছকে ৩০ সেকেন্ড রেখে ছেড়ে দিতে হবে| এছাড়া মাছের প্রতি কেজি পরিপূরক খাদ্যের সঙ্গে একটি ট্রাইমিথোপ্রিন অ্যানিবায়োটিক ট্যাবলেট ৭-১০ দিন পর পর খাওয়াতে হবে|

যদি লেজ কিংবা পাখনা পচা রোগ দেখা দেয় তাহলে প্রতি ৩ লিটার জলে ১ গ্রাম তুঁতে গুলে সেই দ্রবণে মাছকে কিছু্ক্ষণ ডুবিয়ে রেখে পুনরায় পুকুরে ছেড়ে দিতে হবে| কানকো পচা রোগ দেখা দিলে ৩-৫ শতাংশ লবণ জলে ৫-১০ সেকেন্ড ডুবিয়ে রেখে ছেড়ে দিতে হবে| এটি দিনে একবার করতে হবে এবং পর পর ৩-৪ দিন করতে হবে| যদি মাছ উকুন দ্বারা আক্রান্ত হয় তাহলে (এক লিটার জলে এক গ্রাম পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেটের জলে ৪০ সেকেন্ড ডুবিয়ে ছেড়ে দিলে ভালো ফল পাওয়া যায়|

মাসিক পরিচর্যার পর জানা যাক দৈনন্দিন পরিচর্যার কথা| মাছের বৃদ্ধির জন্য সঠিক পরিমানে পরিপূরক খাদ্য প্রয়োগ করতে হবে| সম অনুপাতে সরষের খোল ও ধানের কুড়ো জল দিয়ে মিশিয়ে মণ্ড বানিয়ে, ঝুড়িতে করে পুকুরের দু থেকে আড়াই ফুট নিচে ঝুলিয়ে দিতে হবে| প্রতিদিন একই সময়ে ও একই জায়গায় মোট মাছের ওজনের তিন শতাংশ হারে পরিপূরক খাদ্য দিতে হবে| সাত দিনের ব্যবধানে খাদ্য দেওয়ার এক ঘণ্টা বাদে ঝুড়ি তুলে খাবারের অবশিষ্ট অংশের পরিমান পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী তা কমাতে বা বাড়াতে হবে| পুকুরে গার্স কার্প বা জাভা পুঁটি থাকলে পরিপূরক খাদ্য দেওয়ার এক ঘণ্টা আগে একটি ঘেরা জায়গায় ঘাস বা কচুরিপানা বা গাছের পাতা দিতে হবে|

পুকুরে দেশি মাগুর মাছ থাকলে পুকুরের এক কোণায় একটি বৈদ্যুতিক বাল্ব জ্বালিয়ে রাখতে হবে| এর ফলে বেশ কিছু পোকামাকড় আলোর দ্বারা আকৃষ্ট হযে পুকুরে এসে পড়বে যা মাগুর মাছের খাদ্য হিসেবে গৃহীত হবে| এসব দৈনন্দিন ও মাসিক পরিচর্যা ছাড়াও পুকুরের ও জলের পরিবেশ সঠিক রাখার দিকে নজর দিতে হবে| যদি পুকুরে শ্যাওলা বা কচুরিপানা দেখা দেয় তাহলে ঘন জাল দিযে টেনে তা তুলে ফেলতে হবে|

পুকুর পাড়ে আগাছা হলে তা নির্মূল করতে হবে| পুকুরের জল যাতে বাইরে না যায়, কিংবা বাইরের জল পুকুরে না আসে তার দিকে লক্ষ্য রাখা জরুরি| এইভাবে যদি সঞ্চয়ী পুকুরে মাছের পরিচর্যা করা যায় তাহলে মাছচাষিরা সন্তোষজনক ফলন পাবেন|

Related Articles

Back to top button
Close