fbpx
কলকাতাগুরুত্বপূর্ণপশ্চিমবঙ্গব্লগহেডলাইন

সাপ্তাহিক লকডাউনে সায় নেই আমজনতার, দিদির কথায় করোনাকে কোল বালিশ করেই মানুষ ছুটছে রুটি-রুজির ধান্দায়

শংকর দত্ত, কলকাতা: সরকারি ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে রাজ্যে সাপ্তাহিক লকডাউন শুরু হয়েছে গত মাস থেকেই। যদিও এই লকডাউনকে সাপ্তাহিক বলা যায় কিনা সে নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বিস্তর। সরকারি সিদ্ধান্তে এই লকডাউন চালু করা ও ইচ্ছে মতো তারিখ পরিবর্তন করা নিয়েও বিরোধী দলগুলো রাজ্য সরকারের সমালোচনা করে চলেছে প্রথম থেকেই। এখন প্রশ্ন হল আদৌ এই লকডাউনের কোনও মানে আছে কিনা? সত্যিই কি এই লকডাউনের ফলে রাজ্যে করোনা সংক্রমণ কমছে? নাকি কোভিড আক্রান্ত ও মৃত্যু আগের থেকে বেশ কয়েকগুণ কমেছে। বাস্তব চিত্র কিন্তু অন্য কথা বলছে।

এই লকডাউন ঘোষণার পর থেকে আদৌ রাজ্যে কোভিড মৃত্যুর সংখ্যা কোনভাবেই কমেনি। বরং তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রশ্ন হল সব কিছু হা-হুল্লা খুলে দেওয়ার পরে তাহলে আবার এই লকডাউন করে কী লাভ? চিকিৎসাবিজ্ঞান বা রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতর এই নিয়ে পরিষ্কার কোনও তথ্য দিয়েছে বলে জানা নেই। কিন্তু পরিস্থিতি বলছে, সংবাদমাধ্যমের খবর বলছে রোজ কোভিড আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে, বই কমছে না। হয়তো অন্য রাজ্য বা দেশের জাতীয় সমীক্ষা ও সূচক অনুযায়ী রাজ্য দাবি করছে মৃতের সংখ্যা শতাংশের হিসাবে অনেক কম। তা সত্ত্বেও বলা যায় বর্তমান কোভিড পরিস্থিতি রাজ্যের হাল একদম ভালো নয়।

আরও পড়ুন:ভারী বর্ষণে নাজেহাল বাণিজ্যনগরী মুম্বই, গণেশ চতুর্থীর আগেই জারি উচ্চ জোয়ার সতর্কতা

কারণটা ঠিক কী? প্রথমত যেদিন গুলিতে লকডাউন হচ্ছে, বেশিরভাগ মানুষ কিন্তু স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই তা মেনে নিয়ে চুপ চাপ নিজেকে ও পরিবারকে গৃহবন্দি রাখছেন। থাকছেন সজাগ ও সতর্ক। কিন্তু যেদিন গুলোতে ছাড় দেওয়া হচ্ছে। মানে সাপ্তাহিক দুদিন লকডাউন হলে ৫ দিন কমপক্ষে ছাড় আছে। কোনও কোনও সপ্তাহে ৭ তে ৭ দিনই মানুষ কিন্তু আগের মতোই বাধন ছাড়া। এইদিনগুলোতে আদতে কী ঘটছে? দেখা যাচ্ছে, মাছের বা সবজির বাজারে গাদা গাদা ভিড়। রাস্তার মোড়ে চায়ের দোকানে জমায়েত। মাস্ক পরার বালাই নেই অনেক জায়গায়। যারা পরে আছেন কারও মাস্ক থুতনিতে ঝুলছে, কারো কানে ঝুলছে, কেউ আবার ট্যাঁকে গুঁজে রেখে দিব্যি কাজ কথাবার্তা চালাচ্ছেন।

পাড়ায় পাড়ায় অটো ওলাদের দাপট আবার বেড়ে গেছে। শুরুতেই যে ভাড়া ছিল ৬ টাকা। তা বেড়ে হয়ে গেছে ১০ টাকা। অর্থাৎ বেশিরভাগ জায়গার অটোতে উঠলেই গচ্চা যাচ্ছে মিনিমাম ১০ টাকা। কলকাতার বহু জায়গায় ডাবল বাসেও ভাড়া অনেক বেশি। কোনও সরকারি নিয়ম নির্দেশিকা কেউ কোথাও মানছেন না। প্রথমে যে ঘোষণা ছিল বাসে প্রতি আসনে একজন বসবে। এখন দেখা যাচ্ছে ভাড়া দ্বিগুণ দিয়েও মানুষ বাসে গাদাগাদি করে ভিড় করছে। অনেক জায়গায় আগের মতো যাত্রীদের ঝুলেও আসতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে বাস কর্মীদের বক্তব্য মানুষ জোর করে উঠে পড়ছেন। অন্যদিকে পাবলিকের কথা, কী করব। কাজে বেরোতেই হবে। বাড়িও ফিরতে হবে। ট্রেন মেট্রো কিছুই চলছে না। অগত্যা ভিড় হলেও বাস পেলেই উঠে পড়তে হচ্ছে। মুশকিল হল শহর ও শহরতলিতে বহু জায়গায়তেই বাস নেই। রাস্তায় ২/৩ ঘন্টা অপেক্ষা করবার পরও অনেক জায়গায় বাস মিলছে না। তাই এই ভাবে যাতায়াতের ফলে কোভিড সংক্রমণ যে প্রতি মুহূর্তে বাড়বে এতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই। বিশিষ্টদের একাংশের মত অবশ্য অন্য। তারা বলছেন, লকডাউন করতে হবে মার্চ-এপ্রিল এর মতো পুরোপুরিই লকডাউন হোক।

মানুষকে একদিম ঘরবন্দি করে দিক সরকার বা প্রশাসন। দরকার হলে গরিব অভাবী মানুষের বাড়ি বাড়ি খাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র স্থানীয় ভিডিও বা পৌরসভা বা থানা থেকে পাঠানো হোক। এটাই একমাত্র পথ হতে পারে। কিন্তু উপায়ও নেই এতদিন বসে থাকবার পর মানুষ রাস্তায় বেরোতে শুরু করে দিয়েছেন। কলকাতার বড় বাজার থেকে ওয়েলিংটন, ধর্মতলা, চাঁদনি মার্কেট, কলেজস্ট্রিট কিংবা বউবাজার আবার আগের মতোই পুরোদমে খুলে গেছে। বহু কোম্পানি বা অফিস প্রথম দিকে সরকারি নির্দেশ মেনে ৩০ শতাংশ কর্মী নিয়ে কাজ শুরু করলেও আবার ১০০ শতাংশ কর্মী নিয়ে কাজে নেমে পড়েছে। এছাড়া তাদের কিছু করবার নেই। গত কয়েকমাসে বেসরককরি সব ধরনের ব্যবসা এমনিতেই লসে গেছে। বহু ক্ষেত্রে প্রোডাকশন বন্ধ হয়ে ছিল। স্বাভাবিক কারণে তারা সরকারি নির্দেশ মেনে আবার নতুন করে উৎপাদনে নেমে পড়েছে। অনেক জায়গায় আবার সরকারি নির্দেশকে উপেক্ষা করেই চলছে কাজকর্ম। শ্রমিক, কর্মচারীরাও বহু ক্ষেত্রেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজে ফিরতে বা সামান্য কাজটুকু টিকিয়ে রাখার তাগিদে ছুটছেন তাঁর গন্তব্যে। আর এখানেই যত ঝামেলা। লকডাউন শূন্য দিনগুলিতে কলকাতায় ভিড় উপচে পড়ছে মারাত্মক রকম।

আরও পড়ুন:ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড তেলেঙ্গানার শ্রীশৈলম জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে, আটকে ৮ জন

দক্ষিণ শহরতলীর তারাতলা-ব্রেসব্রিজ থেকে শুরু করে বাবুঘাট-ধর্মতলা, উত্তরের শ্যামবাজার, ডানলপ, উল্টোডাঙ্গা, সল্টলেক সেক্টর-ফাইভ কিংবা দক্ষিণ কলকাতার গরিয়াহাট , রাসবিহারী বা টালিগঞ্জ সর্বত্র অফিস ফেরতের সময়ে তিল ধারণের জায়গা নেই। একজন আর একজনের গায়ের উপর উঠে এসে দাঁড়িয়ে পড়ছেন নিজের বাড়ি ফেরবার বাস ধরবার জন্য। যেখানে কোনওরকম দূরুত্ববিধি,হা ত সানিটাইজ কিংবা অনেকের মুখে মাস্কও ঠিক মতো দেখা যাচ্ছে না। একটা বাস বা ট্যাক্সি হাতের কাছে পেলেই আম-পাবলিক হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। যেখানে কেউ কাউকেই চেনেন না জানেন না। বাসে দাঁড়িয়ে, এলাকার অটোতে কিংবা ম্যাক্সি বা ম্যাজিক গাড়িতে আগের মতোই গাদাগাদি করা ভিড়। একে অপরের গায়ে গা ঠেকিয়ে বা গা ঘষাঘষি করে দাঁড়িয়ে ঝুলে বাড়ি ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন।

আর এখানেই এক শ্রেণীর মানুষের দাবি, আমরা তো মুখ্যমন্ত্রীর কথা মতো করোনাকে পাশ বালিশ করেই নিয়েছি। আমরা তো জানিই যেকোনও মুহূর্তে আমি আপনি যে কেউ কোভিড আক্রান্ত হতেই পারি। এবং জীবনকে বাজি রেখেই দুবেলা দু মুঠো রোজগারের ধান্দায় কাজে যাচ্ছি। তাই সপ্তাহে পাঁচ দিন রাস্তায় বেরোলে যদি করোনা আক্রান্ত না হয়, তাহলে লোক দেখানো একদিন বা দুদিন লকডাউন করে লাভটা কিসের? প্রশ্ন উঠছে সর্বত্রই। এখন দেখার, পারিপার্শ্বিক বিবেচনায় রাজ্য কী সিদ্ধান্ত নেয় ভবিষ্যতে।

Related Articles

Back to top button
Close